ঢাকা, রবিবার ২৪, মার্চ ২০১৯ ০:৫৩:১৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
বরিশালে বাস ও মাহেন্দ্রর সংঘর্ষে তিন নারীসহ নিহত ৬ বসল নবম স্প্যান, পদ্মা সেতুর প্রায় দেড় কিলোমিটার দৃশ্যমান ব্রেক্সিট নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্রিটেনকে দুই সপ্তাহ সময় দিল ইইউ গোটা নিউজিল্যান্ডের নারীরা স্কার্ফে মাথা ঢাকবেন আজ চীনে কেমিক্যাল প্লান্টে বিস্ফোরণ, নিহত ৪৭

ধর্ম কী কেবল পুরুষের : সেবিকা দেবনাথ

সেবিকা দেবনাথ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:১৭ এএম, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার

সেবিকা দেবনাথ, ছবি : ফেসবুক থেকে

সেবিকা দেবনাথ, ছবি : ফেসবুক থেকে

ছোট বেলায় ধর্ম বইতে পড়েছিলাম, ‘ভক্তের অধীন ভগবান’। কথাটা সেই  থেকে আমার মনে ধরেছিলো। ঠিকই তো। সৃষ্টির মধ্য দিয়েই না ঈশ্বরের বা স্রষ্টার মহিমা প্রকাশ হয়। আমরা মানি বলেই না স্রষ্টার অস্তিত্ব। না মানলে কে পূজতো তাকে? কে তাকে সর্বশক্তিমানের স্বীকৃতি দিয়ে মাথায় তুলে রাখতো? কে গাইতো তার মহীমা?

আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। তবে ধর্মকর্মে যে খুব বেশি মতি সেই দাবি করি না। নিজেকে নাস্তিক দাবি করার মতো বিদ্যা ও সাহস কোনটাই আমার  নেই। আমার কাছে স্রষ্টার এমন একজন আমি তাকে চাই বা না চাই তিনি আমাকে কখনও ত্যাগ করতেই পারেন না। তাকে ভালবাসা যায়, তার সাথে অভিমান করা যায়। পরিস্থিতি ঊনিশ থেকে বিশ হলে তাকে গাল মন্দও করা যায়। বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন বাস পাই না এমন তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু করে কোন কিছু চেয়ে না পেলে আমি ঠাকুর দেবতাকে কটু কথা বলি। মনে মনে তাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেই। কিভাবে তাকে সায়েস্তা করা যায় সেই ফন্দিও আঁটি। আবার না চাইতেই যখন কিছু পেয়ে যাই তখন তাকে ধন্যবাদ জানাই। ‘আই লাভ ইউ’ বলি। আগে তাকে ভুল বুঝেছিলাম বলে ‘সরি’ বলি। আমি বিশ্বাস করি ঈশ্বর আমার মাঝে আছেন। আমি কষ্ট পেলে সেও কষ্ট পায়। আমি ভাল থাকলে তারও ভাল লাগে।

নারী, ধর্ম ও ধর্মীয়স্থানে নারীর প্রবেশাধিকারের বিধিনিষেধের বিতর্ক দীর্ঘ দিনের। বিশেষ কোন ধর্মে নয় সব ধর্মেই এটি রয়েছে। এর বিরুদ্ধে নারীদের লড়াইও অনেক দিনের। কিন্তু এর শেষ কোথায়? বেশ কয়েক দিন যাবৎ ভারতের কেরালার শবরিমালা মন্দির নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি রিপোর্ট পড়লাম। ইউটিউবে এ সংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও দেখলাম। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবতা ‘আয়াপ্পা’। বছরের নির্দিষ্ট সময় এই মন্দির খোলা থাকে। তবে তা সবার জন্য নয়। ‘আয়াপ্পা’ ব্রহ্মচারী ছিলেন বলে সেখানে নারী প্রবেশ নিষিদ্ধ।  সেই নারীর মধ্যেও বিভেদ করা হয়েছে। ১০ থেকে ৫০ বছরের ঋতুবতী নারীরা ‘আয়াপ্পা’র দর্শন পাবেন না। কারণ ওতে নাকি ‘আয়াপ্পা’ রাগ করতে পারেন। সেখানকার অধিকাংশ জনমনে এমনটাই বিশ্বাস। ১৯৯১ সালে কেরালার হাইকোর্ট মন্দিরে নারীদের প্রবেশে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কেন? ঋতুবতী হওয়াটা কি পাপ? ৫০ বছরের পরও যে সব নারী ঋতুবতী থাকেন তাদের জন্য কী বিধান ছিলো? যে বয়সে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো কতজন নারী ওই বয়সের পর এতদূর পথ পায়ে হেঁটে যেতে পারেন? তার চেয়েও বড় কথা ঈশ্বরের কাছে জাত-পাতের বিচার থাকবে কেন? তার দ্বার হবে অবারিত। সবার জন্য। সব সময়ের জন্য। 

যাক, আগে কী হয়েছে সেই কথা থাক। ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত আগের দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ওতে তো  লেটা চুকে যাবার কথা। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই। ঈশ্বর দর্শনে লুকিয়ে কিংবা পুলিশি পাহাড়ায় ভক্তদের যেতে হচ্ছে সেই মন্দিরে। 

এবার আরেকটি ঘটনা বলি। ভারতের মুম্বাইয়ের হাজি আলী মাজারে (পীর হাজি আলি শাহ বুখারির মৃতদেহ যেখানে শায়িত)  নারীদের প্রবেশাধিকার ছিলো নিষিদ্ধ। মাজার পরিচালনাকারী বোর্ড ২০১২ সালে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাদের মতে, মসজিদের ভেতরে পুরুষ দরবেশের সমাধিতে নারীদের স্পর্শ করার অনুমতি দেওয়া ‘পাপ’। এরপর মাজারে প্রবেশের জন্য মুসলিম নারীরা লাড়াই  করে। অতপর এ বিষয়ে ২০১৬ সালে দেশটির আদালত একটি রায় দেয়। আদেশে ওই মাজারে নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাকে ‘সংবিধান পরিপন্থী’ এবং ‘নারীর প্রতি বৈষম্য’ উল্লেখ করা হয়। 

ভিন দেশ থেকে এবার নিজের দেশে আসি। আমাদের দেশে মন্দিরে নারীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে হয়তো তেমন কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু মূল মন্দিরে (গর্ভমন্দির) প্রবেশের অনুমতি কি পায় নারীরা? এ পর্যন্ত একজন নারী পূজারীতো চোখে দেখলাম না এই জীবনে। বিভিন্ন কবরস্থানে নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ। দূরে দাঁড়িয়ে বাবা-মা কিংবা প্রিয়জনের কবর জিয়ারত করতে হয়। মাজারগুলোতেও একই অবস্থা। নারীর জন্য ‘নো এন্ট্রি’। মক্কা-মদিনায় নারীরা মসজিদে প্রার্থণা করতে পারলেও নারী কাজি কিংবা ইমাম হলেই যত গন্ডগোল। 

খৃষ্টানদের মধ্যেও রোমান ক্যাথলিক বা একটু গোঁড়া ধারাগুলি নারীদের সন্ন্যাসিনী হয়ে ওঠা স্বীকার করলেও ধর্মে প্রবক্তা প্রিস্ট থেকে বিশপ হয়ে উঠতে দিতে অনেক সময় নিয়েছে। শুধু নারী নয়, পশ্চিমি দেশে কালো মানুষ ধর্মাচরণের দিক থেকে বহু বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অথচ ঘরে কিংবা পরিবার পরিজনের মঙ্গল কামনায় ধর্মীয় আচার পালন নারীরাই বেশি করে। 

নারী ‘ঋতুবতী’, নারী ‘নাপাক’ তাই মন্দির, মসজিদ, মাজার কিংবা পবিত্রস্থানে নারীর প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। কিন্তু সংস্কৃতে স্ত্রীকে বলা হয় ‘সহধর্মিণী’। এর অর্থ স্বামীর সঙ্গে সমানভাবে ধর্মাচরণের অধিকারী। তাহলে সত্যটা কী দাঁড়ায়? এত যে অজুহাত টেনে নারীর প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা হচ্ছে ঐতিহ্য তো বলছে অন্য কথা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরও ধর্মের সমান অধিকারের কথা বলা আছে। তাহলে কার স্বার্থে এত নিষেধাজ্ঞা সেটি কি বুঝতে বাকি থাকে? 

হায় ঈশ্বর! মুখে তোমাকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে বললেও তোমার সৃষ্ট মানুষের রাজনীতির অংশ হয়ে গেছো তুমি। মূলধন ছাড়া লাভজনক ব্যবসা জুড়ে দিয়েছে তোমাকে নিয়ে।

৥ সেবিকা দেবনাথ, সাংবাদিক