ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০২, ডিসেম্বর ২০২১ ৪:০৪:১৪ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ভারত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত স্থগিত ব্রাজিলে করোনার নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ শনাক্ত ২৩ দেশে ছড়িয়েছে ওমিক্রন,৭০ দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা কাল শুরু এক দিনে করোনায় শনাক্ত ২৮২, মৃত্যু ২

নারীর ভ্রমণসাহিত্য : কৃষ্ণভাবিনী দাস থেকে ফাতিমা জাহান

মাহমুদা পারভীন | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৪ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০২১ বুধবার

‘মওলানা জালালউদ্দিন রুমির খোঁজে তুরস্কে’ বইয়ের প্রচ্ছদ।

‘মওলানা জালালউদ্দিন রুমির খোঁজে তুরস্কে’ বইয়ের প্রচ্ছদ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী লেখক ছিলেন। তাকে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি শৈশবে তার ছোট ভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ঘটা করে হিমালয় দেখাতে নিয়ে যেতেন, ধারণা করা যায় স্বর্ণকুমারী দেবীও পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের মতো ভ্রমণসাহিত্য লিখতেন।

সুযোগের অভাবে নারীদের হাতে ভ্রমণসাহিত্য সব ভাষাতেই কম রচিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি ফাতিমা জাহানের মওলানা জালালউদ্দিন রুমির খোঁজে তুরস্কে বইটা পড়ে বাংলা সাহিত্যে নারীদের ভ্রমণসাহিত্যের খোঁজ করতে গিয়ে বিস্মিত হয়েছি। আমার ধারণা ছিলো নবনীতা দেবসেন এবং রাবেয়া খাতুন ছাড়া তাদের পূর্বসুরীদের ভেতর কৃষ্ণভাবিনী দাস আর হরিপ্রভা তাকেদাই কেবল রয়েছেন। কিন্তু দেখা গেল এরা ছাড়াও আরও কেউ কেউ এবিষয়ে এগিয়ে রয়েছেন। কৃষ্ণভাবিনী দাসই বাংলা সাহিত্যে প্রথম নারী হিসাবে ১৮৮৫ সালে ইংলন্ডে বঙ্গমহিলা  নামে ভ্রমণসাহিত্য লিখেন। তার তিন বছর পর ১৮৮৮ সালে প্রসন্নময়ী দেবী আর্য্যাবর্তে বঙ্গমহিলা নামে আরেকটি ভ্রমণকাহিনি লিখেন। ১৯১৫ সালে ঢাকার হরিপ্রভা, বৈবাহিক সূত্রে জাপানযাত্রা এবং কিছু দিন সেখানে বসবাসের স্মৃতি নিয়ে রচনা করেন বঙ্গমহিলার জাপানযাত্রা। হরিপ্রভা পর্যন্ত সকলকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বঙ্গমহিলা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সময়কে বিবেচনায় নিলে এটি কোনো অস্বাভাবিক বিশেষণও নয়।

বাংলা সাহিত্যে প্রথম ভ্রমণকাহিনি লিখেছিলেন বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। তার গ্রন্থটির নাম কালনা থেকে রংপুর। এরপর বহুল আলোচিত পালামৌ ভ্রমণগ্রন্থটি লিখেন সঞ্জীব চন্দ্রচট্টোপাধ্যায়। এদের কাছাকাছি সময়েই নারীদের রচিত ভ্রমণকাহিনিগুলো প্রকাশিত হয়েছে। বিলেতে সাড়ে সাতশো দিন নামে মো: আব্দুল হাইয়ের একটা বইয়ের কথা অনেকেরই জানা আছে; কিন্তু জগৎমোহিনী চৌধুরী যে তার অনেক আগেই ১৯০২ সালে ইংলন্ডে সাত মাস নামে একটা ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন তা কয়জনের জানা আছে? ১৯১৫ সালে শ্রীমতী বিমলা দাশগুপ্ত নরওয়ে ভ্রমণ নামে ভ্রমণকাহিনি লিখে অনেক প্রশংসিত হয়েছিলেন। শরতরেণু দেবীর পারস্যে বঙ্গরমণী (১৯১৬) এবং লেডি অবলা বসুর জাপান ভ্রমণ (১৯১৬) গ্রন্থগুলোও বেশ আলোচিত হয়েছিলো। এরপর প্রতিভা বসুর কিছু ভ্রমণগদ্য ছাড়া নবনীতা দেবসেন এবং রাবেয়া খাতুন বেশ কিছু ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন।
সম্প্রতি ফাতিমা জাহানের
মওলানা জালালউদ্দিন  রুমির খোঁজে তুরস্কে বইটি পড়ে বিস্মিত, আনন্দিত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি। ফাতিমা জাহান ভ্রমণ করেন, ভ্রমণগদ্য লিখেন। এই বইটি ছাড়াও ফাতিমার খণ্ড খণ্ড অনেকগুলো ভ্রমণগদ্য সাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখকের ভাষাপ্রাঞ্জল, দেখবার দৃষ্টিটি স্বতন্ত্র, বর্ণনার ভঙ্গিটি নতুন এবং কখনও কখনও কৌতুক প্রিয় ও বুদ্ধিদীপ্ত। ফাতিমা বইটি উৎসর্গ করেছেন: পৃথিবীর সে সব বঞ্চিত নারীদের, যাদের মন পড়ে থাকে ভ্রমণে। যাদের সামাজিক বা পারিবারিক নিষেধের জালে আটকা পড়ে দেখা হয়ে ওঠে না অপার বিস্ময়।

ফাতিমার বইটি হাতে নিয়ে প্রথমেই উৎসর্গের অপারবিস্ময় কথাটুকুতে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে ভাবছিলাম জগতের আনন্দযজ্ঞে, অপার বিস্ময়ে নারীর অংশগ্রহণ কতটুকু? অপরাপর সব ক্ষেত্রের মতো এখানেও পরিস্থিতি শোচনীয়। সব বাধা অতিক্রম করে ফাতিমা জাহান আঠারো বছর বয়সে প্রথম ভ্রমণ শুরু করেন একাই। তার ভ্রমণের একটা বিশেষত্ব তিনি একজন সলোট্রাভেলার। তার এই একাকী সাহসী ভ্রমণ এবং ভ্রমণকাহিনি দুইই প্রশংসাযোগ্য।

ফাতিমার এই বইটি অন্য সব ভ্রমণগদ্যের চেয়ে খানিকটা আলাদা। তুরস্ক ভ্রমণ করেছেন তিনি মওলানা জালালুদ্দিন রুমির কবিতা সাথে করে। সমগ্র বর্ণনায় লেখক প্রসঙ্গক্রমে সংযুক্ত করছেন রুমির কবিতা। বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে লেখক ইস্তাম্বুলে নেমেই উচ্চারণ করেন রুমির বাণী: ভ্রমণ তোমার জীবনে ভালোবাসা ও শক্তি ফিরিয়ে আনে।

ফাতিমা নিজের ভেতর অপার শক্তি ধারণ করে তিরিশ দিন তুরস্কের প্রদেশ থেকে প্রদেশে একা ভ্রমণ করেছেন বিস্ময় আর আনন্দ নিয়ে। আমিন্টাসটুম্ব, কাপদোকিয়া, গোরমে শহরে, অলিম্পাস নগরে, রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারে, ট্রয় নগরে ফাতিমা বেড়াতে বেড়াতে রুমিকে স্মরণ করেন:
 ‘পথটা তোমার আর তুমি একা।
অন্যরা হয়তো তোমার সাথে সাথে চলবে
কিন্তু কেউ তোমার হয়ে পথ পাড়ি দেবে না।

নিজের পথটা এই লেখক ভালোই চিনেছেন এবং পথ পাড়ি দেওয়ার শক্তি ও সামর্থ্য নিজেই অর্জন করেছেন। অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ট্রয় নগরী ও হেলেনের প্রসঙ্গটি। হেলেনকে, হেলেনের স্বাধীনসত্তাকে, নারীর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়াকে, নিজেকে মূল্য দেয়াকে এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন করে এর আগে কেউ বয়ান করেছেন বলে মনে হয় না। ট্রয় নগরীর পতনের জন্য ইতিহাস আর লোকশ্রুতিতো এক তরফাভাবে হেলেনকেই দোষী সাব্যস্ত করে রেখেছে। ফাতিমা ট্রয় নগরীর বর্ণনার পাশাপাশি হেলেনের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে হেলেনের দায়মুক্তিও ঘোষণা করেছেন তার লেখায়।

ফাতিমার লেখার একটি বৈশিষ্ট্য তিনি সংযতবাক। তার গদ্য নির্মেদ। রুমিকে উপলক্ষ করে প্রায় পুরো তুরস্ক তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু রুমির সমাধি দর্শন এবং এর বর্ণনায় আবেগকম্পিত হয়েও বর্ণনায় তিনি মিতবাক। পুরো ভ্রমণকাহিনিজুড়ে ফাতিমা প্রাসঙ্গিকভাবে রুমির অনেক কবিতা নিজের অনুবাদে উল্লেখ করেছেন। এতে করে এই ভ্রমণগদ্যে যুক্ত হয়েছে এক ধরনের গীতলতা। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেও এই গ্রন্থটি স্বতন্ত্র। ফাতিমা জাহান একজন কবিও। Poetry is lost when translated. বহুশ্রুত এই কথাটি ফাতিমা একেবারে বাতিল প্রমাণ করেছেন রুমির কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে। কারণ রুমির কবিতা অনুবাদে মোটেও হারায়নি বরং বাংলায় অনূদিত এই কবিতাগুলোতে নতুন প্রাণসঞ্চারিত হয়েছে। রুমির বাণী ও দর্শন নিজের ভেতর ধারণ করে লেখক তৈরি করে নিয়েছেন নিজের এক মরমি ভুবন। ভ্রমণকাহিনির ছত্রে ছত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ফাতিমার বর্ণনায় কদাচিৎ নিজের প্রসঙ্গ আসে বরং তিনি অনুসন্ধানী ও কৌতূহলী মন নিয়ে তার ভ্রমণ গন্তব্য সংশ্লিষ্ট ইতিহাস ও সংস্কৃতির বর্ণনা করেন নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে। তার এই বৈশিষ্ট্যটি তার লেখাকে স্বতন্ত্র একটি মর্যাদা দিয়েছে। ফাতিমার  গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অনুপ্রাণন প্রকাশন। এর দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন কারু তিতাস। বাংলা সাহিত্যে ফাতিমার ভ্রমণকাহিনিটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বেশ কিছু নারী ট্রাভেলার দল তাদের অদম্য যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। উত্তরোত্তর তাদের এই যাত্রার পরিধি ও গন্তব্য সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। এই আশাব্যঞ্জক অগ্রযাত্রায় ফাতিমার বইটি নতুন আলো প্রদর্শন করবে।

বাংলার প্রথম নারী লেখকের ভ্রমণকাহিনি ইংলন্ডে বঙ্গমহিলা গ্রন্থে কৃষ্ণভাবিনী ভ্রমণ বিষয়ে এদেশের নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন-

গৃহকার্য বিনা কিছুই দেখ না ...
বারেক যদিরে পাও এ আস্বাদ 
অধীন জীবনে স্বাধীনতা সুখ,
থাকিতে না চাবে আর কারাগৃহে 
ঢাকিবে না আর ঘোমটাতে মুখ...

লেখকের ভাষা যে দুর্বল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে মনে রাখতে হবে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৬৫ সালে। তখনও রবীন্দ্রনাথের 'ইউরোপ প্রবাসীর পত্র' নামের ভ্রমণকাহিনিটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। এখানে কৃষ্ণভাবিনীর লেখার ব্যাকরণিক মান বিশ্লেষণ না করে বরং তার বক্তব্যটুকু চলুন অনুধাবন করি। এতদিন পরেও স্বল্পশিক্ষিত কৃষ্ণভাবিনীর কথাগুলো প্রাসঙ্গিক। চলুন ফাতিমার মতো সাহস করে বেরিয়ে পড়ি অপার বিস্ময়ের সন্ধানে।

কৃষ্ণভাবিনী থেকে ফাতিমা জাহান- সব নারী ভ্রমণকাহিনি লেখকদের শ্রদ্ধা জানাই।