ঢাকা, শনিবার ৩১, জুলাই ২০২১ ২২:১৬:৫১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
লকডাউনে আটকেপড়া পোশাক শ্রমিকরা চাকরি হারাবে না দেশে একদিনে করোনায় ২১৮ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৯৩৬৯ ডেল্টার নতুন ধরনে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম শিল্পকারখানা খোলার খবরে ঢাকামুখী মানুষের ঢল হেলেনার বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় আরেক মামলা

একুশে পদকপ্রাপ্ত সাইদা খানম : সাফল্যের বাতিঘর

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:১৫ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার

সাইদা খানম, ফাইল ছবি

সাইদা খানম, ফাইল ছবি

এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানম। আগামী একুশে ফেব্রুয়ারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক জমকালো অনুষ্ঠানে সাইদা খানমসহ একুশ জনের হাতে এ পদক তুলে দেবেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবছর একুশজন গুণীকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে সাতজন নারী।

দেশের শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য (আলোকচিত্র বিভাগে) সাইদা খানম একুশে পদক পেয়েছেন। সাইদা খানম শুধু আলোকচিত্র শিল্পীই নন, তিনি দেশের একজন স্বনামধন্য লেখক এবং সমাজসেবী। একসময় শুধু বংলাদেশই নন সাইদা খানম পূর্ব বাংলারও একমাত্র আলোকচিত্রী ছিলেন। তার পথ অনুসরণ করে পরে অনেক নারী এ পথে হেঁটেছেন।

বর্ষীয়ান এই আলোকচিত্র শিল্পীর তোলা ছবির প্রদর্শনী হয়েছে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে। সত্যজিৎ রায়সহ দেশী-বিদেশী অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি তুলেছেন তিনি। শুধু বিদেশে নয়, ঢাকাতেও তিনি কয়েকবার একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। সাইদা খানম ১৯৭৩ সালে কলকাতায় ‘অল ইন্ডিয়া ফটো জার্নালিজম কনফারেন্সে’ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করে প্রচুর প্রশংসিত হন। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ এশিয়ান গেমসে তিনি বেগম পত্রিকার প্রতিনিধিত্ব করেন। সত্যজিত্ রায়ের বিভিন্ন সময়ে তোলা ছবি নিয়ে তিনবার আয়োজন করেন একক প্রদর্শনী। 

তিনি নিজের তোলা মাদার তেরেসার ছবির প্রদর্শনী করার আয়োজন করেও দেশে বিদেশে প্রচুর প্রশংসিত হয়েছিলেন। তিনি ২০০০ সালে দৃক লাইব্রেরিতে ‘শান্তি নিকেতন ও কণিকা বন্দোপাধ্যায়’ শীর্ষক প্রদর্শনী করেন।

সাইদা খানম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পাবনায়। যদিও তাঁর পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলায়। সাইদা খানমের বাবার নাম আবদুস সামাদ খান এবং মায়ের নাম নাছিমা খাতুন।

সাইদা খানম ১৯৬৮ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে আবার লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করেন ১৯৭২ সালে। পরবর্তীতে ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ছবি তুলতে শুরু করেন। তবে আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি হয় বেগম পত্রিকাতে। বেগম পত্রিকায় তিনি কাজ শুরু করেন ১৯৫৬ সালে। পরবর্তীতে অবজারভার, মর্নিং নিউজ, ইত্তেফাক, সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর ছবি ছাপা হয়। 

এমনকি তিনি অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিত রায়ের ছবিতেও আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি সত্যজিত রায়ের তিনটি ছবিতে কাজ করেন। পাশাপাশি সত্যজিত রায়ের ছবিও তুলেছেন এই গুণী আলোকচিত্রী।

এ পর্যন্ত সাইদা খানম প্রায় ৩ হাজারের অধিক ছবি তুলেছেন। তিনি শুধু প্রকৃতি কিংবা সাংবাদিকতার প্রয়োজনে ছবি তোলেননি, ছবি তুলেছিলেন সময়ের প্রয়োজনে। যে কারণে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রাজনীতিবিদসহ শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের তোলা ছবি তাকে বসিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে। এছাড়া তিনি তাদের ছবি তোলার পাশাপাশি তাদের সান্নিধ্যও লাভ করেছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, ইন্দিরা গান্ধী, রানি এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা, মার্শাল টিটো, শেখ মুজিবুর রহমান, উত্তমকুমার, অড্রে হেপবার্ন, সৌমেন্দ্র নাথ ঠাকুর, কণিকা বন্দোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানী, বেগম সুফিয়া কামাল, মৈত্রেয়ী দেবী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আশাপূর্ণা দেবীসহ অনেকে। এছাড়া পৃথিবীখ্যাত তিন চন্দ্রমানব নীল আর্মস্ট্রং, অ্যাড্রিন অলড্রিনস জুনিয়র ও মাইকেল কলিন্সের ছবিও তিনি তুলেছেন।

প্রথম থেকেই আলোকচিত্রী হিসেবে পেশা গ্রহণের জন্য সামাজিকভাবে তাকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি পাড়ি দিতে হয়েছে। সে সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, বড়বোন অধ্যক্ষা হামিদা খানম ও মহসিনা আলীসহ অনেকে। এছাড়া তাকে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন এদেশের নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃত্ মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন ও ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদিকা নূরজাহান।

সাইদা খানমের এক ভিন্ন মাত্রার ব্যক্তি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ছিল সে সময়ে ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টুডিও ‘জায়েদী স্টুডিও’র মালিক জায়েদী সাহেবের। সাইদা খানম যখন আলোকচিত্রীর পেশা গ্রহণ করেন, তখন এদেশে ছবি তোলার স্টুডিওর সংখ্যা খুবই কম ছিল। পুরো রাজধানী ঘুরে দুইটি স্টুডিওর খোঁজ পাওয়া যেত। এরমধ্যে ‘জায়েদী স্টুডিওই ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে পরিচিত স্টুডিও। এই স্টুডিওর মালিক জায়েদী সাহেব সাইদা খানমের ফটো কম্পোজিশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধ্যান-ধারণা দিয়েছেন। এছাড়া তিনি সাইদা খানমকে ছবি তোলা বিষয়ে প্রচুর বই পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি আমেরিকা, জার্মানির ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিন রাখতেন। এগুলো দেখেই ছবি তুলতে গিয়ে অ্যাপারচার এবং এক্সপোজার সম্পর্কে ভালো ধারণা পান সাইদা খানম। 

নিজের কাজের পাশাপাশি সাইদা খানম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করে আলোকচিত্রে বাংলাদেশেকে তুলে ধরেন। তিনি সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। সাইদা খানম আলোকচিত্রী হিসেবে অংশ নিয়েছেন দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে। 

১৯৭১ সালের আগে ঢাকার আজিমপুরে অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত নারীদের তোলা ছবি তাঁর আলোচিত কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম।

তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ পেয়েছেন নানা পুরস্কারও।১৯৫৬ সালে জাপানে আন্তর্জাতিক কোলন পুরস্কার পান তিনি।এছাড়াও পেয়েছেন জাপানের ইউনেসকো অ্যাওয়ার্ড, অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার, বেগম পত্রিকার ৫০ বছর পূর্তি পুরস্কার এবং বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সম্মানসূচক ফেলো।

ছবি তোলার পাশাপাশি লেখালেখিও করেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো-ধুলোমাটি, আমার চোখে সত্যজিত, স্মৃতির পথ বেয়ে, আলোকচিত্রী সাইদা খানমের উপন্যাসত্রয়ী। বাংলা একাডেমি ও ইউএনএবির আজীবন সদস্য তিনি।