ঢাকা, শনিবার ২৫, মে ২০১৯ ১০:৫৬:৫৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
গুজরাটে কোচিং সেন্টারে আগুন, ১৮ শিক্ষার্থী নিহত পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন থেরেসা মে, কাঁদলেনও

থিয়েটার ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না : উম্মে সুমাইয়া

সালেহীন বাবু | উইমেননিউজ২৪.কম

আপডেট: ১১:২৪ এএম, ২ আগস্ট ২০১৮ বৃহস্পতিবার

মা-বাবার স্বপ্ন মেয়েকে মার্চেন্টাইজার বানাবেন। মেয়ে পরিবারের বিশাল ব্যবসা দেখাশোনা করবে। কিন্তু মেয়েটার মন যে পড়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিহার্সেল ফ্লোরে। মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিলেন পরিবারের বিপক্ষে যাবেন, থাকবেন নিজের মনের পক্ষে। সেদিন তিনি কি ভুল করেছিলেন?

না কোন ভুল হয়নি সেদিন। নিজের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান এ মেয়েটি এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে অর্জন করেন ডীন অ্যাওয়ার্ড। শুধু কি তাই। পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক। মেয়েটি অবিচল, দুর্বার, স্রোতের বিপরীতে জয়ী হওয়া এক কান্ডারী, নাম তার উম্মে সুমাইয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের ছাত্রী।

বয়সটা ছাব্বিশ ছুঁই ছুঁই। অথচ এই বয়সে সুমাইয়ার সাফল্য যেন গল্পকেও হার মানায়। আগামীকাল বুধবার (২৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ থেকে (২০১৭ সালের) অনার্সে সবচেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে সেরা স্কোরার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বর্ণপদক নিবেন সুমাইয়া। মোট স্কোর ৪-এর মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৩.৯৮।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুমাইয়াসহ মোট ১১ জন এ পদক পাবেন। এভাবে অনার্সে যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবচেয়ে বেশি ভাল ফল করেছে তাদের সরকার প্রতি বছরই এ স্বর্ণপদক দিয়ে থাকে।

গত বছর বাংলাদশ ইয়ুথ ডেলিগেশনে ১০০ জনকে আমন্ত্রণ জানান ভারতের রাষ্ট্রপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন শিক্ষার্থীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এদের মধ্যে সুমাইয়া একজন।

সুমাইয়া অনার্স পাস করেছেন কৃতীত্বের সাথে। মাত্র ক’দিন আগে তার মাস্টার্স পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। মাস্টার্স পরীক্ষায় চারের মধ্যে ৩.৯৭ স্কোর করেছেন। নিজ বিভাগের অহংকার এই মেধাবী তারকা ছাত্রী।

এই যে এত সাফল্য সুমাইয়ার তার পিছনেও রয়েছে এক সংগ্রামী, বিদ্রোহী ইতিহাস। সমাজ ও পরিবারের প্রচলিত গোয়ার নীতির বাইরে গেলেই সমালোচনার ফুলঝুড়ি ঘটে। আর সে নারী হয়ে যায় বিদ্রোহী। সুমাইয়া ঠিক তেমনি এক বিদ্রোহী যে জীবনকে ব্যয় করেনি বিত্তবৈভবে বরং চলেছেন নিজের ইচ্ছে ঘুড়ি অনুযায়ী।

সুমাইয়া ১৯৯২ সালের ১৪ নভেম্বর, কক্সবাজারের টেকনাফের এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। টেকনাফ পাইলট হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর ২০০৮ সালে ঢাকায় চলে আসেন। ২০১০ সালে উত্তরার মাইলস্টোন কলেজ থেকে এইচএইসি পাস করেন। পাস করার পর পরিবারের ইচ্ছে অনুযায়ী প্রথমে বিজিএমইতে ভর্তি হন। 

পরিবারের সবাই চেয়েছিলেন সুমাইয়া মার্চেন্টাইজিং পড়ে ব্যবসায় যুক্ত হবেন। কিন্তু সুমাইয়া কারও কথা না শুনে ২০১২ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন। ছয় মাস পড়ার পর পরিবার থেকে আবার চাপ আসে। সুমাইয়ার পরিবার এ সিদ্ধান্তকে সহজভাবে নেয়নি। এর কারণও ছিল অবশ্য।

এ প্রসঙ্গে সুমাইয়া বলেন, সে সময় আমি থাকতাম উত্তরায়। আমার এখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে খুব সমস্যা হত। অনেক রাত হয়ে যেত বাসায় ফিরতে। এ কারণে পরিবার টেনশনে থাকত। একারণেই তারা আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দিতে চায়নি।

তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেয়ার পর ছয় মাস বাসায় ছিলাম। তখন আমার খুব কষ্ট হতো। আমি রিহার্সেল ফ্লোরে কেন নেই ভেবে দূ:খ পেতাম। মনে খুব কষ্ট হতো। আমি কেন কাজ করতে পারছি না। এ রকম ছিল ব্যাপারটা।

পরে পরিবারের বিপক্ষে যেয়ে সুমাইয়াকে শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ২০১৩ সাল থেকে আবার নিজের বিভাগে ক্লাস করা শুরু করেন। এ বিভাগেই পড়ার প্রতি এতটা আসক্তি কেন হলো জানতে চাইলে সুমাইয়া বলেন, আসলে থিয়েটার আমার খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমার এতটাই ভাল লেগে গিয়েছে যে, থিয়েটার ছাড়া এখন আর কিছুই ভাবতে পারি না।

তিনি বলেন, প্রথমে অনুপ্রাণিত হয়েছি থিয়েটার বিভাগের পরিবেশের সাথে মিশে। আমাদের ক্লাস যে ভাবে হয়, আমাদের যে পড়াশোনার স্টাইল তা ঠিক একটা পরিবারের মত। সবাই খুব আন্তরিক। আমার এ বিষয়টাই সবচেয়ে ভাল লেগেছে।

সুমাইয়া বলেন, এখানে যে আসবে সহজে সে সহজে এখানকার মায়াটা ছাড়তে পারবে না। আমরা থিওরী পড়াশোনা করি, বিভিন্ন কমিউনিকেশন, সমাজবিজ্ঞানের যে বেসিক বিষয়গুলো সবই পড়তে হয় আমাদের। আমরা শুধু নাটক পড়ি না। ট্রেনিং তো থাকেই। প্রতি সেমিস্টারে আমাদের থিওরি থাকে আবার ট্রেনিং থাকে। আমরা রিসার্চ করি।

তিনি বলেন, আমাদের বিভাগের একটা নিয়ম হচ্ছে টিচারার আমাদের যখন ক্লাস নেন তখন ফুল ক্লাস, ফুল ট্রেনিংটিম সবসময় উপস্থিত থাকতে হয়। আসলে এখানে আমরা একটা নিয়মের মধ্যে থাকি। বিভাগের শিক্ষকরা আমাদের যে নিয়মের মধ্যে রাখেন তা আমাদের জন্যই ভাল।

উম্মে সুমাইয়া, বিভাগের শিক্ষকরা আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করেন। আমরা প্রতিটি শিক্ষকের সার্বিক সহযোগীতা পাই। বিশেষ করে আমার বিভাগের শিক্ষক শাহমান মইশান স্যারের কথা না বললেই নয়। তিনি আমাকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়েছেন সব সময়। শুধু আমাকে নয় পুরো বিভাগের সবাইকে তিনি আগলে রেখেছেন।

থিয়েটারের প্রতি আলাদা একটা টান অনুভব করেন সুমাইয়া। তিনি বলেন, থিয়েটার তো আমি আর কখনই ছাড়তে পারব না। আমার টার্গেট হলো আমি থিয়েটার নিয়েই থাকব। পড়ালেখার জগতেই থাকতে চাই।

ভবিষ্যতে কি করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে সুমাইয়া বলেন, ভবিষ্যতে চাকরি করবো নাকি অন্য কিছু করবো তা দেখা যাবে। আসলে আমি কি করবো তা আমার যোগ্যতার উপর নির্ভর করবে। তবে আমার স্বপ্ন হচ্ছে টেকনাফে একটা ড্রামা থিয়েটার করবো।

জীবনে সফলতার চাবিকাঠি কি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতেু আমরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আমাদের চর্চা করা উচিত। যখন যেটা শিখছি সেটা যদি আমরা পুরো শিখতে না পারি, বাইরে গিয়ে যা শিখব সব ভাসা ভাসা হবে। প্রথমে আমি আমার শিক্ষাটা ভালভাবে নিবো। তারপর আমার যেদিকে বেশি আগ্রহ তা যে কোনো কিছুই হোক সেটা করব। আমাদের সবারই প্রথমে শিক্ষকদের শিক্ষা, দ্বিতীয় পরিবার থেকে শিক্ষা এবং তৃতীয়ত যার যার নিজের বিবেক থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।