ঢাকা, রবিবার ২১, জুলাই ২০১৯ ১৬:৫০:৫৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
অনির্দিষ্টকাল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা ঢাবি শিক্ষার্থীদের প্রিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশনা ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার নালিশ ‘ছোট্ট ঘটনা’: আইনমন্ত্রী প্রিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নেয়নি আদালত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কূটনীতি অনুসরণ করুন: প্রধানমন্ত্রী মিন্নিকে জামিন দেননি আদালত

বাংলাদেশে #মিটু আন্দোলন এবং সরল সমীকরণ

মুশফিকা লাইজু | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:১৫ এএম, ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ বুধবার

মেধাবী, বুদ্ধিজীবী এবং ইন্টেলেকচুয়াল হলেই কি তিনি বা তারা যৌনতা বহি:র্ভূত বা যৌনতা বর্জিত একজন মানুষ? নাকি তাদের যৌনাকাঙ্খা বৈদ্যুতিক সুইচ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত! তারা কি লিবিডো তাড়িত হন না? যৌনতা, যৌনাকাঙ্খা বা আবেগ (নষ্ট কিংবা ভাল) সবই একজন অতি সাধারণ পুরুষেরও যেমন, তেমনি একজন নাট্যকার, সাংবাদিক, প্রকাশক বা অতিথি শিক্ষকেরও হওয়ার কথা। তার প্রকাশের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন! বিজ্ঞান কি বলে? বিজ্ঞান বলে সমান কিন্তু প্রকাশের ভঙ্গি আলাদা। 


সম্প্রতি বাংলাদেশে শুরু হওয়া হ্যাসট্যাগ মিটু আন্দোলনে যতজন অভিযুক্ত হয়েছে তাদের প্রত্যেকেরই জান-কোরবান করে দেয়ার মত প্রচুর ফলোয়ার রয়েছে। থাকাটাই যে স্বাভাবিক। প্রতিভার বিচ্ছুরণে কদর্য ঐ মানুষটিই প্রত্যেকের পীর-মুর্শিদ হয়ে থাকেন। তাদের প্রচারে-প্রসারে মিডিয়াতো আছেই। 


যাই হোক প্রসঙ্গে আসি। যখনই যার সর্ম্পকেই অভিযোগ উঠেছে তখনই তাদের চ্যালা-চামুন্ডারা ‘রে রে’ করে উঠেছে। তাদের বয়ান- ১. অমুক একজন মহাজ্ঞানী। বাংলাদেশের ড্যাসে তার অনেক অবদান। সুতরাং তিনি এটা করতে পারেন না। ২. এত বছর ধরে তার সাথে সাথে তলপি টেনেছি, কই আমার দিক তো ফিরেও তাকাননি। ৩. মৃত্যুর পর সাত খুন মাফ। ৪. আমি তাকে ছোটবেলা থেকে চিনি, সুতরাং তার পক্ষে এমনটা করা সম্ভবই নয়। ৫. সে বারবার ক্লাশে প্রথম হত, সে এইসব করতে পারেনা। ৬. তাকে বাংলাদেশের সকলে চেনে, সে এমনটা করবে না। ৭. টেলিভিশন খুললেই তার গোঁফের গোড়ায় অনেক বুদ্ধি ঝুলতে দেখা যায়। ৮. প্রকাশনা জগতে তিনি দিগপাল, নিশ্চয়ই তিনি এমন কিছু করেননি। ৯. উনি খুব কম কথা বলেন। তার দ্বারা এমনটা হওয়া সম্ভব নয়। ১০. তিনি কবিতা চর্চা করেন। কবিতার সাথেই তার ঘরসংসার। তিনি কবিতাতে ঘুমান, কবিতাতেই জাগেন- ইত্যাদি ইত্যাদি। 


আর বেশি লিখলাম না, তা হলে দীর্ঘ বয়ান হয়ে যাবে। এখন কথা হল, যে বা যারা এ ধরনের স্তুুতি করে ফেসবুকের ওয়াল কর্দমাক্ত করে ফেলেছেন- তাদের বলি, এই সকল মহাজ্ঞানী মানুষেরা কি তাদের যৌনাঙ্গ তালাচাবি দিয়ে বদ্ধ করে রাখেন? তাদের কি আর দশটা সাধারণ মানুষের মত আবেগের তাড়নায় তাড়িত হন না? বাংলাদেশে অতি সম্প্রতি, বাস ড্রাইভার বা কন্ডাক্টরের বিরুদ্ধে যে ধর্ষণ  বা যৌন হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে কই তাদের পক্ষে তো কেউ সাফাই গাইতে আসেনি। কেউ তো বলেনি, বেচারা বাস ড্রাইভার গরীব, সরলসোজা, দিন আনে দিন খায় সে কেন ধর্ষণের মতো বড়লোকি কাজে জড়াবে? অথবা বেচারা সামান্য বাস কন্ডাক্টর, সে কেন শিক্ষিত সুশীল মেয়েদের যৌন হয়রানীর মত কাজ করবে! তবে ধরে নেয়া যায়, বাস কন্ডাক্টর বা ড্রাইভার, যদু বা মধু এদের কোনো লাগাম নেই। এরা যদি সুযোগ বা সময়ের অসৎব্যবহার করে তবে একজন নাট্যকার, সাংবাদিক, প্রকাশক, বাচিকশিল্পী কিংবা ডাকসাইটে বিজনেসম্যান কেন তা করতে পারেন না? কেন তাদের চামচা ফলোয়ারদের কাছে তা অবিশ্বাস্য লাগে! তবে কি তারা তাদের যৌনাঙ্গকে দুঃশাসন করে রাখে? নাকি তাদের মেধা-বুদ্ধি-প্রতিভা বাড়তে থাকে আর ক্রমান্বয়ে যৌনাকাঙ্খা খাটো বা স্তিমিত হতে থাকে? কেন এটা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে অবিশ্বাস্য লাগবে, কেন মনে হবে এই কাজ ঐ ফেরেস্তার মতো ব্যক্তিটি করতেই পারেন না! একজন ফলোয়ারের বা ফ্যানের বা পরিচিতজনের পক্ষে কতটা ভিতর থেকে জানা সম্ভব ঐ মানুষটিকে যার সর্ম্পকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কিছু না ভেবেই কি করে এক লহমায়, এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ ক্লিন এন্ড ক্লিয়ার ‘ধোয়া তুলসি পাতা’। আর অভিযোগকারিনী মিথ্যুক-ষড়যন্ত্রকারী ইতিহাসের ‘ঘষেটি বেগম’ বা ‘মায়মুনা কুটনি’? সত্যিই সেল্কুাস! আজ আপনাকে জাতির বড়ই প্রয়োজন, আপনিই ভেড়ারপালের কাছে নমস্য।

 

কারো কারো আবার বড়ই বেচালা প্রশ্ন, এতোদিন পরে কেন? তাদের জন্য উত্তর, একজন নিপীড়ক যেমন সময় ও সুযোগের সুবিধে গ্রহণ করে তেমনি একজন নিপীড়িতও বিশ্বময় চলমান এই মহৎ আন্দোলনের উঠানটা কাজে লাগিয়েছে। সকল নিপীড়িতরা ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই তার চারপাশের পরিজনদের বলেছে, কোন প্রতিকার তো হয়নি। তবে #মিটু আন্দোলনের দমকা হাওয়ায় আজ দুলে উঠেছে বিখ্যাত প্রাজ্ঞজনের শিল্প-সংস্কৃতির ‘সাদ্দাতের বেহেস্ত’, টলে উঠেছে প্রশংসার মসনদ। কেউ কেউ আবার খাটাশ-হৃদয়ে প্রশ্ন জুড়ে দিয়েছেন, সব বিখ্যাত লোকদের নামে কেন? সেই নাদান-অবুঝ-অবোধদের জন্য বলা, এজন্য যে এইসব বিখ্যাত-কুখ্যাত শিল্পীরা, ব্যক্তিত্বেরা মুখোশ পড়ে সাধারনের সামনে ঘুরে বেড়ায় আর ধূপধুনো-ফুলজল গ্রহণ করে বাকবাকুম করতে থাকে। তাই আম-জনতার বোঝা উচিৎ এরা আদতে কি ধরনের অমানুষ এবং এই মুখোশধারী জ্ঞানপাপীদের খপ্পরে পরে আর যেন কোন মেয়ের বিস্তৃর্ণজীবন বিবর্ণ না হয়। যেন তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে ঐসব বিখ্যাত জ্ঞানপাপীদের লালসা বরাবর লাথি মারার যথেষ্ঠ প্রস্তুতি নিজেদের মধ্যে রাখে।

 

শেষ জবাবটি না দিলেই নয়, যারা বলেছেন এদের সাথে নাম জড়িয়ে অভিযোগকারী মেয়েরা ফেমাস হতে চায়!! স্পষ্টতই বলতে চাই, কুকুর পুষে কেউ বিখ্যাত হয় না, নিজের পায়ে  কুড়াল মারার আগে ঠান্ড মাথায় কুড়ালটা যুতসই লক্ষ্য স্থির করে কুকুরের মুন্ডুতেই মারা উচিত। সেটুকু বোধ আমাদের আছে। অন্তত যে কুকুরেরা পাঁচতারা হোটেলে বসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে মানুষের বিষ্ঠা খায়। 


যদিও #মিটু আন্দোলনটি কোন বিশ্বাস বা বিচারিক মঞ্চ নয়, এটি বিশ্বময় যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে গণ সচেতনতা তৈরীর আন্দোলন। সাধারণেরা অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারেন তেমনি অবিশ্বাসও করতে পারেন, সেটা তাদের নিজেস্ব বিবেচনা। কিন্তু কাউকে মিথ্যুক আর কাউকে প্রফেট নির্বাচিত করতে পারেনা। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত যখন নিভৃতে এবং শুধুমাত্র দুজন ব্যক্তির মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিল এবং এই ধরণের সমাজ পরিবার নিষিদ্ধ দুস্কর্ম কেউই কোনো স্বাক্ষী রেখে করে না। সুতরাং তৃতীয় ব্যক্তি যতই ‘জানে জিগার’ হন না কেন, নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। অমুকের চরিত্র ফুলের মত পবিত্র নাকি এর অর্ন্তনির্হিত কারণ অন্য! আজ যদি একই পথের যাত্রী হয়ে অন্যের আন্ডারঅ্যায়ার আপনি না সামলান তবে আগামীকাল হয়তো আপনার আন্ডারঅ্যায়ারেও টান পরতে পারে। 


কথা হচ্ছিল, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সাথে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এ ধরনের পারর্ভাশন হ্যাবিট নাকি ডিজিজ (অভ্যাস নাকি রোগ)? তিনি জবাব দিয়েছিলেন দুটোই হতে পারে। হ্যাবিটকে সংযত না করলে সেটা একসময় ডিজিজে পরিনত হয়। কে বলতে পারে যে, এইসব অভিযুক্তরা পারর্ভাশন ডিজিজে ভুগছেন না! আর আমাদের যে সমাজ এ ধরনের হ্যাবিটকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে মুখবন্ধ রেখে রেখে একজন মানুষকে যৌনাকাঙ্খি রোগীতে পরিণত করেছে (কি নারী কি পুরুষ)।

 
উপসংহারে আসা যাক, পৃথিবী বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে নারীর অবস্থা এবং অবস্থান। তার ঢেউ এশিয়া ঘুরে এই বাংলাদেশেও লেগেছে। সেখানে ঠুনকো ফেনানো সামাজিক ইজ্জত সম্মানের উপর আর আজকের নারীরা দাঁড়িয়ে নেই। তারা লড়তে শিখে গেছে, লড়াই করে জেতার অভ্যাসও তাদের হয়ে গেছে। সুতরাং সমাজ পরিস্কারের জন্য আপনার কন্যা-ভগ্নি-প্রিয়তমার জন্য হলেও #মিটু আন্দোলনটা সমর্থন করুন। অহেতুক পুরুষতান্ত্রিক মানুষিকতা দিয়ে তাকে পুর্নবার বলৎকার করবেন না প্লিজ।

৥ মুশফিকা লাইজু : উন্নয়নকর্মী