ঢাকা, সোমবার ১৪, অক্টোবর ২০১৯ ২১:১০:৩০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সাংবাদিক দিল মনোয়ারা মনুর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন দুফলো কড়া নিরাপত্তায় বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত জাপানে টাইফুনের আঘাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫ বিশিষ্ট সাংবাদিক দিল মনোয়ারা মনু আর নেই

টিকটক আর ভিপিএনের জীবন!

আফসানা নীলা | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:০৫ পিএম, ২৬ জুলাই ২০১৯ শুক্রবার

আফসানা নীলা

আফসানা নীলা

ঝুমি! স্কুল পড়ুয়া এক চঞ্চল কিশোরী। মেয়েটি একদিন ভালবেসে ফেলে কলেজ পড়ুয়া নয়নকে। তীব্র ভালবাসায় একদিন সবার অলক্ষ্যে নয়নের হাত ধরে ঘর ছাড়ে ঝুমি।

দু’পরিবার প্রথমদিকে মেনে না নিলেও পরে কয়েক বছর ভালই ছিলো ওরা। ঝুমির কোলজুড়ে আসে দু’সন্তান। ওরা একটু বড় হতেই ঝুমি টের পায় বাড়ছে ওর আর নয়নের মধ্যে দূরত্ব। সংসারে কোনো টাকা পয়সা দেয় না নয়ন। ঘরে চাল নেই, ডাল নেই। বাবার বাড়ি আর ধার-দেনা করে মেয়ে দুটিকে বাঁচিয়ে রাখে ঝুমি। কান্নাকাটি, ঝগড়া কিছুতেই সংসারে মন আসে না নয়নের।

সন্তানদের বাঁচাতে একদিন সেলাইয়ের কাজ নেয় ঝুমি। এ খবরে নয়ন বাসায় ভাংচুর করে। ঝুমি সব সহ্য করে কোন রকমে টিকে থাকে সংসারে। মনে মনে সব দোষ দেয় ভাগ্যের। একদিন পাশের বাসার এক ভাবি একটা মোবাইল দেয় ওকে। টিকটক নামের অ্যাপসের দেখা পায় ঝুমি। টিকটকের নানা ধরনের ভিডিও যেন ভুলিয়ে দেয় ঝুমির কষ্ট। এতো অশান্তি আর চার দেয়ালের মাঝে টিকটক দেখতে দেখতে একদিন নিজেই শুরু করে ও। কখনো নানারকম সাজগোজ করে নায়িকা সাজে, কখনো হাতে ঝাড়ু-বালতি নিয়ে টিকটকের ভিডিও করে ও। অন্যপ্রান্তে থাকা তরুণ এমনকি বৃদ্ধদের সাথে প্রেম ভালোবাসার কথার ঠোঁটও মেলায় ঝুমি। অনেকের সাথে চ্যাট করে কখনো কখনো। কখনো উদ্ভট অঙ্গভঙ্গিতে নাচেও। মানুষের নানা মন্তব্যে মজা পায় ও। পেয়ে যায় নতুন নতুন নানা বন্ধু। ধীরে ধীরে একসময় টিকটক আসক্তিতে জড়িয়ে পরে ঝুমি। ওর এসব আচরণে বিরক্ত হন বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজনরা। ঝুমি কারও কথা শোনে না। তার পাগলামী যেন বেড়ে যায় টিকটক নিয়ে। নয়নের সাথে এক সময় ছাড়াছাড়ি হয় ওর।

গল্প এবার সুরাইয়ার। শিক্ষিত মেয়ে। স্বামী সারাদিন ব্যস্ত অফিস আর মিটিং নিয়ে। একাকিত্ব কাটাতে সুরাইয়া বেছে নেয় অনলাইনে ড্রেস বিক্রির ব্যবসা। শুরুতে ড্রেসের ছবি ও লাইভ দিতে দিতে একসময় শুরু করে টিকটক ভিডিও করা। পরে এতটাই ঝুঁকে পড়ে টিকটকে যে, একসময় ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সে। এ নিয়ে বাড়তে থাকে সংসারে অশান্তি।

অন্যদিকে ওয়াসিমই টিকটক চেনায় ওর বউকে। প্রথম প্রথম বউকে নিয়ে লাইভ দিতো। এর পর নাচ-গান।  কিছুদিন পর ওর বউ জয়া নিজেই টিকটকে গান, কথা বার্তা ভিডিও দেয়া শুরু করে। একসময় স্বামী টিকটক করে অন্যমেয়েদের সাথে আর বউ অন্য ছেলেদের সাথে। দিনদিন বাড়ে দুজনের মাঝে দূরত্ব।

সুপ্রিয় পাঠক, শুধু বিবাহিত নয়, অল্পবয়সী, কিশোর-কিশোরী থেকে তরুণ-তরুণী আজ টিকটক বা ভিপিএন অ্যাপসের ভিডিওতে আসক্ত। পরিবার থেকেও শিশুদের বিভিন্ন ভিডিওতে উপস্থাপন করায় অভিভাবকরা। টিকটকে আছেন তারকা, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, শিক্ষকসহ, বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের অর্থহীন কথাবার্তার প্রতিযোগীতা। অন্যের নজর কাড়তে কিম্বা, ভিডিওতে লাইক কমেন্টের বন্যা বইয়ে দিতেই শুরু হয় যেন অসুস্থ এই প্রতিযোগীতা। এতে কখনো থাকছে ব্যঙ্গাত্বক উপস্থাপন, কখনো বিদ্রুপ কখনোবা সিনেমার সংলাপ। ক্ষনিকের এই মজা নষ্ট করছে মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, ভাঙ্গছে ধর্মীয় অনুশাসন, হচ্ছে নৈতিক অবক্ষয়।
এই নেশার কারণে,
- শিশুদের পাকামো বাড়ছে         
-কিশোর কিশোরীদের পড়ালেখা নষ্ট হচ্ছে
-মেধার ব্যবহার হচ্ছে অর্থহীন কাজে।
-মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যবোধগুলো হয়ে পড়ছে মূল্যহীন।
-বিবাহিত অনেকে জড়িয়ে পড়ছেন অনৈতিক আচরণ আর সম্পর্কে।
-অনেকই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন এসব ভিডিও দ্বারা।
-ব্যঙ্গাত্বক আচরণ শিখছে অনেকে।
-কমছে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা।
 
এবছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি থেকে টিকটক ও এর মতো যে সব অ্যাপস  আছে তা বন্ধের কথা থাকলেও, এখনো তা বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন ধরনের ভিপিএন (র্ভাচুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ) এর মাধ্যমে দিব্যি এর ব্যবহার করছেন ব্যবহারকারীরা।

মাত্র ১৫ সেকেন্ডের টিকটক বা এর মতো ভিডিওর মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের অস্বাভাবিক আচরণ, যা মোটেও কাম্য নয়। ভিডিওতে মিথ্যা সুরে সুর মেলানো হয়, গলায় নকল ভয়েস দিয়ে মিষ্টি সুরে কথা বলা, এমনকি নকল সুরে আযান, কোরআন তিলাওয়াত করারও ব্যবস্থা রয়েছে। এতে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে সত্যিকারের মেধাবীরা, তেমনি অনেকেই সত্য ভেবে প্রভাবিত হচ্ছেন মিথ্যা, বানোয়াট আর রুচিহীন ভিডিওতে। যা আনছে সামাজিক অবক্ষয়। তাই টিকটক ভিডিও অ্যাপস তৈরির দেশ চীনে যখন নেই এর ব্যবহার, তখন আমরা যাচ্ছি কোথায়?

লেখক : সাংবাদিক, একুশে টেলিভিশন।