একাত্তরের নারীরা: যুদ্ধের আরেক নাম সাহস
দীপালি হাসান | উইমেননিউজ২৪প্রকাশিত : ০৯:৫৬ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার
প্রতীকী ছবি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রণাঙ্গন, অস্ত্র হাতে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, সীমান্ত পেরিয়ে প্রশিক্ষণ, গেরিলা অভিযান কিংবা বিজয়ের পতাকা। কিন্তু সেই যুদ্ধের আরেকটি বিশাল ক্যানভাস ছিল ঘরের ভেতর, গ্রামের উঠানে, শহরের গলিতে, শরণার্থীশিবিরে, হাসপাতালের বিছানায়। সেখানে ছিলেন বাংলাদেশের নারীরা।
তাঁদের কারও হাতে ছিল অস্ত্র, কারও হাতে ওষুধ; কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করেছেন, কেউ দিয়েছেন আশ্রয়; কেউ খবর পৌঁছে দিয়েছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়; কেউ সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী হয়েছেন; কেউ নিজের সন্তান, স্বামী কিংবা ভাইকে যুদ্ধে পাঠিয়ে নিজেই হয়ে উঠেছেন পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। আবার অসংখ্য নারী পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ তাই শুধু পুরুষের যুদ্ধ ছিল না। এই যুদ্ধ ছিল নারী-পুরুষের সম্মিলিত অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই রাজপথে নারী
১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন বিস্ফোরণমুখর, তখন নারীরাও বসে ছিলেন না। অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী রাজপথের আন্দোলনে যুক্ত হন। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পুরুষেরা যখন সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, নারীরাও তখন বুঝতে পারছিলেন—সামনে আসছে ভয়াবহ সময়।
কেউ পরিবারের পুরুষ সদস্যদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছেন, কেউ নিজের গয়না পর্যন্ত তুলে দিয়েছেন সংগ্রামের কাজে। কোথাও নারীরা দল বেঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত করেছেন। শহর থেকে গ্রাম—স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়েছিল নারীদের মধ্যেও।
অস্ত্র হাতে নারীরাও
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সশস্ত্র নারী যোদ্ধার সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কম হলেও তাঁদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তারামন বিবি অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কাকন বিবি, শিরীন বানু মিতিলসহ আরও অনেক নারী মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধে যুক্ত হয়েছেন। কেউ সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কেউ গেরিলা তৎপরতায় সহযোগিতা করেছেন।
তাঁদের পথ সহজ ছিল না। একজন নারীকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হলে সামাজিক বাধা, পারিবারিক উদ্বেগ এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি—সবকিছুকেই অতিক্রম করতে হয়েছে।
কিন্তু মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সেই বাধার চেয়েও শক্তিশালী ছিল।
অস্ত্রের বাইরে যে বিশাল যুদ্ধ
যুদ্ধ শুধু বন্দুক দিয়ে হয় না। একটি যুদ্ধ টিকে থাকে মানুষের সহযোগিতায়। আর সেই জায়গাটিতেই অসংখ্য নারীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
গ্রামের কোনো বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছেন। বাড়ির নারী নিজের পরিবারের খাবার ভাগ করে তাঁদের খেতে দিয়েছেন। কখনো রাতের অন্ধকারে আহত মুক্তিযোদ্ধাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। কখনো শত্রুসেনার চোখ এড়িয়ে খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে অন্যত্র।
অনেক নারী নিজের জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি, পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান কিংবা সম্ভাব্য অভিযানের খবর সংগ্রহ ও পৌঁছে দিয়েছেন।
কখনো একজন সাধারণ গ্রাম্য নারীই হয়ে উঠেছেন অসাধারণ সাহসের মানুষ।
তাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসে লেখা হয়নি।
মায়েদের যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের মায়েদেরও যুদ্ধ।
একজন মা তাঁর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। জানতেন না সে ফিরে আসবে কি না। তবু ছেলের কাঁধে হাত রেখে বলেছেন—দেশের জন্য যাও।
কেউ স্বামীকে হারিয়েছেন, কেউ সন্তানকে, কেউ ভাইকে। কেউ আবার যুদ্ধের সময় সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে।
শরণার্থীজীবনেও নারীদের দুর্ভোগ ছিল ভয়াবহ। লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। শরণার্থীশিবিরে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও বাসস্থানের সংকটের সঙ্গে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে নারী ও শিশুদের।
তবু সেই দুর্দশার মধ্যেও নারীরা পরিবারকে আগলে রেখেছেন।
চিকিৎসা ও সেবায় নারী
মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সেবায়ও নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নার্স, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক—বিভিন্ন পরিচয়ে তাঁরা যুদ্ধাহত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
হাসপাতাল কিংবা অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন অনেকে। সীমিত ওষুধ, সীমিত সরঞ্জাম এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা কাজ করেছেন।
কেউ হয়তো একটি ব্যান্ডেজ করেছেন, কেউ রক্ত দিয়েছেন, কেউ আহত একজন মানুষকে সাহস দিয়েছেন। যুদ্ধের ইতিহাসে এসব ছোট ছোট কাজ আসলে ছিল বেঁচে থাকার বড় লড়াই।
নির্যাতনের শিকার নারীরা
মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি নারীর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা।
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে বিপুলসংখ্যক নারী নির্যাতনের শিকার হন। তাঁদের কেউ বন্দিশিবিরে, কেউ বাড়িতে, কেউ পালিয়ে যাওয়ার পথে ভয়াবহ সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।
স্বাধীনতার পর তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামাজিক বাস্তবতা সবসময় তাঁদের পাশে ছিল না। অনেক নারী বছরের পর বছর তাঁদের অভিজ্ঞতা গোপন করে বেঁচে থেকেছেন। সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার ও অবহেলা তাঁদের জীবনের যন্ত্রণাকে আরও দীর্ঘ করেছে।
এই নারীদের কথা বলা মানে শুধু অতীতের একটি নির্মম অধ্যায় স্মরণ করা নয়; এটি যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য বোঝা।
কারণ যুদ্ধের ক্ষত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকা মৃতদেহে দেখা যায় না। অনেক ক্ষত মানুষের শরীর ও মনের ভেতর বহন করতে হয় সারাজীবন।
নারীর হাতে স্বাধীনতার পতাকা
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। লাল-সবুজের পতাকা ওঠে স্বাধীন দেশের আকাশে।
কিন্তু সেই পতাকার সঙ্গে মিশে আছে অসংখ্য নারীর কান্না, অপেক্ষা, সাহস, ত্যাগ ও স্বপ্ন।
যে মা তাঁর সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন, যে কিশোরী শরণার্থীশিবিরে দিন কাটিয়েছে, যে নারী মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, যে তরুণী অস্ত্র হাতে লড়েছেন, যে নার্স আহত মুক্তিযোদ্ধার ক্ষত বেঁধেছেন, যে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা পেরিয়ে বেঁচে থেকেছেন—স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একটি অধ্যায়।
তাঁদের অনেকের নাম আমরা জানি। আরও অসংখ্য নাম জানি না।
ইতিহাসের পাতায় আরও জায়গা চাই
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে নারীর অভিজ্ঞতাকে প্রান্তে রেখে চলবে না। শুধু কয়েকজন নারী মুক্তিযোদ্ধার নাম জানলেই নারীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা হয় না।
কারণ একজন নারী যে ঘরে বসে মুক্তিযোদ্ধার জন্য ভাত রান্না করেছেন, তিনিও যুদ্ধ করেছেন। যে মা নিজের সন্তানকে নিয়ে রাতের পর রাত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরেছেন, তিনিও যুদ্ধ করেছেন। যে নারী আহত মানুষটির পাশে দাঁড়িয়েছেন, তিনিও যুদ্ধ করেছেন। যে নারী নির্যাতনের পরও বেঁচে থেকে নতুন জীবন শুরু করেছেন, তাঁর লড়াইটিও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ।
একাত্তরের নারী আমাদের শিখিয়েছেন—যুদ্ধের সংজ্ঞা শুধু অস্ত্র হাতে নেওয়া নয়। কখনো সন্তানকে বিদায় দেওয়াও যুদ্ধ, কখনো ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেওয়াও যুদ্ধ, কখনো ভয়কে জয় করে সত্যের পাশে দাঁড়ানোও যুদ্ধ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার গল্প তাই কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীন হওয়ার গল্প নয়। এটি মানুষের মুক্তির গল্প।
আর সেই গল্পের প্রতিটি পৃষ্ঠায় নারীর হাতের ছাপ আছে।
লাল-সবুজের পতাকা যখন বাতাসে উড়ে, তার ভেতরে যেন ভেসে আসে সেই অজস্র নারীর কণ্ঠ—যাঁরা একাত্তরে বলেছিলেন, এই দেশ আমাদেরও। এই স্বাধীনতা আমাদেরও।
- কর্মজীবী নারীদের ফেলোশিপ দেবে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি
- মোহাম্মদপুরে সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার, যান চলাচল শুরু
- আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চান সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম
- ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কবলে তানজিন তিশা
- ‘যাও পাখি বলো তারে’র গায়িকা কৃষ্ণকলি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত
- সিলেটে জমে উঠেছে পূজার কেনাকাটা
- মেসি ও সুয়ারেজের জোড়া গোলে জয়ে ফিরল ইন্টার মায়ামি
- বাড়ল তেল ও চালের দাম, দিশেহারা ক্রেতারা
- কোম্পানীগঞ্জে বাসচাপায় মা-মেয়ে নিহত
- পূজার কেনাকাটায় যে বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন
- মমতাকে ছেড়ে দিয়েছে দিল্লির পুলিশ
- জয়া আহসানের লুকে অভিষেকের শারদীয় ফ্যাশন
- কন্যাশিশু দিবস:প্রতি ৩ সেকেন্ডে বাল্যবিয়ের শিকার এক কন্যাশিশু
- নেত্রকোনায় ৪০ নারী পেলেন প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন
- জামালপুরে বাসচাপায় একসঙ্গে প্রাণ গেল শাশুড়ি-পুত্রবধূর
- নেত্রকোনায় ৪০ নারী পেলেন প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন
- শুভ মহালয়া আজ
- মজাদার ইলিশের কাচ্চি বিরিয়ানির রেসিপি
- ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল পানামা
- প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত
- দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিউমার্কেটে জমে উঠেছে কেনাকাটা
- মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরকারের স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক
- জামালপুরে বাসচাপায় একসঙ্গে প্রাণ গেল শাশুড়ি-পুত্রবধূর
- দুর্গোৎসবে বাড়িতে তৈরি করতে পারেন বাহারি সব রান্না
- ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে কী করবেন?
- কন্যাশিশু দিবস:প্রতি ৩ সেকেন্ডে বাল্যবিয়ের শিকার এক কন্যাশিশু
- মমতাকে ছেড়ে দিয়েছে দিল্লির পুলিশ
- বাড়ল তেল ও চালের দাম, দিশেহারা ক্রেতারা
- কোম্পানীগঞ্জে বাসচাপায় মা-মেয়ে নিহত
- জয়া আহসানের লুকে অভিষেকের শারদীয় ফ্যাশন

