ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২০, জুন ২০১৯ ৬:৪৯:০১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রির খাবার, ১০ জনের কারাদণ্ড নরসিংদীতে স্কুলছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪ জাপানে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি দুই মামলায় খালেদার ৬ মাসের জামিন

চাই না আমার সন্তান ক্লাসে প্রথম হোক : জাহানারা পারভীন

জাহানারা পারভীন | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:২৬ এএম, ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ বুধবার

আমি চাই না ক্লাসে প্রথম হোক আমার সন্তান। সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে নামকরা স্কুলে তাকে ভর্তি করতে ছুটোছুটি করিনি। বাসার পাশে মাঝারি মানের স্কুলে সে পড়ে। বড় হয়ে সে কি হবে জানি না। যাই হোক, সবার আগে যেন মানুষ হয়। চারপাশে মানুষের বড় অভাব। আমার জীবনের সব অপূর্ণ স্বপ্ন সে পূরণ করবে তাও চাই না। শুধু চাই সে যেন বড় হয়ে নিজের দায়িত্ব নিতে পারে।

পড়াশোনার চাপে যেন তার শৈশব নষ্ট না হয় এটা খেয়াল রাখার চেষ্টা করছি। ওর শৈশবের দিকে তাকালে মনে হয় নিজের ছোটবেলার কথা। প্রধানত বইয়ে ডুবে থাকা শৈশব আমাকে কাটতে হয়েছে। স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর। নিজের জন্য খেলার জন্য সময়ও ছিল না। পড়াশোনায় কখনও ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাইনি। ভালো ফলাফল করাই ছিল জীবনের লক্ষ্য। সত্যি বলছি; যেসব কালো অক্ষর মুখস্থ করেছি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইচ্ছে/ অনিচ্ছায়। সব ভুলে গেছি। কিছুই মনে নেই। স্কুল কলেজ গতানুগতিক চাকরির জন্য তৈরি করলেও শেখায়নি জীবনের পাঠ। মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষ চেনার কৌশল। এর খেসারত পদে পদে দিতে হয়েছে।

মানুষ ও জীবন না চেনার অপরাধ। আমার বাবা-মা শিক্ষকেরা যা করেননি। যার জন্য অনেক ভুল সিদ্ধান্তের ফাঁদে পড়তে হয়েছে। আমি চাই না এর পুনরাবৃত্তি হোক আমার পুত্রের জীবনে। এই জীবন চেনানোর চেষ্টা কিছুটা চলছে। আমার বাবা মা সব সময় বলেছেন মিথ্যা না বলতে। কিন্তু চারপাশে যে অধিকাংশ মানুষ মিথ্যা বলে তাদের চেনা বা তাদের শব্দ থেকে বাঁচতে সতর্ক করেননি। আমি চেষ্টা করছি কিছুটা। ছেলে কখনও স্কুল ফাঁকি দিতে চাইলে বা সামান্য গা গরম হলে স্কুল বন্ধ। কোনও দিন ঘুম থেকে না উঠতে চাইলে সেদিন অঘোষিত ছুটি। যদিও এমন সচরাচর হয় না। কিন্তু ওর ইচ্ছের সঙ্গে থাকা। এটাও ঠিক মায়ের কাছে যতটা সময় প্রাপ্য তার অর্ধেকও দিতে পারি না। তাই প্রচলিত শিক্ষার ফাঁদ থেকে, নিজের সামর্থ্যের চেয়ে ভারি স্কুল বেগের বোঝা থেকে ওকে বাঁচানোর যেহেতু সামর্থ্য নেই। নতুন করে ওর জীবন তিতে করার অধিকারও আমার নেই।


কিছুদিন আগে ওর স্কুল থেকে ডাক আসে। আসামি সন্তানের মা হিসাবে। চর্যা খুব সঙ্কোচের সঙ্গে জানায় যে ওর মিস আমাকে দেখা করতে বলেছে। গিয়ে দেখি শুধু আমি না আরও বেশ কিছু মা। সঙ্গে তাদের নির্বাচিত বাচ্চারা। একের পর এক অপরাধের কথা উঠে আসে। কেউ মিসের মুখের ওপর কথা বলে, হেসে ওঠে। কেউ বা ক্লাস চলার সময় অন্য শিশুর সঙ্গে গল্প করে। কেউ হিন্দি সিনেমা দেখে। স্কুলে এসে সেই ছবির গল্প করে। কেন সে এই বয়সে এসব ছবি দেখে?

এসব শুনতে শুনতে অপেক্ষা করি নিজের ছেলের আমলনামার। মিস ওকে নিয়ে কিছু না বলায় এক সময় আমি জানতে চাই আমি চর্যার মা, ওর অপরাধ কি? আমাকে এখানে ডাকার কারণ। মিস বলেন, ও এই দুষ্ট বাচ্চাদের বন্ধু। এদের সঙ্গে সে মেশে। আমি বলি, যে আমার ছেলে একটু দুষ্ট আমি জানি। কিন্তু সে কি কোনও অপরাধ করেছে বা বেয়াদবি ? মিস কিছু বলতে পারেননি। সেদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে মনে হলো নয় দশ বছরের কিছু শিশু ক ঘন্টার জন্যই বা স্কুলে থাকে , কিই বা তাদের অপরাধ? একটু সহ্য করার ধৈর্য নেই!

ছেলেকে একটুও বকিনি। ওকে একটা বিষয় শেখানোর চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি যাই হোক তা মোকাবিলা করতে হবে। ভুল হতে পারে। তা শুধরে নিতে হবে। অপমান জীবনে তো আসতেই পারে; কঠিন অপমান। তা হজম করাটাও একটা শিল্প। তা না করে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া কাপুরুষের আচরণ। এটা স্কুল নয়, বাবা মাকেই শেখাতে হবে। চারপাশের মানুষ যত নির্মমই হোক, যত অযৌক্তিক অপমানই আসুক তা মোকাবিলার কৌশল সবার আগে শেখাতে হবে সন্তানকে। স্কুল- কলেজ এসব শেখায় না। এই দায়িত্ব পরিবারের। এই পোড়া দেশের পরতে পরতে অপমান অপেক্ষা করে থাকে মানুষের জন্য।

৥ লেখক জাহানারা পারভীন : সিনিয়র সাংবাদিক