ঢাকা, শুক্রবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৮:১৬:৪৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
নয়নের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার মিন্নির, দিলেন বর্ণনা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ত্যাগ খুলনা মেডিকেলে ডেঙ্গু জ্বরে গৃহবধূর মৃত্যু

জোয়ান অব আর্ক : ফ্রান্সের রক্ষাকর্তা

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:২৫ পিএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

জোয়ান অব আর্ক।  ১৪১২ সালের ১৫ জানুয়ারি ফ্রান্সে এক কৃষক পরিবারে তার জন্ম। পরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা।  ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের (১৩৩৭-১৪৫৩) সময় জোয়ান অব আর্ক ফ্রান্সের সৈন্যবাহিনীকে নেতৃত্ব দেন।  তার মাধ্যমে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের শত বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটে।

পূর্ব ফ্রান্সের এক সামান্য কৃষকের ঘরে জন্ম নেওয়া জোয়ান ফরাসী সেনাবাহিনীর জন্য বিরল যুদ্ধজয় এনে দিয়েছিলেন।  তার নেতৃত্বেই ফ্রান্স জিতে নেয় তাদের বেহাত হয়ে যাওয়া ভূমি।  অনেকের ধারনা জোয়ানের ভবিষ্যত দেখার ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল।  তিনি সপ্তম চার্লসের ক্ষমতারোহনের পেছনেও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

দেশের এত গৌরব বয়ে আনা সত্বেও তাকে বার্গুনডিয়ানরা আটক করে ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দেয়।  সেখানে একটি খৃষ্টান আদালতের রায়ে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়।  সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯।

তার মৃত্যুর ২৪ বছর পর সপ্তম চার্লসের উদ্যোগে পোপ তৃতীয় ক্যালিক্সটাস তার পুনর্তদন্তে জোয়ানকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেন।  তখন তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হয়।

জোয়ান লেখাপড়া জানতেন না।  কথিত আছে, মাত্র তের বছর বয়সে মাঠে ভেড়ার পাল চরাবার সময় তিনি দৈববাণী শুনতে পান যে তাকে মাতৃভূমির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও ফ্রান্সের প্রকৃত রাজাকে ক্ষমতায় পূনর্বহাল করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।  এই দৈববানী তার জীবনকে আমূল পালটে দেয়।

এর পর জোয়ান অনেক চেষ্টা করে ফ্রান্সের পলাতক রাজা সপ্তম চার্লসের সঙ্গে দেখা করেন এবং দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য তার কাছে সৈন্য প্রার্থনা করেন। রাজা প্রথমে অবজ্ঞা প্রদর্শন করলেও যাজক সম্প্রদায়ের পরামর্শে জোয়ানকে সৈন্যসাহায্য দিতে সম্মত হন।

চাষীর মেয়ে জোয়ান বলেছিলেন তিনি অন্তর্দৃষ্টিতে দেখেছেন যে ইশ্বর তাকে বলছেন ইংল্যান্ডের হাত থেকে মাতৃভূমি উদ্ধার করতে। তখন মুকুটহীন রাজা সপ্তম চার্লস তাকে অর্ল্যান্স উদ্ধারের মিশনে পাঠান। তার নেতৃত্বে মাত্র নয় দিনে তিনি অর্ল্যান্সকে মুক্ত করেন।  পরবর্তীতে জোয়ানের আরো কয়েকটি বিজয় সপ্তম চার্লসকে রেইমসের সিংহাসনে আসীন করে এবং একই সাথে সিংহাসন নিয়ে বিরোধের মিমাংসা করে।

এর আগে প্রায় শত বর্ষ ধরে ধরে চলা যুদ্ধে ফরাসীদের অবস্থা খুবই নাজুক ছিল।  ১৩৩৭ সালে বৃটিশদের সাথে এই যুদ্ধ শুরু হয় এবং তাদের রণকৌশনের কাছে একের পর এক ফরাসীরা পরাস্ত হতে থাকে।

একপর্যায়ে বৃটিশরা প্রায় দুটি রাজতন্ত্রের অধিকারী হতে চলে পাশাপাশি ফরাসীরা কয়েক প্রজন্ম ধরে কোন ধরনের যুদ্ধজয়ের মুখই দেখলোনা।

জোয়ানের জন্মের সময়কালে ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস উন্মাদ হয়ে যান ও রাজ্য পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েন।  তখন রাজার ভাই ডিউক লুইস অব অর্ল্যান্স এবং রাজার চাচাতো ভাই জন দ্যা ফিয়ারলেস, বার্গুন্ডির ডিউক রাজক্ষমতার জন্য কলহে লিপ্ত হন এবং রাজবংশ ও রাজকীয় পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে ব্যাপক বিরোধ জন্ম নেয়।

বিরোধ আরো বৃদ্ধি পায় যখন বেভোরিয়ার রানী ইসাবিরুর অবৈধ সম্পর্কের কথা ফাঁস হয়ে যায়। ১৪০৭ সালে ঘটনা একেবারে ক্লাইমেক্সে পৌঁছায় যখন ডিউক অব বার্গুন্ডির আদেশে ডিউক অব অর্ল্যান্সকে হত্যা করা হয়।

এই দ্বিধা বিভক্ত রাজ্যের অনুসারীরা আরমাগনাস ও বার্গুনডিয়ানস নামে বিভক্ত হয়ে পরে।  ইংলিশ রাজা পঞ্চম হেনরী এর পুরো সুযোগ নিয়ে ১৪১৫ সালে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের শহরগুলো দখল করে নেন।  

এদিকে সপ্তম চার্লসের চার ভাই মারা গেলে, তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন।  তার একটি অনবদ্য কীর্তি ছিল বার্গুন্ডিয়ানদের সাথে ১৪১৯ সালে শান্তি স্থাপন।  তবে এই শান্তি চুক্তি বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি।  জন দ্যা ফিয়ারলেস চার্লসের গ্যারান্টি প্রটেকশনে থাকা কালিন অবস্থায় জনৈক আরমাগনাস ব্যক্তি তাকে হত্যা করে।  বার্গুন্ডির নতুন ডিউক ফিলিপ দ্যা গুড এই হত্যাকান্ডের জন্য চার্লসকে ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়ে তাকে হত্যার অভিযোগ করেন।

জোয়ানের বাবার নাম জ্যাক ডি'আর্ক ও মা ইসাবেল রোমিই।  জন্মস্থান ডোমাঁয়েই।  তার পিতার ৫০ একর জমি ছিল।  তা ছাড়া তিনি ক্ষুদ্র একটি সরকারি কাজ করতেন।  সেটা হলো গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে খাজনা আদায়।  তাদের গ্রামকে ঘিরে বার্গুন্ডিয়ানদের এলাকা।  প্রায়ই তাদের আশেপাশের গ্রামগুলোতে তারা হানা দিত।  একবার জোয়ানদের গ্রামও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।

জোয়ানের ভবিষ্যতবানী সত্যি হবার খবরে রবার্ট ডি বোউয়িকোর্ট তাকে তাকে সপ্তম চার্লসের কাছে নিয়ে যান।  সেখানে যাবার পথে শত্রুভূমি বার্গুন্ডিয়ানদের অধিকৃত অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে হয়।  সেখান দিয়ে জোয়ান পুরুষ ছদ্মবেশ ধারণ করে যান।

যখন জোয়ান রাজদরবারে পৌঁছান চার্লস অর্ল্যান্ডস উদ্ধারের বৈঠক করছিলেন।  চার্লসের শাশুড়ি ইয়োলান্দে অব আরাগন অর্ল্যান্ডস উদ্ধারে অর্থ সহায়তা করছিলেন।  জোয়ান সেনাবাহিনীর সাথে নাইটের পোষাকে যাবার অনুমতি প্রার্থনা করেন।

তবে তাকে তাৎক্ষনিকভাবে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেয়া হয়নি।  তাকে বেশ বেগ পেতে হয় অনুমতি পাবার জন্য।  জোয়ান তৎকালিন ফ্রেঞ্চ নেতৃত্বের রক্ষনাত্বক রণকৌশল পরিহার করে আক্রমনাত্বক কৌশল অবলম্বন করেন এবং অর্ল্যান্ডকে মুক্ত করেন।

আকস্মিক অর্ল্যান্ডসকে হারিয়ে বৃটিশরা পুনরায় প্যারিস দখল অথবা নরম্যান্ডি আক্রমনের পরিকল্পনা করে। এদিকে যুদ্ধে জেতার পর জোয়ান সপ্তম চার্লসের কাছে রেইমসকে উদ্ধারে লরেঁ দখলের জন্য তাকে দ্বিতীয় ডিউক জন আলেনকনের সাথে সেনাবাহিনীর যৌথ নেতৃত্ব চান। চার্লস তা মঞ্জুর করেন। প্যারিসের তুলনায় রেইমস দ্বিগুন বড় আর একেবারে শত্রুব্যুহের ভেতর অবস্থিত।

এরপর ফরাসী সেনাবাহিনী ১২ জুন জারগিউ, ১৫ জুন মেউনগ-সর-লরেঁ ও ১৭ জুন বারগুন্ডি দখন করেন। ডিউক আলেনকন স্বীকার করেন এ সবই জোয়ানের সিদ্ধান্তে হয়েছে। আলেনকন জারগিউতে তার জীবন বাঁচানোর জন্যও জোয়ানের কথা উল্লেখ করেন।  ৩ জুলাই ফরাসী সেনারা বার্গুনডিয়ান শহর দখল করে নেয়।

রেইমস দখলের পর তার দরজা ১৬ জুলাই খুলে দেয়া হয়।  জোয়ান ও ডিউক আলেনকন দ্রুতই প্যারিস অভিমুখে যেতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু রয়েল কোর্ট বার্গুন্ডির ডিউকের সাথে আলোচনার আদেশ দেয়।

বৃটিশ সেনাবাহিনী ডিউক অব বেডফোর্ডের নেতৃত্বে লড়াই করছিল, ১৫ অগাষ্ট তারা ফরাসী বাহিনীর মুখোমুখি হয়।  প্যারিসে উভয় পক্ষের লড়াই হয়।  জোয়ান এক পায়ে আঘাত পান।  আঘাত নিয়েই তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। পরবর্তীতে এক রাজকীয় আদেশে তাদেরকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেয়া হয়।

লা-শেরিটে-সর-লরেঁতে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ছোটখাট অভিযানের পর, জোয়ান এপ্রিলে ইংলিশ ও বার্গুন্ডিয়ানদের অবরোধের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।  সে সময় ১৪৩০ সালের ২৩ মে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে আটক করে ফেলে, বার্গুন্ডিয়ানরা তাকে ঘিরে ঘোড়া থেকে নামতে বাধ্য করে।  প্রাথমিক ভাবে তিনি আত্মসমার্পন করেননি।

ঐতিহাসিকরা সপ্তম চার্লস সে সময় যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি বলে তাকে অভিযুক্ত করেন।  আটক অবস্থায় জোয়ান কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেন।  একবার তিনি ৭০ ফুট (২১ মিটার) উঁচু টাওয়ার থেকে নিচের নরম মাটিতে লাফিয়ে পড়ে বার্গুন্ডিয়ান শহর আরাসে পালিয়ে যান।  বৃটিশ সরকার তাকে বার্গুন্ডিয়ান ডিউক ফিলিপের কাছ থেকে কিনে নেয়।


রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণদিত বিচারে ডিউক বেডফোর্ড তার ভাগ্নের ষষ্ঠ হেনরীকে ফ্রান্সের সিংহাসন দেন।  জোয়ানকে রাজার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।  ১৪৩১ সালের ৯ জানুয়ারী তার বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়।  বিচারে নিয়মানুসারে তাকে কোন আইনজীবি দেয়া হয়নি।

বিচারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তিনি ইশ্বরের দয়ায় বিশ্বাস করেন কিনা।  জবাবে জোয়ান বলেছিলেন "যদি আমি তা না করি তবে ইশ্বর যেন আমাকে সেখানেই রেখে দেন, আর যদি বিশ্বাস করি তবে ইশ্বর যেন আমাকে রক্ষা করেন।" আসলে এই প্রশ্নটিই ছিল চালাকিপূর্ণ প্রশ্ন।  কারণ কেউ ইশ্বরের দয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনা।  যদি জোয়ান বলতেন হ্যাঁ করি, তবে তাকে ধর্মের বিরুদ্ধে যাবার অভিযোগ আনতেন আর যদি জোয়ান বলতেন "না" তবে বলা হতো তিনি নিজের অভিযোগ নিজেই স্বীকার করেছেন।

ছলচাতুরি বিচারে আদালত তাকে ১২ নম্বর আর্টিকেল অনুযায়ী দোষি সাব্যস্ত করে।  আইন সম্পর্কে অজ্ঞ জোয়ান তখন বুঝতে পারেননি যে আসলে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হচ্ছে।

সে সময় ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়ার ছিল শাস্তি ছিলো সর্বোচ্চ শাস্তি।  তাকে সে শাস্তি মৃত্যদন্ডই দেয়া হয়েছিল। কারাগারে জোয়ান মেয়েদের পোষাক পরিধান করা শুরু করেন।  এর ক'দিন পর তাকে কারাগারেই ধর্ষন করা হয়।  এ ঘটনার পর জোয়ান আবার পুরুষদের পোষাক পরিধান শুরু করেন।  এর পেছনে মূল কারণ ছিল ছেলেদের পোষাকে নিরাপত্তা বেশি পাওয়া যেতে পারে আর তার পরার জন্য অন্য কোন বস্ত্র অবশিষ্ট ছিলনা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা তার মৃত্যদন্ডের দৃশ্য বর্ণনা করেছেন।  তাকে ১৪৩১ সালের ৩০ মে পুড়িয়ে মারা হয়।  তাকে একটি পিলারের সাথে বেঁধে ফেলা হয়।  জোয়ান গীর্জার যাজকদের কাছে একটি ক্রুস চান।  একজন চাষী একটি ছোট ক্রুস তৈরি করে জোয়ানের পোষাকের সামনে ঝুলিয়ে দেন।

জোয়ানের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরকে প্রদর্শন করে যাতে কেউ কোনদিন দাবি না করতে পারে জোয়ান বেঁচে পালিয়ে গেছে।  এরপর তার শরীর আরো দু'বার পোড়ানো হয়।  ফলে তার ছাইগুলো এতো মিহি হয়ে যায় যে কেউ তা সংগ্রহ করতে পারে না।