ঢাকা, মঙ্গলবার ২২, অক্টোবর ২০১৯ ১:০১:৩১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
এমপিওভুক্তি বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে বসছেন শিক্ষামন্ত্রী খালেদার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেলেন ড. কামাল বরগুনায় জোছনা উৎসব আগামী ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের ৯ বিচারপতির শপথ গ্রহণ দাবি না মানায় ফের আমরণ অনশনে শিক্ষকরা

বনলতা নয়, কঙ্কনা

রুনা লেইস | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৪৮ এএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

সিঁদুরের কৌটোটা তুলতে তুলতে মনটা আবারো খুব উচাটন করে উঠলো কঙ্কনার। কালরাতের স্বপ্নটা মনে পড়লো, এতো জীবন্ত যে স্বপ্ন বললে ভুল হবে।
এভাবে কেউ ফিরে আসতে পারে স্বপ্নের হাত ধরে একেবারে বাস্তবে? সিঁথির চুলে হাত দিয়ে আঙুল চালাতে চালাতে আবার বাস্তবে ফিরলো কঙ্কনা।
কতবছর হলো সিঁদুরের কৌটোটা বন্ধ করে রাখা আছে সযতনে, কখনো নড়চড় হয়নি। কিন্তু আজই এরকম কেনো হলো? কৌটোটা উল্টে পড়ে এতোগুলো সিঁদুর গড়াগড়ি যাচ্ছে তাকের ওপর, ভাঁজ করা জামাকাপড় শাড়ীতে লেগে আছে।
কাল রাতে সুধীরকে দেখেছে স্বপ্নে । কঙ্কনা নামটা সুধীরের দেয়া। ওর আসল নাম ফারজানা সুলতানা কনা। কনা বলেই সবাই ডাকতো। সুধীর কুমার সেনের সাথে পরিচয় হবার আগে কনা কখনো ভাবেই নি  কঙ্কনা নামটা নিজের বলে একদিন সবাই জানবে। কলেজের ডিবেট কম্পিটিশনে কনা শ্রেষ্ঠ বক্তা হবার পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। তখন একটা ছেলে পিছন থেকে ডাকলো,
: এ্যাই যে মিস কঙ্কনা একটু শুনবেন?
বাকি সবার মতই ও অবাক হয়ে তাকালো, তারপর মিষ্টি হেসে একদম ঝটপট উত্তর দিল, ঝানু বক্তা ও বিতার্কিক সে, সেটা তার সব সময়ই মনে থাকে।  বললো, আপনি মনে হয় অন্য কাউকে খুঁজছেন।
: না না, আমি আপনাকেই খুঁজছি মিস কঙ্কনা।
: কঙ্কনা আমার নাম নয়, আমি কনা।
: ওই তো, ক--না, মাঝে একটু শব্দালঙ্কার লাগিয়েছি মাত্র , ওটাই আপনার নাম, আমি রেখেছি।
: মানে?
: মানে আপনাকে আপনার চমৎকার বক্তৃতা শুনে নামটা উপহার দিলাম আমি। এখন আমার জন্য একটা কাজ করতে হবে আপনাকে, চলুন।
: কি কাজ?  কোথায় যাবো?
: আরে চলুন তো, প্রিন্সিপাল স্যার ডাকছেন।
কনা বন্ধুদের দিকে অসহায় তাকালো, তখন আফরোজা বললো, কনা, তুই যা না সুধীরদার সাথে। নিশ্চই স্যার কোনো কাজের জন্য ডেকেছেন।
আফরোজা চেনে যখন তাহলে তো এই ছেলে কলেজেরই, সেটা ভেবে রওয়ানা হলো কনা।

স্যারের রুমে যেতে যেতে সুধীর মোটামুটি নিজের সম্পর্কে একটা ছোটখাটো লেকচার দিয়ে ফেলেলো।
কনাদের দু ইয়ার সিনিয়ার সুধীর, পড়ছেন অনার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। থিয়েটার করা, কবিতা লেখা ও ক্রিকেট এই তিনের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িত। কথার মধ্যে কোনো জড়তা নেই, যেন কনার সাথে বহুকালের পরিচিত এমনভাবেই কথা বলে চলেছেন। সচরাচর এরকম করে এতো সহজ সাবলীলতায় কনার সামনে কোনো ছেলে কথা বলতে পারে না, ব্যাপারটা বেশ ভালোই লাগলো কনার।
প্রিন্সিপ্যাল স্যারের রুমে গিয়েও একই রকম প্রানবন্ত সুধীর, কি দ্বীধাহীন বলে ফেললেন, স্যার, এ হচ্ছে কঙ্কনা, খুব ভালো বিতার্কিক, আমি ঠিক করেছি ও আমার সাথে দেয়ালিকা আর কালচারাল প্রোগ্রামে কাজ করবে।
স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কোন ইয়ার?
: স্যার,আমি ফার্স্ট ইয়ার, সাইন্স , আমার নাম...

তাকে আর কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে সুধীর বাকীটা বলে দিল,
: স্যার, আমরা আজকে থেকে কাজ শুরু করলে আশা করছি আগামী পনেরো দিনে সব কমপ্লিট হয়ে যাবে।
:ঠিক আছে সুধীর, তুমি আর কঙ্কনা মিলে প্রোগ্রামের রিহার্সেল আর লেখা সংগ্রহ করো আমি ফাইনালের আগে একবার বসবো তোমাদের সাথে।
বলেই স্যার ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ওকে কঙ্কনা, কাজ শুরু করে দাও।

: চলো কঙ্কনা.... কাজ শুরু করি,
 বলে সুধীর ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা দুষ্টুমীর হাসি দিল।

সেই শুরু..... তারপর কনা নামটা কখন যে কঙ্কনার আড়ালে হারিয়ে গেল...মনে করতে পারে না সে।

স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় সুধীর বললো, কি, নতুন নাম পছন্দ হয়নি?
: এটা কি হলো?  স্যারের সামনে এভাবে বললেন?
: আমি তো চাই সবাই তোমাকে কঙ্কনা নামেই জানুক..কি সুন্দর  নামটায় একটা রিদম আছে, কঙ-কনা...  আহা...

সেদিন কনা আর কিছুই বললো না।
সুধীরের সঙ্গে এর মধ্যে দেয়ালিকা আর অনুষ্ঠানের কার্যক্রম এগুচ্ছে ভালোই।

ওই ঘটনার চার পাঁচদিন পর ওর বান্ধবী কেয়া আর আফরোজার সাথে দেখা হতেই ওরা হঠাৎ বলে উঠলো কিরে কঙ্কনা সেন, এবার থিয়েটারে নামবি নাকি সুধীর সেনের সঙ্গে?

: কি?  কি বললি? কঙ্কনা সেন?
 সুধীর আবার সেন হলো কবে?  এসব কি শুরু করলি তোরা?
কেয়া বললো, বা রে!  কঙ্কনা সেন কে চিনিস না!!
কোলকাতার নায়িকা! অপর্না সেনের মেয়ে!
ওর কথার মাঝেই আফরোজা বললো, সুধীরদা নিশ্চই নাটকে নামাবে তোকে দেখিস, ওই জন্যেই তোকে ওরকম নাম দিয়েছে।

সেদিনই প্রথম কনা জানলো সুধীরের পুরো নাম সুধীর কুমার সেন। ওইদিন সুধীরের সঙ্গে একটা ভালোরকমের কথা কাটাকাটি হয়ে গেল কনার। ও সাফ সাফ জানিয়ে দিয়ে এলো, ও আর সুধীরের সঙ্গে কোনো কাজ করবে না।

পরদিন প্রিন্সিপ্যাল স্যার কনাকে ডেকে পাঠালেন।
ও যেতেই দেখলো সুধীরসহ আরো কয়েকজন ছেলেমেয়ে স্যারের রুমে বসে কথা বলছে।
ওকে দেখে স্যার বললেন, এই যে কঙ্কনা, তুমি নাকি বলেছো পড়ার ক্ষতি হচ্ছে তাই প্রোগ্রামের কাজটা করবে না। এরকম করলে তো হবে না মা। পড়ালেখার পাশাপাশি মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাই সবসময় এসব আয়োজনে থাকে। তাছাড়া তুমি তো ফার্স্ট ইয়ার, এমন কিছু সমস্যা হবার কথা তো নয়? এরা সবাই আছে, তোমাকে সাহায্য করবে।

: না মানে, স্যার আমার কথা হলো আমার নাম.. হলো... ইয়ে... মানে
কনা ভেবে পাচ্ছে না স্যারকে কিভাবে বলবে ওর সমস্যাটা কোথায়, সে তার নিজের আসল নামটা পর্যন্ত স্যারকে জানাতে পারছে না।

: শোনো কঙ্কনা, সুধীরকে আমি বলে দিচ্ছি তোমাকে বেশি চাপ না দিতে। সুধীর, তুমি কিন্তু কঙ্কনার সুবিধা অসুবিধার দিকটাও নজর রেখো। আমি তোমাদের যা যা লাগবে সেটা তুষার বাবুকে বলে দিয়েছি, উনি সব ব্যবস্থা করবেন। যাও তোমরা কাজে লেগে পড়ো। যাও কঙ্কনা, তুমিও যাও।

কনা মুখ ভার করে সুধীরের দিকে তাকাতেই দেখে ও ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসছে।
দেখে ওর মেজাজ চরমে উঠলো।
সে ঠিক করলো প্রোগ্রাম তো দূরের কথা সে দেখাই করবে না সুধীরের সঙ্গে।

কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তাতো হয়েই গেছে।
মানে কনাকে সবাই কঙ্কনা নামেই ডাকা শুরু করে দিয়েছে। শুধুমাত্র স্কুলের দু'চারজন বন্ধু পরিচিত বাদে সবাই, এমনকি স্যার ম্যাডামরাও।  ক্লাসের নতুন বন্ধুরাও জানে ওর নাম কঙ্কনা।
ইশ্ কি বিদঘুটে অবস্থা। ক্লাসে স্যার ম্যাডামরা কঙ্কনা বললে সেটা সহ্যও হয় না, আবার সাড়াও দিতে হয়। শেষমেষ অনুষ্ঠানের চিঠিতে এবং দেয়ালিকার মধ্যেও তার কঙ্কনা নামই লেখা হলো।

সেই তো শুরু, প্রোগ্রামটাও কোনোরকমে শেষ করলো কনা, কঙ্কনা নামে।

তারপর ভাবলো এখন সুধীর তাকে আর কোথায় পাবে। আর কোনো কিছুতে সে সুধীরের সঙ্গে যাবে না।

কিন্তু ওই নতুন নামে একদিন ডাকে একটা চিঠি এলো ওর। চিঠির লেখক সুধীর কুমার সেন।  ভেতরে চিঠির সঙ্গে বেশ কিছু কবিতা। সে চিঠির প্রতিটি লাইন আজো চোখের পাতায় ভাসে। মনে আছে প্রতিটি শব্দে অক্ষরে লেখার নিপুণ শৈল্পিক কারুকাজ।
সেই চিঠি আর কবিতার ভেতর দিয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেমের সূত্রপাত, কঙ্কনা নামের পরিপূূর্ণতা পাওয়া। এভাবেই একদিন ডাকে এলো একটি কবিতার বই, সুধীর কুমার সেনের প্রথম কবিতার । বইয়ের নাম  ‘বনলতা নয়, কঙ্কনা’।

আস্তে আস্তে কলেজ থেকে খবরটা সারা শহরের সবখানে ছড়ালো। এইচএসসির পর বাড়িতেও জানাজানি হলো। বাবা-মায়ের প্রচন্ড রাগারাগি, মান-অভিমানে কিছুদিন কাটলো। এর ভেতরেই একদিন শহর ছেড়ে কনা রাজধানীর পথে পা বাড়ালো, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে।
ততদিনে সে শুধু কবিতায় নয়,  মনেপ্রাণে সত্যি সত্যি সুধীরের কঙ্কনা হয়ে উঠেছে।

সুধীর তখন ঢাকায় একটা প্রকাশনার সাথে কাজ করে। ভবিষ্যতে লেখক কবি হবে তাই কবিতা আর নাটক নিয়ে মেতে আছে। সঙ্গে পেয়েছে কঙ্কনাকে । দু চারটা বই টই ছাপা হয়ে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা বছর ছিল ঠিক স্বপ্নের মতই। পারিবারিক, ধর্মীয় সব বাঁধার ঊর্দ্ধে উঠে সুধীরের সাথে যখন সকল প্রাণ-মন-আত্মার সম্পর্ক সেসময় এক বৃষ্টিমুখর দিনে সুধীর নিয়ে এলো বেলপাতায় মুড়িয়ে সাদা জুঁইফুলের মালা, শাঁখা আর সিঁদুর কৌটোটা।

বললো, আমাদের নিয়মে তো তোমায় বিয়ে করতে পারবো না, কোর্ট ম্যারেজ করতে হবে। তাই আজ তোমাকে সিঁদুর পরিয়ে নিজের করে নিতে চাই। দুজনের মন এক হলে আর ধর্মের পথে প্রতিবন্ধকতা দিয়ে কি হবে? আমি আজ মন্ত্রপাঠ করে তোমায় সিঁদুর দিয়ে নিজের করে নেবো,
" যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।"

বলেই সে কঙ্কনার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিল।
আজ থেকে তুমি আমার সত্যিকারের কঙ্কনা সেন।

সেই সিঁদুরের কৌটোটা, শাখা দুটো শুকনো বেলপাতা মোড়ানো ফুল সবই এখনো যত্নে রাখা যক্ষের ধনের মত। বুকের অতলে জমে থাকা প্রেম, অজস্র কবিতার পঙক্তি সব দীর্ঘশ্বাস।
কি করে উল্টে গেল সিঁদুরের কৌটোটা, ভেবে পায় না কঙ্কনা।

কনার ফাইনাল ইয়ার শেষ, বাবা অসুস্থ অনেকটা মৃত্যুশয্যায় বলা যায়। এর আগে হঠাৎ মায়ের মৃত্যু হয়েছে। ভাইয়া দেশের বাইরে পড়তে গেছে।

সে সময় সুধীর বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে জয়েন করে ঢাকার বাইরে।বাস্তব জীবনের প্রয়োজনে ততদিনে নাটক আর কবিতার ভুত সুধীরের মাথা থেকে খানিকটা নেমেছে। প্রকাশনার ছোট চাকরিতে যে কঙ্কনাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করা সম্ভব হবে না টের পেয়েছে সুধীর। আরো আছে সুধীরের পুরো পরিবার বিধবা মা, দুটো ছোট ভাই বোনের লেখাপড়া। সব একা চালাতে গেলে অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয় সেটা বুঝতে পেরেছে সুধীর।

কিছুটা অনিচ্ছাতেই কঙ্কনা রাজী হয়েছিল সুধীরের সরকারি চাকরিতে। সে ভাবলো নিজেও কিছু শুরু করবে, সুধীরকে সাহায্য করবে। তাই মাস্টার্স ফাইনালের পর শেষ ক'টা দিন বাবার সঙ্গে কাটাতে এলো।

বাবার সাথে সুধীরের বিষয়ে কনার সেই এইচএসসির পর আর কোনোদিন কথা হয়নি। জানে বাবা এ ব্যাপারটা মানবে না কখনই। হয়তো এই শেষবারের মত তার বাড়ি আসা। এরপর চিরদিনের জন্য একেবারেই চলে যেতে হবে তাকে সুধীরের কাছে।

তখনি একদিন বাবার এক বন্ধু তার ছেলেসহ বিদেশ থেকে আসলেন তাদের বাড়িতে বেড়াতে। বেশ যত্নআত্তি করলো তাদের কনা। হয়তো অসহায় বাবা তার বন্ধুকে কনা আর সুধীরের কথা বলেছিলেন।
যাবার আগের দিন কয়েক ঘন্টা ধরে বাবা এবং তার বন্ধু মিলে কনাকে যা বোঝালেন তার সারমর্ম হলো এই জগতে প্রেম অবিস্মরণীয় অমর, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন কঠোর ও ভয়াবহ। সবকিছু মেনে নিয়েও দুই ধর্মকে এক করার অর্থ আগামী প্রজন্মের জন্য অসহায় জীবন বয়ে আনা। অনেকেই এখন এসব মানে না। কিন্তু ভেবে দেখো মা জীবন তো শুধু প্রেমের কবিতা নয়।

বাবার বন্ধুর ছেলে সাব্বিরের সাথে তার তেমন কিছু কথাই হলো না। তবু কি এক দৈব দুর্ঘটনার মত সেই কি করে এসে কঙ্কনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল অবলীলায়, সেটা আজো কঙ্কনার কাছে প্রহেলিকার মত।

বাবা মিনতি করে কনাকে বললেন, সব জেনেশুনে আমার বন্ধু ও তার ছেলে তোকে আপন করে নিতে চাইছে, তুই ওদের ফিরিয়ে দিস না মা, আমি তোকে অনুনয় করে বলছি।
অসুস্থ বাবার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে কিনা কে জানে শেষপর্যন্ত কঙ্কনাকে রাজী হতে হলো বিয়েতে। রাত একটার সময় কাজী ডেকে এনে বাড়িতে বিয়ে পড়ানো হলো বাবার বন্ধুর প্রবাসী ছেলের সঙ্গে।

সুধীরের কথা কি করে তখন কঙ্কনা ভুলে গেলো? কিংবা ভুলিয়ে দিলো কোনো ঘোর অন্ধকার? মনে নেই আজ কিছুই।

বিয়ের দিন কয়েকের মধ্যে বাবার মৃত্যু, সাব্বির আর তার বাবার সাথে প্রবাসে চলে যাওয়া, নতুন করে জীবন শুরু। সুধীরকে শুধু অদ্ভুত একটা চিঠি লিখেছিল কঙ্কনা।
আমি তোমার দেয়া নামটা ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করতে পারলাম না সুধীর।তোমার ভগবানের হয়তো এটাই ইচ্ছে। ভালো থেকো।

সুধীর তখন অনেক দূরের কেউ, শুধু সঙ্গে রইলো কিছু স্মৃতি, কবিতার বই আর সিঁদুরের কৌটোর ভালোবাসা।
এতো বছরে কখনোই সেই সিঁদূর পরেনি, শুধু মাঝে মধ্যে সেটা বের করে মেলে ধরতো। চোখের সামনে খুলে যেতো স্মৃতির ঝাঁপি।
সাব্বির কখনো সুধীরকে নিয়েও কিছুই বলেনি। শুধু কবিতার বইটা নেড়েচেড়ে বলেছিল, আমি কিন্তু তোমাকে কঙ্কনা বলেই ডাকবো, আপত্তি নেই তো?  
কনা আর কি আপত্তি করবে, এ নাম যে তার অদৃষ্টের লিখন হয়ে সঙ্গে রয়ে গেছে।

সংসার বেড়েছে, এই চৌদ্দ বছরে বদলে গেছে জীবনের গতিধারা। দু’ছেলে নিয়ে প্রবাসে বেড়েছে কঙ্কনার জীবনের গল্প।

এতোকাল পরে কাল রাতে সে প্রথম স্বপ্নে দেখলো সুধীরকে। সুধীর তার কপালে সিঁদুর লাগিয়ে দিচ্ছে সেই বৃষ্টি দিনের মত। আঁচল মাথায় তুলতে গিয়ে হাতের চুড়ির শব্দ হতেই সুধীর টেনে নিয়েছে তাকে বুকের মধ্যে। সুধীরের সেই হৃৎস্পন্দনের শব্দটা সে যেন স্বপ্নের মধ্যেও শুনতে পেলো। এতো জীবন্ত নিঃশ্বাসের শব্দ, তারপর ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ এনে  তাকে জড়িয়ে ধরে সুধীর বলছে,
: কঙ্কনা, বহুদিন পর তোমাকে পেয়েছি, এভাবে আমাকে আর না বলে পালিয়ে যেও না।

তারপর, সকাল বেলা সিঁদুর কৌটোটা বের করতে গিয়ে দেখে উল্টে পড়ে আছে, সিঁদুরে মাখামাখি জামাকাপড় শাড়ি সব।

অনেকক্ষণ ফোনটা বাজছে, কঙ্কনা শুনতে পায়নি। ছোট ছেলেটা নিয়ে এলো,
: আম্মু , তোমার ফোন।
সাব্বির করেছে,
: কি করছিলে?
হতবিহ্বল কঙ্কনা জবাব দিল
: কই, কিছু না তো।
: শোনো, আজ একটু যত্ন করে পঞ্চব্যাঞ্জন রাঁধো। একেবারে বাঙ্গালী কায়দায় বুঝলে।
: কি ব্যাপার?  কাউকে দাওয়াত করলে?
: হুম, দেশ থেকে একজন এসেছেন। কবি, বুঝলে?  একেবারে সারপ্রাইজ দেবো তোমাকে।

কঙ্কনা জানে সারপ্রাইজ বললেও সাব্বির পেটে কোনো কথা রাখতে পারে না।
সে চুপ করে আছে দেখে সাব্বির নিজেই হাসতে হাসতে বললো, মানে, তোমার কবি এসেছেন।
: আমার কবি? সে আবার কি কথা?
: আরে চিনলে না তোমার কবি, মানে সুধীর কুমার সেন?
চমকে উঠলো কঙ্কনা
: কি?
: সুধীর বাবুর সাথে আজই আলাপ হলো, খুব মজার মানুষ। জানো, আমি কিন্তু তোমার কথা বলিনি উনাকে। বললাম, আমার স্ত্রী কবিতা খুব ভালোবাসে আপনি একবার বাড়িতে এলে খুশি হতাম। উনিও রাজী হয়ে গেলেন। রাতে নিয়ে আসছি, তুমি রান্নাটান্না করে নিও, ফোন ছাড়ছি।
: ঠিক আছে।
বলতে বলতে কঙ্কনা একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নিল খুব সংগোপনে।