ঢাকা, শনিবার ২৫, মে ২০১৯ ১১:৪৬:৩৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
গুজরাটে কোচিং সেন্টারে আগুন, ১৮ শিক্ষার্থী নিহত পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন থেরেসা মে, কাঁদলেনও

এশিয়ায় নারীবাদ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : আইরীন নিয়াজী মান্না

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৩ পিএম, ৮ মার্চ ২০১৯ শুক্রবার

এশিয়ায় নারীবাদ নিয়ে চর্চা হচ্ছে বহু যুগ থেকেই। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় এশিয়ার ফেমিনিজম বা নারীবাদকে পাশ্চাত্যবাসীরা সাধারণতঃ একটু অবজ্ঞার চোখেই দেখে। তাদের ধারনা যেখানে পারিবারিক নির্যাতন অহরহ ঘটছে, পণপ্রথা সমাজের একটা অঙ্গ, অসংখ্য নারীর জীবন কাটছে চার-দেয়ালের মধ্যে, সেখানে আবার নারীবাদ কি? অথচ এশিয়ার ইতিহাস পড়লে দেখা যাবে, পাশ্চাত্য-নারীবাদকে অনুকরণ না করলেও নারীদের অ্যাক্টিভিজম বা সক্রিয় ভূমিকার বহু উদাহরণ এ মহাদেশে রয়েছে এবং বহু আগে থেকেই রয়েছে। 

এশিয়ার নারীবাদের সঙ্গে পাশ্চাত্য নারীবাদের ব্যাপক ফারাক। কারণ এশিয়ার নারীরা পাশ্চাত্য ‘ফেমিনিজম’-এর অন্ধ অনুকরণ করে নি। কেন করে নি, তার একটা কারণ হল, এশীয় নারীবাদের মূলে মেয়েদের উপর পুরুষ-কেন্দ্রিক সমাজের চাপ ছাড়াও আরও কতগুলি শক্তি কাজ করেছে। যেমন, নারী অবদমনে (জেণ্ডার অপ্রেশন) সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার প্রভাব, ব্যক্তিসত্বা বনাম গোষ্ঠীসত্বা প্রভৃতি। এশীয় নারীবাদ বা থার্ড ওয়াল্ড ফেমিনিজমের বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে নারী অবদমনের সূত্রগুলির মধ্যে বর্ণভেদ (race), জাত বা শ্রেণীভেদ (caste/class), যৌনতা (sexuality), সাম্রাজ্যবাদ (imperialism), লিঙ্গভেদ (gender) এবং সরকারের ভূমিকা-সবকিছুই পড়ে।

বহু এশীয় সমাজে নারীদের হীনাবস্থার মূলে রয়েছে ঐতিহ্য, সামন্ততন্ত্র, ঔপনিবেশিকতা এবং পুরুষকেন্দ্রিক সমাজ ও পরিবারে ক্ষমতার সুস্পষ্ট স্তরভেদ বা ‘হায়ারার্কি’। ফলে প্রথম দিকে নারীবাদীদের চেষ্টা ছিল মেয়েদের এই হীনাবস্থা থেকে মুক্ত করা। অন্যপক্ষে গত শতাব্দীর ৭০ ও ৮০ দশকের নারীবাদী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নারীমুক্তি ও ক্ষমতায়ন এবং নারীদের রাষ্ট্রীয় রাজনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসা। 

এশিয়ার নারীবাদী ঐতিহ্য প্রধানতঃ উচ্চশ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজের আলোকিত নারীরা এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। কিন্তু দারিদ্রের পরিপ্রেক্ষিতে নারীবাদীরা মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। এক সময় নারীবাদ সংক্রান্ত আলোচনা ও কাজকর্ম মূলতঃ এনজিওর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের ভূমিকা ছিল নগণ্য।

দক্ষিণ এশিয়া : বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল
দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে একাধিক নারীর অবদান ইতিহাসে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু সঙ্ঘবদ্ধভাবে নারীরা যোগদান করে বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে। স্বাধীনতার পরে ক্রমশ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী নারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। যেমন, ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ (১৯৭০ খ্রী), ‘ভয়েস অব উইমেন ইন শ্রীলঙ্কা’ (১৯৭৮ খ্রী), ‘ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান উইমেন’ (১৯৫৪ খ্রী), ‘উইমেনস অ্যাকশন ফোরাম ইন পাকিস্তান’ (১৯৮১), ‘উইমেনস ফাউন্ডেশন অব নেপাল’ (১৯৮৮ খ্রী)। এ প্রতিষ্ঠানগুলি অন্যান্য নারীসংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে নারীদের প্রতি সরকারের করা বৈষম্যমূলক নানা নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নে সাহায্য করে যাচ্ছে। 

যদিও এ সংস্থাগুলি পাশ্চাত্য নারীবাদী চিন্তাধারায় প্রভাবিত। কিন্তু এদের মতাদর্শ দেশের সংস্কৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের নারীবাদীরা সক্রিয় হয়েছেন রাজনৈতিক মঞ্চে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, নারী-নির্যাতন রোধে এবং সামগ্রিকভাবে নারীদের অবস্থার উন্নতিতে তারা সক্রিয়। যদিও অনেক অঞ্চলেই এ সংস্থাগুলিকে কাজ করতে হচ্ছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গৃহযুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান, মৌলবাদ, দারিদ্র প্রভৃতির মধ্যে। তা সত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার নারী সংস্থাগুলি খুবই সজীব এবং জোরদারভাবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

পূর্ব এশিয়া : চীন, জাপান ও কোরিয়া 
চীনদেশের নারীবাদের সূচনা উনবিংশ শতাব্দীতেই হয়েছিল। সেই সময় বহু নারী স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করা জন্য বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। বিপ্লবের পর পঞ্চাশ দশকে কমিউনিস্ট সরকার বিবাহ ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দিয়ে নারীদের বাইরের কর্মজগতে যোগ দেবার আহবান জানায়। এ সময় বহু নারী সংস্থার সৃষ্টি হয়, যাদের বেশির ভাগই ছিল সরকারি নিয়ন্ত্রণে। এ সব সত্বেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চীন সরকারের এক-সন্তান নীতি নারীদের প্রতি অত্যাচার বৃদ্ধির কারণ হয় এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক গর্ভপাত ভয়াবহ আকার নেয়। মাও যুগের পরে অত্যাধিক কনসিউমারিজম এবং ব্যাপক বেকারত্ব, চাকরির বাজারে মেয়েদের কোণঠাসা করে ফেলে। এ সময় সংসারে তাদের চিরকালীন ভূমিকা পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জাপানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং কোরিয়ার যুদ্ধের পর দ্রুত শিল্পায়ন এ দুটি দেশের নারী আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। জাপানের নারীবাদীরা উনবিংশ শতাব্দীতে তাদের দুর্দশা দূর করার জন্য যে সঙ্ঘবদ্ধতা অর্জন করেছিল, তাকে কাজে লাগিয়ে এই বৈদেশিক অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলিকে তুলে নিতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে এ নারী সংস্থাগুলি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি, প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের সংস্থান এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধাগুলো সুনিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়। 

বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে কোরিয়া ও জাপানের নারীরা শ্রমিকের কাজ নিতে শুরু করে। ১৯৫৬ সালে জাপানে প্রথম নারী শ্রমিক সংস্থা (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতিষ্ঠিত হয়। তা সত্বেও মেয়েদের কাজ বাইরে (pro-work) না সন্তানপালনে (pro-motherhood)-এ দুই চিন্তাধারা জাপানের নারীবাদী আন্দোলনকে দ্বিধাবিভক্ত করে। নব্বই দশকের প্রথম দিকে নারীরা আবার সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সরকারকে বাধ্য করে পার্ট-টাইম কর্মীদের চাকরার সুরক্ষা করতে এবং কর্মী মায়েদের সুযোগ-সুবিধা দিতে। এগুলির পরে জাপানী নারীবাদী সংস্থা বেশ্যাবৃত্তি, নারীপাচার, যৌনকেন্দ্রিক ভ্রমণ (sex tourism), প্রজনন অধিকার (reproductive right) ও নারী-নির্যাতনের ব্যাপারে আত্মনিয়োগ করেছে।

কোরিয়াতে নারীশ্রমিকদের আর্থিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। ১৯৮৩ সালে কোরিয়ার নারীরা সরকারকে চাপ দিয়ে নারীদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার জন্য একটি বিশেষ সংস্থা, কোরিয়ান উইমেন’স ডেভালপমেণ্ট ইনস্টিটিউট তৈরি করায়। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে নারীদের উদ্যোগে শ্রম সংক্রান্ত ব্যাপারে নারী-পুরুষের সমানাধিকার আইন গৃহীত হয়। জাপান ও কোরিয়া দু’দেশেই রাজনৈতিক ব্যাপারে নারীদের প্রভাব উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া : ইন্দোমেশিয়া, মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনাম 
বিশ্বায়নের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষিত শহুরে চাকুরিজীবি নারীর একটি নুতন দল সৃষ্টি হয়। এদের আর্থিক সঙ্গতি এবং রাজনৈতিক জগতে প্রভাব থাকার ফলে এই দেশগুলিতে নারী-পুরুষের যেসব বৈষম্য ছিল সেগুলি নুতনভাবে দেখা শুরু হয়। কিন্তু বিশ্বায়নে পাশ্চাত্য দেশগুলির সঙ্গে এদের প্রচুর যোগাযোগ থাকলেও পাশ্চাত্য নারীবাদের পথ অনুসরণ না করে এরা নিজেদের সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের নারীবাদকে প্রতিষ্ঠা করে। যেমন, মালয়েশিয়াতে নারী-প্রতিষ্ঠান ‘সিস্টার্স ইন ইসলাম’ (১৯৮৮ খ্রী) মুসলমান ধর্মের ভেতরেই নারীদের অধিকার ও দাবিদাওয়ার উত্তর খোঁজে।

বিংশ শতাব্দীর ৮০ দশক থেকেই দক্ষিণ এশিয় নারীবাদীরা গৃহভৃত্যদের ও বহুজাগতিক সংস্থায় কর্মরতা শ্রমিকদের কাজের আবহাওয়া নিয়ে, পারিবারিক নির্যাতন, বহু-বিবাহ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে। 

ফিলিপিনসে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলিকে সরানোর জন্য ঐদেশের নারীবাদীরা সক্রিয় ভূমিকা নেয়। থাইল্যান্ডের নারীবাদীরা তাদের শক্তির অনেকাংশই ব্যয় করে বেশ্যাবৃত্তি নিরোধ এবং নারী পাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে।

ভিয়েতনামের নারী আন্দোলনের ঐতিহ্যের শুরু ৪০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে-যখন দুই ট্রুং ভগ্নী আক্রমণকারী চীনা সৈন্যদলকে শুধু একদল নারী-সৈন্য নিয়ে বাধা দিয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বুই থি উয়ান নামে এক নারী চাষী আন্দোলনের পুরোধায় ছিলেন। আধুনিক যুগে ভিয়েতনামে প্রথম নারী সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় গত শতাব্দীর ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে। ১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিপ্লবে, ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এবং ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দে কাম্বোডিয়া ও চীনের আক্রমণ রুখতে ভিয়েতনামের নারীদের অবদান যথেষ্ট। 

ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার নারীদের অধিকার-সংক্রান্ত দাবি-দাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং নারীদের উপর সমাজের চাপ (পুরুষ ও সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ) খর্ব করার জন্য সচেষ্ট হয়েছে। এতগুলো যুদ্ধের পর দেশের উন্নয়নে নারীদের ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ তা সরকার বুঝতে পেরে নারী-শ্রমিকদের (বিশেষ করে শ্রমিক মায়েদের) সুবিধার্থে নানা আইন প্রণয়ন করেছে।

মধ্য এশিয়া : উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান এবং কাজাকস্তান 
গত শতাব্দীর আশির দশকে সোভিয়েত রাজ্যগুলি বিভক্ত হবার পর, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। নতুন ভাবে তাদের সরকারি নীতিগুলো প্রতিষ্ঠা করে। এই সামাজিক-রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে নারীদের যেসব অধিকার সোভিয়েত জমানায় স্বীকৃত ছিল সেগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। অবশ্য কমিউনিস্ট রাজত্বেও এই অঞ্চলগুলির সংস্কৃতিতে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। 

স্বাধীন হবার পর ধর্মের অনুশাসনগুলি নতুনভাবে নারীদের উপর চাপানোর চেষ্টা শুরু হয়। পর্দা-প্রথা আবার ফিরে আসতে শুরু করে। সোভিয়েত সরকারও নারীবাদকে বিভেদ-সূচক বলে মনে করত। সে মানসিকতা এই নতুন দেশগুলিতেও পুরোমাত্রায় থেকে যায়। নারী অন্দোলন যখন নারী-নির্যাতন, প্রজনন অধিকার, যৌনতা এবং লিঙ্গ-বৈষম্য নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন এসব দেশগুলতে রাজনৈতিক জগতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কমছে। 

৥ আইরীন নিয়াজী মান্না : লেখক ও সাংবাদিক, সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম