ঢাকা, শুক্রবার ১৩, ডিসেম্বর ২০১৯ ১৮:৩২:১৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস কাল গুগল সার্চের শীর্ষ দশে দীপু মনি রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যুতে শুনানি শেষ; শিগগিরি রায় পেঁয়াজের দাম কমে অর্ধেকে নেমেছে, সবজিতেও স্বস্তি বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় শেখ হাসিনা ফিলিপাইন্সে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ ৬ জন নিহত

চীনা উপন্যাস ‘সুই হু চুয়ান’

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৩৭ এএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ শনিবার

চীনা সাহিত্য বহু প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। চীনা সাহিত্যের একটি নিজস্ব ধারা রয়েছে। সেই ধারা অনুসরণ করে আজ এ সাহিত্য বিশ্ব দরবারে স্থান করে নিয়েছে। সারা বিশ্ব আজ চীন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। চীনের অর্থনীতি সম্পর্কে তারা যেমনি জানতে চায় তেমনি জানতে চায় চীনা শিল্প, সংস্কৃতি, নাটক, সিনেমা এবং সাহিত্য সম্পর্কে।

চীনের প্রাচীন সাহিত্যের কয়েকটি বিখ্যাত উপন্যাসের অন্যতম ‘সুই হু চুয়ান’।  বাংলা অনুবাদ করলে এর অর্থ দাড়ায় ‘পানি প্রান্তর’।

পানি প্রান্তরের লেখক শি ন্যাই আন। তিনি ছিলেন ইউয়াং রাজবংশের শেষ দিকে ও মিং রাজবংশের প্রথম দিকের একজন সফল উপন্যাসিক। তার লেখা এই উপন্যাস আজও চীনসহ সারা বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়।

‘পানি প্রান্তর’ উপন্যাসটি চীনের উত্তর সোং রাজবংশের শেষ দিকে সোং চিয়াংয়ের নেতৃত্বে একশ আটজন বীরের লিয়াং শান পাহাড়ে বিদ্রোহের কাহিনীকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। চীনের সাহিত্যের ইতিহাসে এ উপন্যাসটি প্রথম প্রচলিত ভাষায় লেখা কাব্য উপন্যাস।

চীন তথা পূর্ব এশিয়ার সাহিত্যে এ উপন্যাসের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।

এ উপন্যাসে চীনের কৃষক বিদ্রোহ, এ বিদ্রোহের বিকাশ ও ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ের নিখুঁত বর্ণনা করা হয়েছে। বিদ্রোহের ঘটনার সামাজিক উত্স গভীরভাবে উদঘাটন করা হয়েছে। বিদ্রোহে জড়িত বীরদের সামাজিক আদর্শের প্রশংসা করা হয়েছে উপন্যাসে। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার অভ্যন্তরীণ ঐতিহাসিক কারণও চমত্কারভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

পানি প্রান্তর উপন্যাসে কয়েক শ চরিত্র রয়েছে। এ কারণে উপন্যাসটিকে বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে চরিত্রের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় উপন্যাস বলা হয়।

এ উপন্যাসে সাফল্যের সঙ্গে লু চিং শেন, লি খুই, উ সোং, লিন ছোং, ইউয়েন সিয়াও ছিসহ বেশ কয়েকজন বীরের চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের কথাবার্তা প্রাণবন্ত, তাদের চরিত্র সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ। আর উপন্যাসের গল্পও বেশ জটিলভাবে এগিয়েছে।

পানি প্রান্তর উপন্যাসে চীনা কৃষক বিদ্রোহে জড়িত বীরদের প্রশংসার পাশাপাশি, তত্কালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কাও ছিউসহ নানা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপকর্ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দেশের সম্পদ করায়ত্ব করাসহ নানা অনিয়ম ও অসসতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।  প্রধানমন্ত্রী কাও ছিউয়ের নেতৃত্বে একদল সরকারি ক্ষমতাধর ব্যক্তি কি ভাবে দেশকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিনিয়ত তা উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের দেশপ্রেমের কথা।

পানি প্রান্তর উপন্যাসে দেখা যায়, স্বৈরশাসনের মাধ্যমে জনগণকে নিপীড়ন করার ফলে জনসাধারণের মনে ঘৃণার আগুন জ্বলে উঠে। ফুঁসে ওঠে দেশের সাধারণ জনগণ। ধাপে ধাপে বিদ্রোহ আন্দোলনে রূপ নেয়। কিন্তু বিদ্রোহীদের নেতা সোং চিয়াংয়ের মনে রাজতন্ত্রের গভীর চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। ফলে তারা কেবল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরোধিতা করেন। সরকারের বিরোধিতা করেন না। তারা বিদ্রোহের মাধ্যমে তৎকালীন সামন্তরাজ্যকে উল্টেপাল্টে দেন। কিন্তু নতুন সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেই তাদের। এটি ছিল তাদের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা।  চীনের সাহিত্য ইতিহাসে প্রথম সার্বিক ও বাস্তবসম্মতভাবে কৃষক বিদ্রোহের সার্বিক কাহিনী ‘পানি প্রান্তর’ উপন্যাসেই প্রথবারের মত উপস্থান করা হয়।

লিন ছোং ‘পানি প্রান্তর’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র। তিনি সরকারি বাহিনীর প্রায় আট লাখ সৈনিকের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক। তার স্ত্রী অপূর্ব সুন্দরী। দু’জন দু’জনকে খুব ভালোবাসেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও বেশ ভালো।
একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী কাও ছিউ’র পালিত পুত্রের লিন ছোংয়ের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়। সুন্দরী এই নারীকে দেখে কাও ছিউ’র লম্পট পালিত পুত্রের তার প্রতি দৃষ্টি পরে। এই নারীকে বিভিন্নভাবে অপদস্ত করার চেষ্টা করে সে। লিন ছোং এ ঘটনা জেনে খুবই বিক্ষুব্ধ হন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথা ভেবে তিনি এ অপমান সহ্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী কাও ছিউর পুত্র কিন্তু থেতে থাকে না। সে লিন ছোংয়ের স্ত্রীকে কাছে পাওয়ার জন্য নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। বাবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে লিন ছোংকে নানা রকম কষ্ট দেয়ার মতলবে থাকে সে সব সময়। লিন ছোং প্রথম প্রথম সব মেনে নেয়। হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে এ ভেবে লিন ছোং সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে। তাছাড়া সে কোনো রকম ঝামেলায় জড়াতে চায় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুত্রের ষড়যন্ত্রে লিন ছোংকে হত্যা করার আদেশ দেয় প্রধানমন্ত্রী কাও ছিউ। এই ঘটনা শুনে লিন ছোংয়ের স্ত্রী আত্মহত্যা করে।

স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় রাগে-দূ:খে লিন ছোং বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। প্রতিশোধ নিতে তিনি একদিন লিয়াং শান পাহাড়ে পালিয়ে যান। বেশ কিছু বিদ্রোহী সঙ্গি নিয়ে তিনি ধাপে ধাপে সংগঠিত হন। লিয়াং শান পাহাড়ে অবস্থান করে এক সময় প্রধানমন্ত্রী কাও ছিউ’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। স্বৈরশাসকের হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পরেন তিনি। উদ্ধার করার চেষ্টা করেন দেশবাসীকে।

‘পানি প্রান্তর’ উপন্যাসের চীনা নাম ‘সুই হু চুয়ান’। বিদ্রোহীদের বিদ্রোহের জায়গাগুলোকে ‘লিয়াং শান’ বলা হয়। তত্কালীন সরকারের কাছে লিয়াং শানের যোদ্ধারা বিদ্রোহী বাহিনী হলেও সাধারণ মানুষের চোখে তারা মহাবীর বা হিরো।

চীনের মহান নেতা মাও সে তুংয়ের প্রিয় উপন্যাস ‘পানি প্রান্তর’। তিনি এ উপন্যাসটি বার বার পড়তে পছন্দ করতেন। তার বিপ্লবী জীবনে ‘পানি প্রান্তর’ উপন্যাসের বেশ প্রভাবও ছিলো। তিনি বার বার এ উপন্যাস পড়তেন এবং বিশ্লেষণ করতেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রাচীনকালের কৃষকদের এই বিপ্লবের কাহিনী চীনের আধুনিক বিপ্লবের ওপর বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

পানি প্রান্তর উপন্যাস জাপানী, জার্মান, ফরাসী, ইংরেজি ও ইতালিয়সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বিভিন্ন ভাষার অনুবাদ বইয়ের নামও বিভিন্ন রকম। যেমন, জার্মান ভাষায় উপন্যাসটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দস্যু ও সৈনিক’। ফরাসী ভাষার নাম দেওয়া হয়েছে ‘চীনের যোদ্ধারা’। ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছে ‘পানি প্রান্তর’। তবে এ সব অনুবাদ কাজগুলোর মধ্যে মার্কিন লেখক পার্ল এস বাকের (Pearl Buck) অনুবাদ সবচেয়ে প্রশংসা পেয়েছে। তিনি তার অনুবাদ কর্মের নাম দিয়েছেন ‘সব পুরুষ ভাই ভাই’। (All Men Are Brothers)।

বিদেশী লেখকরা এ উপন্যাসের কোনো কোনো চরিত্র নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে ছোট গল্প অনুবাদ করেছেন। এই গল্পগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ইতালিয় এক লেখক লু চিং শেনের গল্প নিয়ে লিখেছেন ‘বুদ্ধের দাঁত’ (Buddha’s tooth)। জার্মান এক লেখক ইয়াং সিয়াং ও পান ছিও ইউয়েনের গল্পের অনুবাদ করেছেন ‘পবিত্র মন্দির’ নামে। বৃটিশ এক লেখক লিন ছোংয়ের গল্পের  অনুবাদ করেছেন ‘এক বীরের গল্প’ নামে।

# আইরীন নিয়াজী মান্না : লেখক ও সাংবাদিক