ঢাকা, সোমবার ১৯, আগস্ট ২০১৯ ১৬:০০:৫৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
হাইকোর্টে আবারও মিন্নির জামিন আবেদন স্পিকারদের সম্মেলনে যাচ্ছেন শিরীন শারমিন বেনাপোলে আন্তর্জাতিক নারী হুন্ডি ব্যবসায়ী আটক বন্যার পরই উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করুন: প্রধানমন্ত্রী দেশে আনা হয়েছে কলকাতায় দুর্ঘটনায় নিহত ২ বাংলাদেশির লাশ ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় নিহত ২৫৩

বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি: যাঁতি ও উদূখোল

দীপঙ্কর পাড়ুই | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:০৯ পিএম, ২৫ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বা যন্ত্র বাংলার বাইরেও যে দেখতে পাওয়া যায় না, তা নয়। কিন্তু বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-চর্যার শিকড়ে এরা মিশে আছে ঘন হয়ে। তাই, এরা বাংলারই প্রযুক্তি। আজ থাকল এমন দুই যন্ত্রের কথা—যাঁতি আর উদূখোল।

যাঁতি

‘ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি ঘুমের বাড়ি যেয়ো।
বাটা ভরে পান দেব, গাল ভরে খেয়ো॥
শান-বাঁধানো ঘাট দেব, বেসম মেখে নেয়ো।
শীতলপাটি পেড়ে দেব, পড়ে ঘুম যেয়ো॥’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত ‘মেয়েলি ছড়া’র মধ্যেত ফুটে উঠেছে বাঙালির চিরকালীন আতিথেয়তার ছবি। বাঙালির আতিথেয়তার সঙ্গে পানের যোগ রয়েছে। বাড়িতে অতিথি এলে তাকে যত্ন করে পান সেজে দেওয়ার রেওয়াজ সেই কবেকার। আর পানের সাজার উপকরণের মধ্যে  গুয়া বা সুপুরি থাকেই। সুপুরি কাটার জন্য ব্যবহৃত হয় যাঁতি। এই যন্ত্রটি তৈরি হওয়ার পিছনে বাঙালির জীবনে সুপুরি বা গুয়ার জড়িয়ে থাকার ইতিহাস, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি অর্থনীতির সম্পর্কও মিশে আছে। নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করছেন- “বাংলাদেশের সর্বত্রই তো সুপারি-নারিকেল জন্মায়, তবু অধিক উল্লেখ পাই বঙ্গে বিক্রমপুর-ভাগে, সুন্দরবনের খড়িমন্ডলে, বঙ্গের নাব্য অর্থাৎ নিম্ন জলাভূমি অঞ্চলে, ঢাকা জেলার পদ্মাতীরবর্তী ভূমি অঞ্চলে।”

ছোটোবেলায় ভৌতবিজ্ঞানে একটা প্রশ্ন আসত-- যাঁতি কোন শ্রেণির লিভার? উত্তর লিখতাম সবাই- দ্বিতীয় শ্রেণির। ঠাম্মা হয়তো লিভার মানে বুঝতোই না। কিন্তু এই যন্ত্রটি দিয়ে ঠাম্মাকে সুপুরি কাটতে দেখেছি। কাজকে সহজ করার জন্য দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানারকম সরল যন্ত্র ব্যবহার করি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছি কি- এগুলো আদতে আমাদের মায়েদের প্রযুক্তি। বাংলায় এই যন্ত্র মহিলারাই ব্যবহার করেন। পান সাজার বাক্স, সামান্য চুন আর যাঁতি—এ যেন বাংলার অন্দরমহলের স্থায়ী দৃশ্যটি। সরল কারিগরির অসাধারণ নির্দশন এই যাঁতি।

‘বানা হাতে বাড়ে বাড়ে তোলে পানের খিলি
ওরে মোর সুন্দর বানা,
বানা তুই বোলে তোর দাদারে দুলালি
কই দেছে তোক ঘর সামটানী দাসী,
বানা হাতে বাড়ে বাড়ে তোলে পানের খিলি
ওরে মোর সুন্দর বানা।।’
(পানগীতি, রংপুর, গায়ে হলুদ- শাহীদা আখতার)

বাংলাদেশে বিয়েতে পানকে কেন্দ্র করে গান গাওয়ার চল আছে, যাকে পানগীতি বলে। গায়ে হলুদের সময় গাইতে হয় এই গান। বাঙালির দশবিধ সংস্কারের মধ্যে বিবাহ, অন্নপ্রাশন, সাধভক্ষণ, উপনয়ন ইত্যা্দি অনুষ্ঠানে পুজোর উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয় যাঁতি। যাঁতি প্রধানত দুটি আকারের হয়-- ছোটো ও বড়ো। ছোটোটি বিবাহে ছেলের হাতে থাকে। বিশেষ করে বিবাহযাত্রায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বড়োটি পান খাওয়ার জন্য সুপুরি কাটতে ব্যবহার করা হয়। এভাবেই যাঁতি জড়িয়ে আছে বাংলার লোকাচার-পার্বণের সঙ্গেও।

উদূখোল

উদূখোল একধরনের পেষণ যন্ত্র। উত্তর-পূর্ব ভারত তথা বাংলায় এই যন্ত্রটির অস্তিত্ব আছে। অভিধানে উল্লেখ রয়েছে, কাঠের তৈরি ডমরুর মতো দেখতে পাত্র, যাতে চিড়ে কোটা বা মশলা পেষাই করা হয়। কোথাও কোথাও একে উখল বা উখলি-ও বলাহয়। কাঠের যে দন্ডটি দিয়ে পেষাই করা হয় তাকে বলে গাইন। গাইন কথাটি এসেছে গাহিনী থেকে। বাংলায় মূলত রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকেরাই উদূখোল ব্যতবহার করেন বেশি। দ্রাবিড় ও মঙ্গোলিয়ান সংস্কৃতি থেকেই বাংলায় এসেছে এই পেষণযন্ত্রটি।

মালাবার উপকূলের প্রাচীন আদিবাসীদের মধ্যেও উদূখোলের ব্যবহার রয়েছে। কেরালার পুরোনো ফটোগ্ৰাফ খোঁজ করলেই তা ধরা পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতেও এই পেষণ যন্ত্রটির দেখা মেলে। ব্রহ্মদেশেও এর ব্যবহার আছে। হিমাচল, উত্তরাখন্ড, উত্তরপ্রদেশ, নেপাল, বিহার, আসাম, সিকিম, অরুণাচল হয়ে মিজোরাম পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। উদূখোল দ্রাবিড়দের ও মঙ্গোলিয়ানদের হাত ধরেই পৌঁছেছিল দক্ষিণে মালাবার উপকূলে। নীহাররঞ্জন রায় বলছেন- “বাঙালীর এইসব বৈশিষ্ট্যের যুক্তি খুঁজতে গিয়া বহুদিন আগে রিজলি সাহেব বলিয়াছেন, বাঙালীরা প্রধানত মোঙ্গোলীয় ও দ্রাবিড় নরগোষ্ঠীর সংমিশ্রনে উৎপন্ন।...রিজলি যাহাদের বলিয়াছেন দ্রাবিড়, সেই নরগোষ্ঠী তাঁহার মতে সিংহল হইতে গঙ্গার উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহারা কৃষ্ণবর্ণ, খর্বকায়, ইহাদের মুন্ডাকৃতি দীর্ঘ, নাসাকৃতি চ্যাপ্টা। রিজলি মনে করেন, এই দুই নরগোষ্ঠীর মিশ্রনে উৎপন্ন মোঙ্গল-দ্রাবিড় বিহার হইতে আরম্ভ করিয়া আসাম পর্যন্ত এবং উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর হইতে আরম্ভ করিয়া হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।”

বাংলার সংস্কৃতিতে এই পেষণ যন্ত্রটি অবশ্য মূলত মঙ্গোলিয়দেরই দান। উত্তরবঙ্গে উদূখোলের বিপুল ব্যবহার সে’কথাই প্রমাণ করে। আসামের মিসিং জনজাতির মহিলারাও দল বেঁধে উদূখোলে মশলা পেষাই করেন। এই মিসিং জাতির লোকেরা ধর্মীয়ভাবে হিন্দু।

উদূখোলকে বাংলার হামানদিস্তার বৃহৎ সংস্করণ বলা যায়। এক বা তার অধিক মহিলারা একসঙ্গে উদূখোলে শস্য পেষাই করেন। এর মধ্যে  চিড়ে কোটা, চালগুঁড়ো, লঙ্কার গুঁড়ো, জিড়ে-গুঁড়ো করা হয়। এছাড়া রাজবংশী লোকেরা শুঁটকি মাছের শিদল তৈরি করেন এই উদূখোলের সাহায্যেই। শুঁটকি মাছ আর কচুশাক কালো কচুর ডাটি সহযোগে তৈরি একটি খাবারের নাম ‘শিদল’। অনেকটা  শুঁটকি মাছের চাটনির মতো।

অতীতে ঘোষ বা গোয়ালা, মোদক সম্প্রদায়ের লোকেরা যে উদূখোল ব্যবহার করতেন তার প্রমাণ বড়ু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’। কৃষ্ণকে দুষ্টুমির জন্য তাঁর মা যশোদা নাকি উদূখোলে বেঁধে রেখেছিলেন। বর্তমানে বাংলার রাজবংশীদের সঙ্গে মোদক বা গোয়ালাদের কিছু যৌথতার সংস্কৃতি পাওয়া গেছে নদীয়ার জলঙ্গী নদীর তীরবর্তী জায়গাগুলিতে। মোদকদের মধ্যে রাজবংশীদের অনেক সংস্কৃতির ব্যবহার দেখা যায়। অতীতে কোথাও এদের সংযোগ ছিল, যার শেকড় আজও রয়ে গেছে। তার প্রমাণ কুলাই ব্রত বা কুমীর পুজো।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার, মালদা, আলিপুরদুয়ারে উদূখোল দেখা যায়। এখানকার মহিলারা এখনো উদূখোলে মশলা পেষাই করেন। উদূখোলও বাংলার গৃহিণীদের একটি নিজস্ব প্রযুক্তি।

তথ্যঋণ : নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস; ‘বাটা ঝিলমিল বাটা ঝিলমিল বন্ধু খাওরে বাটার প্রাণ’গানটির জন্য ঋণী সামরান হুদার কাছে।

ছবি সৌজন্যে : বন্ধু মৃণাল সিংহ, বন্দিজোত, হাসখোঁয়া।

(ভারতিয় পত্রিকা থেকে)