ঢাকা, শনিবার ২৫, মে ২০১৯ ১১:৩৩:৪০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
গুজরাটে কোচিং সেন্টারে আগুন, ১৮ শিক্ষার্থী নিহত পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন থেরেসা মে, কাঁদলেনও

ঋতু বা মাসিক প্রশ্নে নীরবতা ভাঙুন

এনজিও সংবাদ ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:০৪ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে মেয়েদের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা দরকার। এ জন্য পাঠ্যবইয়ে মাসিক সম্পর্কে সঠিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। 

মেয়েদের জীবনে ঋতু বা মাসিক বিষয়টি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক ঘটনা। প্রজননক্ষম মেয়ে বা নারীর মাসিকের সময়কাল প্রায় ৩৮ বছর। মাসিক সম্পর্কে ঠিকঠাক তথ্য ও জ্ঞান পাওয়া, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থার অধিকার তার মানবাধিকার। মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামাজিক নিয়মবিধি, বিশ্বাস বা রীতিনীতি এবং প্রচলিত ধ্যানধারণা মেয়ে বা নারীর মাসিকের সময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমিত করে। যা নারীর সামগ্রিক ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়াও পরিষ্কার পানি, উপযুক্ত স্যানিটেশন সুবিধা এবং আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যবান্ধব সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া নারীর মাসিক স্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তোলে।

আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব স্যানিটারি পণ্য ও সহায়ক অন্য উপকরণ সহজলভ্য না হওয়ায় তারা ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ ব্যবহার করে। এসব কারণে অনেক সময় তাদের যৌন ও প্রজননতন্ত্র এবং মূত্রনালির সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সার্বিক অর্থে বিশ্বের অন্য অনেক নারীর মতোই বাংলাদেশের নারীরা মাসিকের সময় শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। 

অন্যদিকে, মাসিককালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়টি পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার ছাড়াও শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতার সাথে সম্পর্কিত। 

বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা: 
ইউনেসকোর র্পযবক্ষেণ মতে, মাসিক স্বাস্থ্যের জন্য বয়ঃসন্ধিসংক্রান্ত শিক্ষা, মাসিকসংক্রান্ত উপকরণ, সাবান, পানি, নিরাপদ টয়লেট ও বর্জ্য ফেলার উপযুক্ত জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু সীমিত সম্পদ, বিদ্যমান অবকাঠামো এবং যথাযথ উদ্যোগের অভাবে অনেক স্কুলেই এই সুবিধাগুলো থাকে না। 

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন ২০১৪-র হিসেব মতে, মাত্র ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে স্যনিটারি ন্যাপকিন রাখার আলাদা জায়গা রয়েছে। স্কুলগুলোতে পানি, স্যানিটেশন ও এর স্বাস্থ্যকর বাবস্থাপনার অভাব প্রকট। ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই মাসিকের সময় পুরানো কাপড় ব্যবহার করে। প্রায় এক চতুর্থাংশ মেয়েশিক্ষার্থী সেসময় স্কুলে যায় না। প্রায় এক তৃতীয়াংশ মনে করে মাসিকের সমস্যা স্কুলের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। 

গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৯ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে, ৮৭ শতাংশ ব্যবহার করে পুরানো কাপড়। ৯০ শতাংশ গ্রামীণ শিক্ষার্থী বারবার ব্যবহারের জন্য তাদের মাসিকের কাপড় গোপন জায়গায় সংরক্ষণ করে।

শহর এলাকায় ২১ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে, ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্যবহার করে পুরানো কাপড়। তবে ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে কাপড় ব্যবহারও নিরাপদ হতে পারে।  

২০১৬ সালে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক বেজলাইন সার্ভে করে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে সিমাভির সহায়তায় পরিচালিত ‘ঋতু’ প্রকল্প। এতে অংশ নেয় নেত্রকোনা জেলার ১৪৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪০৪৬ জন মেয়েশিক্ষার্থী। 

এই জরিপের হিসাব বলে, ৫৩ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী মাসিকের সময় কমপক্ষে তিন দিন বিদ্যালয়ে যায় না। স্কুলে টয়লেটের ভেতরে বা কাছাকাছি সাবান-পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকা, নিয়মিত নিরাপদ পানি না থাকা, টয়লেটের দরজা, ছিটকিনি, তালা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য দেয়াল ঠিকমতো না থাকা, পরিচ্ছন্নতার অভাব, পর্যাপ্ত আলো না থাকা, ঢাকনাযুক্ত কন্টেইনার, মাসিকের উপকরণ রাখা বা ফেলার স্থায়ী ব্যবস্থা কম থাকায় ৭৫ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী মাসিকের সময় বিদ্যালয়ের টয়লেটে যায় না। তারা ব্যবহৃত কাপড় বা স্যানিটারি প্যাড বদলায় না। 

গবেষণা মতে, পারিবারিক পর্যায়েও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। যেমন, বাথরুমে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে। মাসিকের কাপড় প্রায়ই শুধু পানিতে ধুয়ে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তা সাবান ও পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রোদে শুকানো উচিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো লুকিয়ে শুকানো হয় বলে ঠিকমতো শুকায় না। যার ফলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ৯১ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থীই মাসিকের সময় অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করে। 

এই গবেষণা বলছে, মাসিকসংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তারা জনে না। ৩৬ শতাংশ মেয়ে প্রথম মাসিকের আগে এ সম্পর্কে জেনেছে।

বয়ঃসন্ধিকাল, ঋতস্রাব, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ের আঙ্গিকে মাধ্যমিক ও দাখিল পর্যায়ের পাঠ্যবই ও পাঠদান করা প্রয়োজন। মাসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সঠিক ও বেশি তথ্য দিয়ে মাসিক অনুকূল সেবামূলক পরিবেশ  গড়ে তোলা প্রয়োজন। 

যে কোনো বিষয় শেখানোর জন্য পাঠ্যবই হচ্ছে বহুলব্যবহৃত মাধ্যম। তাই পাঠ্যবইয়ের গুরুত্ব সেখানে অপরিসীম। মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ে বয়ঃসন্ধিকাল, ঋতুস্রাব, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়গুলো থাকলেও তা বিশদভাবে বলা নেই। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। 

অন্যদিকে এ বিষয়ে ট্যাবু ও অসচেতনতার কারণে শিক্ষকরাও অনেক সময় বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যান, পড়াতে চান না।

মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতি ও উদ্যোগ:
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা, যেমন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১, জাতীয় কৈশোর স্বাস্থ্য কৌশলপত্র ২০১৬-২০৩০, বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি নীতি ২০১৫, জেন্ডার ইক্যুইটি অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৪-২০২৪, জাতীয় মনোসামাজিক কাউন্সিলিং নীতিমালা ২০১৬ (খসড়া), স্বাস্থ্যখাত সহায়তা প্রকল্প, সামাজিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো ২০১৭, ইত্যাদিতে মাসিক ব্যবস্থাপনা, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, জেন্ডারসমতা, বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোরী, বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট ও মাসিকের সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া, মাসিকের বিষয়গুলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি), যেমন, (লক্ষ্য ৩) সকলের ও সব বয়সের মানুষের জন্য সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা এবং জীবন-মানের উন্নয়ন করা; (লক্ষ্য ৬) সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সহজলভ্য করা এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, যা অর্জন করার জন্য নীতিনির্ধারকদের যথাযথ মনোযোগ প্রয়োজন; (লক্ষ্য ৪) মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি এবং কর্মদক্ষতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়; (লক্ষ্য ৫) নারী-পুরুষের সমতা এবং সকল নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন; (লক্ষ্য ৮) নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পরিপূর্ণ এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংস্থার মাধ্যমে সূচক অনুযায়ী এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আনুমানিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে বেসরকারি করপোরেট সেক্টর এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। অথচ মেয়েদের জন্য স্কুলে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সুবিধাগুলোর সহজলভ্যতা, প্রবেশাধিকার, গ্রহণযোগ্য মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা একটি অবহেলিত বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।

বেসরকারি উদ্যোগ: 
সার্বিক প্রেক্ষাপটে সিমাভির নেতৃত্বে বিএনপিএস, ডরপ, রেড অরেঞ্জ, টিএনও এবং এমএইচএম প্লাটফরম (ইউনিসেফ, ব্রাক, ওয়াটারএইড, আইসিডিডিআরবি, বিএনপিএসসহ ৩৫টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত) নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং জীবনদক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জাতীয় কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য ‘ঋতু’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করছে।

মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে করণীয়:
পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস এবং পাঠ্যপুস্তকে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাসম্পৃক্ত যৌনশিক্ষা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ করে পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো থেকে পরীক্ষায় প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করতে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদেরকে প্রশিক্ষণের বকিল্প নইে। সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২০২৫ এর নির্দেশনা অনুসারে, টয়লেট ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১৮৭-এর পরিবর্তে ১:৫০ জন করা এবং নতুন পৃথক টয়লেট তৈরি ও পরিচালনার জন্য বাজেট বরাদ্দে অবশ্যই স্কুলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সহায়ক কার্যক্রম নিতে করতে উদ্বুদ্ধ করা দরকার, যা মেয়েদের স্কুলে যেতে ও বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।

মাসিক স্বাস্থ্য যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যেরই একটি অংশ, তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করা দরকার যে, মেয়েশিশুরা এমন পরিবেশে বেড়ে উঠবে যেখানে মাসিককে স্বাস্থ্যসম্মত ও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। মেয়েশিশু ও নারীরা প্রথম মাসিকসহ মাসিককালে তাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সহযোগিতা পায় সেটি  যেন নিশ্চিত করা যায়। মাসিকের বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থাপনা যেন কিশোরী ও নারীর সামাজিক বা সাংস্কৃতিক দিক বাধাগ্রস্ত না করে, সে বিষয়টিকেও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।