ঢাকা, শুক্রবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৭:৪৫:০৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
নয়নের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার মিন্নির, দিলেন বর্ণনা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ত্যাগ খুলনা মেডিকেলে ডেঙ্গু জ্বরে গৃহবধূর মৃত্যু

তরুণ লেখক প্রকল্প: সেই সব জলপতনের গান-৫

শান্তা মারিয়া | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:২৯ পিএম, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সোমবার

শান্তা মারিয়াসহ তরুণ লেখক প্রকল্পের কয়েকজন বন্ধু

শান্তা মারিয়াসহ তরুণ লেখক প্রকল্পের কয়েকজন বন্ধু

লেখক প্রকল্পের যাদের সঙ্গে তেইশ বছর ধরে যোগাযোগ অক্ষুন্ন আছে তাদের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় কবি মতিন রায়হানের নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক বছরের সিনিয়র। কিন্তু আলাপটা যেহেতু কলা ভবনে হয়নি, হয়েছে বাংলা একাডেমিতে, লেখক প্রকল্পের একই ব্যাচে থাকার সময়, তাই সম্পর্কটা বন্ধুত্বের। কখনও মতিন ভাই বলা হয়নি। আবার ‘তুমি’ করেও বলা হয়েছে কমই। বেশির ভাগ সময়েই মতিন এবং আপনি সম্বোধনে কথা হয়। মতিনের ‘তিতাস পুরাণ’ তো বটেই, ‘পাতা কাহিনী’ এবং অন্যান্য বইও সংগ্রহে আছে।

প্রথমদিন তার সঙ্গে আলাপের পর আমার মনে হয়েছিল এই তরুণ কবি আর যাই হোক আঁতেল নয় মোটেই। সে সময় বাংলা একাডেমির বটগাছের নিচে এবং শাহবাগের আজিজ মার্কেটে ঘোরাফেরা করা অনেক কবি কাঁধে কাপড়ের ঝোলা, মুখে দশদিনের না কামানো দাঁড়িগোঁফ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। মতিন সেরকম ছিলেন না কোনদিনই। তিনি মার্জিত রুচির মানুষ।

আহা, আজিজ মার্কেট প্রসঙ্গে মনে পড়লো, নব্বই দশকে আজিজ মার্কেটে ছিল বইয়ের দোকান। এখনকার মতো কাপড়ের মার্কেট ছিল না। কত বইয়ের দোকান যে ছিল। আর ছিল কিছু প্রকাশনা সংস্থা। একেবারে একতলায় রাস্তার উপরেই ছিল একটি কফি শপ। নামটা ভুলে গেছি। তিনতলায় ছফা ভাইয়ের ( আহমদ ছফা) অফিস ছিল। আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাথে, মার্কেটের ভিতরে বিভিন্ন বইয়ের দোকানে সেসময় আমরা খুব আড্ডা দিতাম। ‘শাহবাগে এক সন্ধ্যা’ নামে আমার একটি কবিতাও রয়েছে।

বলছিলাম, কবি মতিন রায়হানের কথা। লেখক প্রকল্পে মতিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। পরে জনকণ্ঠে তিনি যখন সহকর্মী হয়ে আসেন তখন সে বন্ধুত্ব আরও বাড়ে। বর্তমানে তিনি বাংলা একাডেমিতে কর্মরত আছেন। তার কবিতা আমার বেশ ভালো লাগে। আবহমান বাংলার মৃত্তিকার সৌরভ পাওয়া যায় তার কবিতায়। তিনি বাংলার চিরন্তন কাব্য ধারাকে খুব সঠিকভাবে তার কবিতায় ধারণ করেছেন। জনকণ্ঠে তিনি সব সময় সহকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলন প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন। এক নারী সহকর্মীকে এক উর্ধতন যৌন হয়রানি করলে মতিন খুব সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন।

জনকণ্ঠের আরেক সহকর্মী কবি চঞ্চল আশরাফ। আমরা যখন লেখক প্রকল্পে তার আগেই চঞ্চল আরাফ কবি হিসেবে বেশ খ্যাতি পেয়েছিলেন। সাহসী হিসেবেও।  পত্রিকায় তার সাবেক প্রেমিকা লুসিকে নিয়ে কবিতা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি বরাবরই খুব সাহসী ও স্পষ্ট বক্তা। একবার সত্তর দশকের এক কবির আত্মম্ভরিতায় বিরক্ত হয়ে চঞ্চল সেই কবির মুখের উপরে বলেছিলেন ‘আপনি সত্তর দশকের গৌণ কবিদের মধ্যে প্রধান’।

জনকণ্ঠে যখন বকেয়া বেতনের দাবিতে আমরা সকলে আন্দোলন করি তখনও চঞ্চল খুব সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। মালিক পক্ষ থেকে যখন আমাকে অশালীন ভাষায় হুমকি দেওয়া হয় তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন চঞ্চল। অন্য আরেকটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে যখন তিনি চাকরি করতেন তখন এক নারী সহকর্মীকে কোনো উর্ধতন  যৌন হয়রানি করলে চঞ্চল সেই ব্যক্তিকে চপেটাঘাত করে চাকরি ছেড়ে দেন। বর্তমানে তিনি ক্যানভাস পত্রিকায় কর্মরত আছেন। শুধু সাহসী হিসেবেই নয়, কবি হিসেবেও তিনি অনন্য। বাংলা সাহিত্য ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য নিয়েও তার পড়াশোনা প্রচুর। কবি চঞ্চল আশরাফের কবিতা আমার প্রিয় তার অভিনবত্ব ও গভীরতার কারণে।

লেখক প্রকল্পের বন্ধু শিল্পী নাজিব তারেকও জনকণ্ঠে আমার সহকর্মী ছিলেন। তিনি এবং তার স্ত্রী ফারহানা আফরোজ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই শিল্পী দম্পতি যখন আজিজ মার্কেটে ‘বাঙ্গাল’ নামে একটি বুটিক শপ শুরু করেন তখন তারা টিশার্টে কবিতা পত্রিকা শুরু করেন। এই বিশেষ শিল্প সৃষ্টি করে আলোড়ন তোলেন তারা। টি শার্টে তারা সমকালীন অনেক কবির কবিতা  প্রকাশ করেন। এর মধ্যে আমার একটি কবিতাও ছিল। ‘বাঙ্গাল’ আমার পছন্দের ফ্যাশন হাউজ হয়তো সে কারণেই। নাজিব তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ রয়েছে প্রকল্পের আরেক বন্ধু মহিবুল আলমের সঙ্গে। তিনি গত তেইশ বছর ধরে প্রবাসী। অস্ট্রেলিয়ায় আছেন। শত ব্যস্ততাতেও লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন মহিবুল যা আমাদের অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণামূলক। মহিবুল যখনি দেশে আসেন চেষ্টা করেন আমাদের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ওর এই বন্ধুত্ব ধরে রাখার প্রয়াস সত্যিই প্রশংসনীয়। মহিবুলের প্রকল্প পরবর্তি বইয়ের কয়েকটি সংগ্রহে আছে। ‘ঊনিশের শিকড়গাঁথা’ ও ‘তালপাতার পুঁথি’ আমার বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে ‘তালপাতার পুঁথি’। বইটি একাধিক পর্বে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ভিত্তিক বইটি সত্যিই সাহিত্যের জন্য বড় একটি কাজ বলে আমি মনে করি। আগেও বলেছি বিদেশে থাকলেও মহিবুল দেশের মাটির সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেননি। তালপাতার পুঁথি তার বড় প্রমাণ।

আমি ছিলাম দ্বিতীয় ব্যাচে। নিজের ব্যাচের বাইরে অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে। কবি রওশন ঝুনুর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে সাংবাদিকতার সূত্রে।

কবি আইরীন নিয়াজী মান্নার সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে সাংবাদিকতার সূত্রেই। আমরা বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সদস্য হওয়ায় সে যোগাযোগ অক্ষুন্ন রয়েছে। মনে পড়ে মান্নার সঙ্গে বাংলা একাডেমির বটতলায় আড্ডার কথা। প্রকল্প থেকে প্রকাশিত তার বই ‘বাপী শাহরিয়ার: অকাল প্রয়াত ছড়াশিল্পী’ বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। কারণ বাপী শাহরিয়ারের উপর তিনিই প্রথম কাজ করেন। ছড়াকার বাপী শাহরিয়ারের কথা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না। ১৯৮৪ সালের ঘটনা। তরুণ ছড়াকার বাপী শাহরিয়ার তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়া লিখে বেশ খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। আর চালকের লাইসেন্স ছাড়াই ঢাকার রাজপথে দ্রুতবেগে গাড়ি হাঁকাচ্ছিলেন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের মন্ত্রী আবদুল মতিনের বখাটে সন্তান মুহিত। মুহিতের গাড়ি পিছন থেকে ধাক্কা দেয় বাপী শাহরিয়ারকে। গুরুতর আহত হন তিনি। তার মেরুদণ্ড ভেংগে যায়। বিনা চিকিৎসায় এবং বিনা বিচারে তিলে তিলে মৃত্যু বরণ করেন বাপী শাহরিয়ার। মুহিতের কোন শাস্তি হয়নি বাপের ক্ষমতার দাপটে। সেই অকাল প্রয়াত ছড়াকারকে নিয়ে কাজ করেন মান্না। মানবজমিন, ভোরের কাগজ ও সমকালের রিপোর্টার হিসেবেও মান্না এমন বহু সাহসী রিপোর্ট  করেছেন।

তরুণ লেখক প্রকল্পের সূত্রেই প্রথম পরিচয় হয় আনজীর লিটন ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি তরুণ লেখক প্রকল্পের সমন্বয়ক ছিলেন। সে সময়ই তরুণ ছড়াকার হিসেবে তিনি ছিলেন বেশ খ্যাতিমান। আনজীর লিটন ভাই পরে সাংবাদিকতা করেন অনেক বছর। সে সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ে। আমরা একসঙ্গে ২০১১ সালে হলদিয়া কবিতা উৎসবে যাই। সেসময় আনজীর ভাইযের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মানুষটি সহজ সরল। অকপটে অনেক কথা বলে ফেলেন। বর্তমানে তিনি শিশু একাডেমির প্রধান। অথচ এত উঁচু পদ সত্বেও তার মধ্যে অহংকারের কোন প্রকাশ কোনদিন দেখিনি। এখনও বইমেলায় বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে বসে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেন, হাসি গল্প জমিয়ে তোলেন।

কবি ও আবৃত্তিকার ফয়জুল আলম পাপ্পুর সঙ্গে পরিচয় ১৯৮৯ সালে। তখন মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযে ভর্তি হয়েছি। তিনি ‘প্রকাশ’ নামে একটি আবৃত্তি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। কর্মশালার মাধ্যমে সদস্য নেওয়া হয়। আমি সেই কর্মশালায় যোগ দেই এবং পরে প্রকাশের সদস্য হই। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলনের সময় তার সঙ্গে পরিচয় আরও বাড়ে। আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সক্রিয় কর্মী ও অন্যতম নেতা ছিলেন পাপ্পুভাই। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে কবি, আবৃত্তিকার ও সংস্কৃতি কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে পরে অন্য কোথাও বলবো।

বলছিলাম পাপ্পুভাইয়ের কথা। লেখক প্রকল্পের তৃতীয় বা চতুর্থ ব্যাচে ছিলেন তিনি। পাপ্পুভাই আমার সিনিয়র। তবে কতখানি সিনিয়র তা আমি জানি না। তার বর্তমান বয়স সম্পর্কেও আমার কোন ধারণা নেই। কারণ সেই নব্বই সাল থেকে এখন পর্যন্ত তার চেহারায় কোন পরিবর্তন  চোখে পড়েনি। টিএসসিতে গেলেই অবধারিতভাবে তার সঙ্গে দেখা হয়। গল্প হয়। যোগাযোগ অক্ষুন্ন রয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

ছড়াকার আরজু আহমেদ ছিলেন দ্বিতীয় ব্যাচে। মুক্তকণ্ঠ পত্রিকায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। খুব হাসিখুশি প্রাণবন্ত ছিলেন আরজু আহমেদ। দীর্ঘদেহী, ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো এই তরুণ ছড়াকার যে এত অকালে পৃথিবী ছেড়ে যাবেন তা অবিশ্বাস্য।

(শেষ পর্ব)