ঢাকা, সোমবার ২১, অক্টোবর ২০১৯ ২৩:৩৭:৪৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
এমপিওভুক্তি বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে বসছেন শিক্ষামন্ত্রী খালেদার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেলেন ড. কামাল বরগুনায় জোছনা উৎসব আগামী ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের ৯ বিচারপতির শপথ গ্রহণ দাবি না মানায় ফের আমরণ অনশনে শিক্ষকরা

দেখে এলাম টাঙ্গুয়ার হাওড় : সালমা আফরোজ

সালমা আফরোজ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৫২ এএম, ১০ অক্টোবর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

টাঙ্গুয়ার হাওড়ের ছবি তুলেছেন লেখক।

টাঙ্গুয়ার হাওড়ের ছবি তুলেছেন লেখক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে টাঙ্গুয়ার হাওড়ের ছবি দেখেছি বহুবার। যার ফলে ওখানে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে প্রবল থেকে প্রবল হয়েছে। আর তাই সম্প্রতি ঘুরেও এলাম সৌন্দর্যে ভরা টাঙ্গুয়ার হাওড়।

টাঙ্গুয়ার হাওড় সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভুমি। অথৈ পানি, জলাবন, নীল আকাশ, পাহাড় ও চোখ জুড়ানো সবুজে ঘেরা এই হাওড় অপরূপ সাজে সাজানো।

টাঙ্গুয়ার হাওড়ের মোট আয়তন ৬৯১২ একর। তবে বর্ষায় এর আয়তন বেড়ে হয় প্রায় ২০,০০০ একর। ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওড়। মেঘালয় পর্বত থেকে প্রায় ৩০টি ঝরণা এসে সরাসরি মিশেছে হাওড়ের পানিতে। এর প্রবেশ মুখেই সারি সারি হিজল গাছ যেন আমাদের অভ্যন্তনা জানালো। হাওড়ের স্বচ্ছ পানির নিচে তাকালে দেখা যায় হরেক রকম লতাপাতা জাতীয় জলজ উদ্ভিদ।

‘ফ্লাই ফার লেডিস’ নামে একটা লেডি গ্রুপের সাথে আমরা ৩৪ জন মেয়ে গিয়েছিলাম টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। আমাদের প্যাকেজ ট্যুরে ছিল টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ঘুরাঘুরি, ওয়াচ টাওয়ারের পাশে হিজল গাছের অলি গলির পানিতে ঝাপাঝাপি, নিলাদ্রী লেক, যাদুকাটা নদী আর তার পাশে শিমুল বাগান ঘুরে দেখা।

১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে গিয়ে ২২ তারিখ ভোরে ফিরেছি। এ ট্যুরটি ছিল যাওয়া আসা মিলিয়ে ১ রাত ২ দিনের। ট্রিপের জনপ্রতি খরচ ছিল ৪০০০ টাকা। যাত্রা শুরু করেছিলাম শুক্রাবাদ শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার থেকে। রাত ১১টায় বাস ছাড়ে সুনামগঞ্জ জেলার উদ্দেশ্যে। ভোর ৫টায় সিলেট পার হয়ে ভোর সাড়ে ৫টায় পৌঁছে যাই সুনামগঞ্জ।

সুনামগঞ্জ পৌঁছেই পানসী রেস্টুরেন্টে সবাই সকালের নাস্তা করি। তারপর রিজার্ভ করা লেগুনা নিয়ে তাহিরপুরের দিকে ছুটে চলা শুরু। যেতে যেতে রাস্তার পাশের সৌন্দর্য মন প্রাণ ভরে উপভোগ করেছি। তাহিরপুর যাওয়ার সময় প্রকৃতির যে রূপ দেখেছি তা সত্যিই অসাধারণ। সৃষ্টিকর্তার এতো সুন্দর সৃষ্টি দেখে তার প্রতি নিজের অজান্তেই মাথাটা নত হয়ে আসে। রাস্তার দুই পাশে পানিতে লাল শাপলা। উহ্ দেখার মতো দৃশ্য।

সকাল ৯টার মধ্যে আমরা তাহিরপুর পৌঁছেই সোজা ট্রলারে উঠে গেলাম। হাওরের উদ্দেশ্যে ট্রলার ছাড়ে তাহিরপুর থেকেই। চলে গেলাম ট্রলারের পিছনের দিকে, বুক ভরে নিশ্বাস নিলাম। ঢাকার বাতাস আর এখানকার বাতাসে অনেক তফাৎ। ওখানে গ্রুপের দুইজন বসে আছে। ছোট জায়গা, আমি ছোটখাট মানুষ, জায়গা করে নিলাম। হাওরের পানিতে তাকাতেই শিমুল তুলার মতো ঘন ঘন মেঘ খেতে পেলাম। আকাশের মেঘ যেন পানিতে এসে মিশেছে। কি অপরুপ দৃশ্য।

আমাদের ট্রলার চলছে হালকা চালে। সামনেই একটা গ্রাম। সেখানে নদীতে ছোট বাচ্চা-বড় সকলে গোসল করছে। তারা আমাদের দেখছে কৌতুহল ভরা চোখে।

হাওড়ের মাঝখান দিয়ে ট্রলারটি চলতে লাগলো নিজ গন্তব্যে। আমাদের চোখেমুখে প্রশান্তি। যে দিকে তাকাই পানি আর পানি। গ্রামের পর গ্রাম, গাছ, সবুজ পাহাড়। বার বার মনে হচ্ছিল পাহাড়ে উঠতে পারলেই আকাশ ছুঁতে পারতাম।

প্রায় দেড় ঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম হিজল গাছের বাগানে। বিশাল এ জলাভূমিতে প্রকৃতি যেন বেড়ে উঠেছে আপন খেয়ালে। এ সৌন্দর্য্য নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। সবাই আমরা লাইফ জ্যাকেট পড়ে পানিতে লাফিয়ে পড়ি। কতক্ষণ ঝাপাঝাপি করার পর সবাই উঠে গেলাম।

আবার ট্রলার চলতে শুরু করলো। মাঝখানে একবার থামাল ট্রলার, দুপুরে খাবার খাওয়ার জন্য। মেনু ছিল ভাত, হাওড়ের মাছ, সবজি ও ডাল। বেশ তৃপ্তি করে খেলাম। রান্না করেছিল ট্রলারের মাঝি ও তার সহযোগীরা।

এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো নীলাদ্রি লেকে। মনে মনে নীলাদ্রি লেক যতটা কল্পনায় ছিল, তার থেকেও অনেক অনেক বেশি সুন্দর। চোখ ধাঁধানো সুন্দর। ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, নীলের রাজ্যে সারা বিকেল ডুবে ছিলাম সকলে। গাছের নিচে ইট সিমেন্টের সোফায় বসে ছিলাম সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত। ওখান থেকে উঠে যেতে মন একটুও চাইছিল না। তবুও উঠতে হলো। তারপর আবারও ট্রলারে চড়ে বসা, আবারও ছুটে চলা।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে এবার ট্রলার পাড় থেকে একটু ভিতরে নামালো। রাত নেমে এসেছে। আধো আলো আধো অন্ধকার। চারদিকে ৫০টারও বেশি ট্রলার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একেক ট্রলার থেকে একেক রকম গান ভেসে আসছে। ওপরে খোলা আকাশ, ট্রলারের ছাদে বসে আছি, সে রাতের কথা কোনদিন ভোলা সম্ভব না। সে এক অন্য রকম অনভুতি।

অনেক রাতে ঘুমাতে গেলেও খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আবারও তারপর আবারও ট্রলারের ছাদে। সকালে নাস্তা করে চলে গেলাম জাদুকাটা নদী দেখতে। উপরে নীল আকাশ, নিচে স্বচ্ছ পানি। উথাল পাতাল ঢেউ নেই, কি শান্ত বিশাল নদী। ঝকঝকে আকাশের সঙ্গে পুরো এলাকাটাই মনে হবে রঙিন ক্যানভাস। অসাধারণ স্বপ্নিল এক পরিবেশ। বিস্ময়ে আমি অভিভূত। এখান থেকে আমরা ছুটে চললাম জাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত শিমুল বাগানের উদ্দেশ্যে।

ভালোবাসার মৌসুমে লাল শিমুল ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে গাছে আর মাটিতে। কিন্তু সিজন না থাকায় দেখলাম সবুজ আর সবুজ। চোখ ধাঁধানো এমন সবুজ আর কোথাও দেখিনি। প্রকৃতিপ্রেমী আর ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে অনেক প্রিয় হয়ে উঠেছে একশ’ একরের বেশি জায়গাজুড়ে অবস্থিত এ বাগান। তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়বদল ইউনিয়নের এ গ্রামের নাম মানিগাঁও। এ বাগানে প্রায় ১৪ বছর আগে তিন হাজার শিমুলের চারা রোপণ করেছিলেন স্থানীয় চেয়ারম্যান বৃক্ষপ্রেমী জয়নাল আবেদীন। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনেক আগেই চলে গেছেন তিনি। কিন্তু তার এ অনন্য কীর্তি রয়ে গেছে আজও।

এবার ঢাকায় ফেরার পালা। আবার তাহিরপুর থেকে লেগুনা করে রওনা দিলাম সুনাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে। পথে আমাদের বোনাস পাওনা হাসন রাজার বাড়ি দেখা। তারপর সেই পানসী রেস্টুরেন্ট। সেখানে রাতের খাবার খেয়ে শ্যামলী বাসে উঠে পড়লাম। কালো পিচঢালা পথে চাকা ঘষে বাস চলা শুরু করেছে। টাঙ্গুয়ার হাওড়ে পদচিহু রেখে নিয়ে এলাম বেশ কিছু ছবি আর স্মৃতি। চোখ বন্ধ করলেই দেখছি ট্রলার, লেকের স্বচ্ছ পানি, সবুজ শিমুল বাগান। ঢাকায় পৌঁছালাম যখন তখন মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজানের সুর।

# সালমা আফরোজ, সাংবাদিক