ঢাকা, মঙ্গলবার ২২, অক্টোবর ২০১৯ ০:৪০:২০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
এমপিওভুক্তি বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে বসছেন শিক্ষামন্ত্রী খালেদার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেলেন ড. কামাল বরগুনায় জোছনা উৎসব আগামী ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের ৯ বিচারপতির শপথ গ্রহণ দাবি না মানায় ফের আমরণ অনশনে শিক্ষকরা

তরুণ লেখক প্রকল্প: সেই সব জলপতনের গান-২

শান্তা মারিয়া | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:৩৪ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০১৯ শনিবার

লেখার শুরুতে একগাদা নাম ঢেলে দেওয়া কোন কাজের কথা নয়। তবু কেন দিচ্ছি? কারণ এর পর অনেক জায়গাতে আমি কারও নাম উল্লেখ না করে ঘটনাগুলো শুধু লিখব। এখন যে নামগুলো লিখব, ধরে নিতে হবে এদেরই মধ্যে কেউ না কেউ ঘটনাগুলোর নায়ক ও অপনায়ক। খল নায়ক শব্দটি ব্যবহার করলাম না, সেখানে ‘খল’ কেউ ছিলেন না।  সত্যি কথা বলতে কি, সময়ই বলে দেয়, জীবনের মঞ্চে কার কী ভূমিকা। কে সঠিক জলে আর কে ভুল জলে নেমেছে।  আর সঠিক জল ও ভুল জলের ধারণাও তো সমযের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি নামই না প্রকাশ করলাম তাহলে কেন এ ধরনের বিবরণের অবতারণা? জবাবে বলতে চাই, আমি শুধু আমাদের সেই নব্বই দশকের সোনালি সময়টুকুকে তুলে ধরতে চেয়েছি। আমাদের সব ভলোবাসাবাসি, পাগলামি, আবেগ, প্রেম ও অপ্রেমের গল্পটুকু পৌঁছাতে চেয়েছি নতুন সময়ের কাছে। আমি লিখতে বসেছি সময়ের গল্প। লিখতে বসেছি গত শতকে শেষ দশকের তারুণ্যের গল্প। আমি স্মৃতি থেকে লিখছি। অনেক নাম হারিয়ে গেছে মন থেকে, অনেক নাম রয়ে গেছে হৃদয়ের গভীরে।

তরুণ লেখক প্রকল্পে প্রথম চার ব্যাচে যারা ছিলেন তাদের নামগুলো আগে দিয়ে দেই। এই নামগুলো দিচ্ছি আমার মনের ক্রম অনুসারে, ইচ্ছা অনুসারে। কে কার চেয়ে নামকরা, কে সিনিয়র কে জুনিয়র, কে কার তিনদিন আগে ঢাকায় এসেছেন সেসব অনুসারে নয়, এমনকি ব্যাচ অনুসারেও নয়।

আচ্ছা, নামগুলো আগে দিয়ে নেই, তারপর অন্য কথা। আইরিন পারভিন, নাজিব তারেক, আশিক আকবর, চঞ্চল আশরাফ, প্রণয় পলিকার্প রোজারিও, সাকী মোহাম্মদ, মতিন রায়হান, বায়তুল্লাহ কাদেরি, স্নেহলতা নাগ, ইয়াদি মাহমুদ, তপন বাগচী, রণক মুহম্মদ রফিক, শৈবাল আদিত্য, কাওসার পারভীন, সিকান্দার ফয়েজ, সেলিনা শিরীন শিকদার, মহিবুল আলম, প্রত্যয় জসীম, কুমার বিপ্লব, আমীরুল আশরাফ, শুভংকর চক্রবর্তী, আমিনুল ইসলাম রানা, আরজু আহমেদ, কামরুজ্জামান, শোয়েব জিবরান, মুজিব ইরম, তাপস সরকার, রোকসানা আফরীন, আয়শা ঝর্ণা, টোকন ঠাকুর, শাকিল মামুদ, রিটা আশরাফ, মনিরা মিম্মু, সুস্নিগ্ধা বড়ুয়া, শাহিন রিজভি, শামিম সিদ্দিকি, মিহির কান্তি রাউত, আরিফ বিল্লা মিঠু, মেহেবুব আলম বর্ণ, অরাত্রিকা রোজী, ফয়জুল আলম পাপ্পু, আইরীন নিয়াজী মান্না, মাহমুদ কুদ্দুস, হুমায়ুন রহমান, নারায়ণ বিশ্বাস, চিন্ময় হাওলাদার, জেনিস মাহমুদ, তারেক মাহমুদ, রওশন ঝুনু, রবিউল করিম বাবুল, রাশেদ শাহ, আহমেদ বাদল, মোহাম্মদ মোহসিন, মোহাম্মদ নাদিম, অলকা নন্দিতা, জেসমিন মুন্নি, জাফর আহমেদ রাশেদ, রাজীব নূর, আহমেদ মাওলা, সায়মন জাকারিয়া, কাফি শেখ, নূরুল হালিম।  আরও অনেকে ছিলেন কিন্তু এই মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না।

নামের তালিকা দেখেই বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই এদের মধ্যে অনেকে দাপটের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে টিকে আছেন, আবার অনেকে হারিযে গেছেন। আমরা সকলে এক বয়সী ছিলাম না। তবে বছর দশেকের পরিধির মধ্যেই কমবেশি বয়সের পার্থক্য ছিল। একমাত্র বেশ কিছুটা সিনিয়র ছিলেন মাহমুদ কুদ্দুস ভাই।

কিছুদিন আগে কলকাতার একটি বাংলা চলচ্চিত্র দেখেছি। সেখানে ‘মোহিনী গ্রাম’ নামে একটি গ্রামের উল্লেখ আছে যেখানে গেলেই নাকি মানুষের প্রেম হয়ে যায়। সেই গ্রামটিকে সকলে খুঁজে পায় না। পরাবাস্তব গল্প। আমার কাছে এখন মনে হয়, বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পটি ছিল ‘মোহিনী গ্রাম’। সেই সময়টাও ছিল বাস্তব ও অবাস্তবের কুয়াশায় ঘেরা। বাংলা একাডেমির সেই বোধিবৃক্ষের নিচে বসে জমে উঠতো আমাদের স্বপ্ন। আমরা প্রেমে পড়েছিলাম শিল্পের, ভালোবেসেছিলাম কবিতাকে আর বাস্তবের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমরা বাস করছিলাম এমন এক গ্রহে যেখানে মাধ্যাকর্ষণ অনেক হালকা।

শাহিন রিজভির সঙ্গে আমার লেখক প্রকল্পেই পরিচয়। কিন্তু সেসব তো অনেক পরের গল্প। আমার নিজের গল্পগুলো বলবো কিনা সে নিয়ে এখনও মনস্থির করিনি। এই লেখার শেষ দিকে ইচ্ছে হলে সেগুলো বলতেও পারি।
আচ্ছা প্রথমে অন্য একটি মেয়ের কথা দিয়ে না হয় শুরু হোক। একটি মেয়ে ছিল বেশ আবেগপ্রবণ। কিছুটা কল্পনার রাজ্যে থাকতে ভালোবাসতো। দেখতে সে প্রচলিত মাপকাঠিতে সুন্দরী ছিল না মোটেই। বেশ দীর্ঘাঙ্গী, একটু কৃশকায়। সরস্বতী পুজোয় জগন্নাথ হলের ঠাকুর দেখতে গিয়ে সে প্রেমে পড়লো একটি ছেলের। দূর থেকে। তারপর যখন দুজনেই লেখক প্রকল্পে তখন মেয়েটির আরও আগ্রহ বাড়লো ছেলেটিকে ঘিরে। বিশেষ করে একদিন ছেলেটি ক্লাসে চমৎকার একটি প্রেমের কবিতা শোনায় সকলকে।

মেয়েটির ধারণা হলো কবিতাটি তাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা। তখন ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। বইমেলা ও বসন্ত দুটোই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ জাঁকিয়ে বসেছে। সেসময় বইমেলায় আবৃত্তির ক্যাসেটের রমরমা বাজার। প্রবল প্রতাপে বাজছে  কামরুল ইসলাম মঞ্জু, আসাদুজ্জামান নূর, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। কথোপকথন থেকে চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় অনেকগুলো কবিতাংশ।

মেয়েটি নিজেকে নন্দিনী ও ছেলেটিকে শুভঙ্কর ভাবতে লাগলো। ছেলেটি যে কবিতাই লেখে, আড্ডায় যখনি কোন কবির প্রেম নিয়ে কথা বলে, মেয়েটির ধারণা হয় সবই তার প্রতি অদৃশ্যভাবে নিবেদিত। অবশেষে মেয়েটি একদিন বাংলা একাডেমির পুকুর ঘাটে বসে আমাকে সব কথা খুলে বললো। শুধু তাই নয়, আমাকে অনুরোধও করলো যেন আমি ছেলেটির কাছে গিয়ে বলি যে সেও তাকে ভালোবাসে। প্রণয়ের দূতী হতে সকলেরই ভালো লাগে।

সে যুগে ফেসবুক, মোবাইল ফোন কিছুই ছিল না। থাকলে হয়তো এমন বিড়ম্বনা ঘটতো না। অথবা তারপরও ঘটতো। কারণ নারসিসাস ও ইকোর প্রেম চির নতুন, চির পুরাতন। নাহ, উপমাটা একদম যুতসই হলো না। ছেলেটি নারসিসাস ছিল না। কিন্তু সে ভালোবাসতো অন্য কাউকে। পঞ্চশরের পুরনো কৌতুক। তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল সবটাই মেয়েটির কল্পনা। অথবা সে একরৈখিক প্রেমী। কারণ ছেলেটি যখন আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে ব্যাখ্যা করে দেয় কেন মেয়েটির সঙ্গে কোনরকম আবেগগত সম্পর্ক গড়া তার পক্ষে অসম্ভব তখন আমি তার যুক্তিগুলো মেনে নেই।

আমার এও মনে হয় যে, মেয়েটি যে তাকে ভালোবাসে সে বিষয়ে সে একেবারেই অনবহিত ছিল। কিন্তু আজ সেই কাহিনী লিখতে বসে তেইশ বছর পর আমার মনে হচ্ছে মেয়েটির প্রেম পুরোপুরি একতরফা ছিল না। ছেলেটির দিক থেকে কোন না কোন ইন্ধন অবশ্যই ছিল। হয়তো হাসি হয়তো দৃষ্টির সামান্য ছুঁয়ে যাওয়া। কোন মানুষ যখন অপর মানুষের প্রেমে পড়ে তখন দুজনেই কিছুটা হলেও সেটা অনুভব করে। যার প্রেমে পড়ে তার আত্মঅহংকার স্ফীত হয়।

সে যা হোক। ছেলেটির প্রত্যাখ্যানে মেয়েটি এলোমেলো হয়ে পড়ে।সে প্রকল্পে আসা বন্ধ করে দেয়। একমাত্র আমার সঙ্গে সে বেশ কিছু সময় যোগাযোগ রেখেছিল। তারপরে যা হয়ে থাকে। দুজনেই জীবনের পথে ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে। ছেলেটি এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিবাহিত, সুখি। যাকে ভালোবাসতো তাকেই বিয়ে করেছে সে। তবে সাহিত্য অঙ্গনে তার আর পদচারণা নেই।

মেয়েটি কোথায় আমি জানি না। তারা দুজনেই আমার জীবনের বলয়ের বাইরে। আচ্ছা, এমন একটি সাদামাটা গল্প দিয়ে কেন লেখক প্রকল্পের স্মৃতিচারণ শুরু করলাম আমি? হয়তো মেয়েটির দীর্ঘশ্বাস আমার মনের কোণে বনসাই হয়ে এতদিন বেঁচে ছিল কোন মন্ত্রবলে। সেই দীর্ঘশ্বাস দিয়েই না হয় শুরু হলো লেখক প্রকল্পের সেই অবিস্মরণীয় দিনগুলোর কড়চা।  
(চলবে)