ঢাকা, বুধবার ১৩, নভেম্বর ২০১৯ ২২:৪৬:৩১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রোহিঙ্গা সমস্যার জন্য দায়ী জিয়া : প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে: প্রধানমন্ত্রী নিজেকে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট দাবি করলেন জেনাইন ৭ বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ট্রেন দুর্ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা

ভাই-বোনের ভালবাসার প্রতীক ‘ভাইফোঁটা’

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:২৮ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২০১৯ মঙ্গলবার

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ভাইফোঁটা হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি চিরন্তন সম্প্রীতির উৎসব। এই উৎসবের পোষাকি নাম 'ভ্রাতৃদ্বিতীয়া'। ভাই-বোনের ভালবাসার বন্ধন অনন্তকাল অটুট রাখার জন্য বংশপরম্পরায় এই বিশেষ উৎসব পালন করা হয়। ভাই-বোনের নিঃস্বার্থ ও স্বর্গীয় ভালবাসার প্রতীক এই ভাইফোঁটা আমাদের মনে শান্তি, সৌভাতৃত্ববোধ এবং ঐক্যের এক চমকপ্রদ আবেশ সৃষ্টি করে। কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে (কালীপূজার দুই দিন পরে) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

ভাইফোঁটার দিন-ক্ষণ : বাঙ্গালী হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, এই উৎসব কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় দিন (কালীপুজোর দুদিন পরে) উদযাপিত হয়। মাঝে মধ্যে এটি শুক্লপক্ষের প্রথম দিনেও উদযাপিত হয়ে থাকে।

ভাইফোঁটা যে যে নামে পরিচিত : পশ্চিম ভারতে এই উৎসব 'ভাইদুজ' নামেও পরিচিত। সেখানে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পাঁচ-দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের শেষদিন। আবার, মহারাষ্ট্র, গোয়া ও কর্ণাটকে ভাইফোঁটাকে বলে 'ভাইবিজ'। নেপালে ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে এই উৎসব পরিচিত 'ভাইটিকা' নামে। সেখানে বিজয়াদশমীর পর এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসবের আরও একটি নাম হল 'যমদ্বিতীয়া'।

ভাইফোঁটা সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদ : “ভ্রাতৃদ্বিতীয়া” বা “ভাইফোঁটা” উৎসব কেন করা হয় তার পিছনে অনেক পৌরাণিক ব্যাখ্যা বা কাহিনী রয়েছে।

কথিত আছে সূর্যদেব ও তার পত্নী সংজ্ঞার যমুনা নামে কন্যা এবং যম নামে পুত্র সন্তান ছিল। পুত্র ও কন্যা সন্তানের জন্মদানের পর সূর্যের উত্তাপ স্ত্রী সংজ্ঞার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের প্রতিলিপি ছায়াকে দেবলোকে রেখে মর্তে প্রত্যাবর্তন করেন। সংজ্ঞার প্রতিরূপ হওয়াই কেউ ছায়াকে চিনতে পারেনা। বিমাতা ছায়া কালক্রমে যমুনা ও যমের প্রতি দুঃব্যবহার করতে থাকেন কিন্তু ছায়ার মোহে অন্ধ সূর্যদেব কোন প্রতিবাদ না করায় অত্যাচারের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়তেই থাকে। এভবেই একদিন যমুনা তার বিমাতা কর্তৃক স্বর্গরাজ্য থেকে বিতারিত হয়। কালের নিয়ম মেনেই যমুনার বিবাহ হয় এক উচ্চ খানদানি পরিবারে। দীর্ঘকাল দিদিকে চোখের দেখাটাও যম দেখতে পায়নি তাই তার খুব মন খারাপ করছিল। তখন ঠিক করল যে করেই হোক দিদির সাথে দেখা করতেই হবে তাছাড়া মন শান্ত হবেনা। যম রাজদূত মার্ফত যমুনার নিকট বার্তা পাঠায়। ভায়ের আসার খবর পেয়ে যমনা যারপরনাই খুশি হয়। কালী পুজার দুদিন পরে অর্থাৎ ভাতৃদ্বিতীয়ার দিন যম যমুনার বাড়ি যাত্রা করে। দিদির বাড়ি পৌঁছে যম দিদির অতিথ্যে মুগ্ধ হয়। যম পৌঁছানোর আগেই যমুনা বিশাল খাবরের আয়োজন করেছিল। দিদি যমুনার আতিথ্য ও ব্যবহারে সুপ্রসন্ন যম যমুনাকে উপহার হিসেবে বরদান প্রার্থনা করতে বলে। দিদি যমুনা এমনই এক বর প্রার্থনা করেছিল যা একটা ভাই অন্তপ্রান দিদির চিরন্তন প্রার্থনা হওয়া উচিত। যমুনা বলেছিল "ভাতৃদ্বিতীয়ার দিন প্রত্যেক ভাই যেন তার বোনের কথা স্মরন করে আর প্রত্যেক বোন যেন তার ভায়ের মঙ্গলময় দীর্ঘ জীবন কামনা করে।" যম তার দিদি যমুনাকে তাই বর হিসেবে দান করে এবং পিতৃগৃহে ফিরে আসে। যমুনা তাঁর ভাই যমের মঙ্গল কামনায় আরাধনা করে যার পুণ্য প্রভাবে যম অমরত্ব লাভ করে। বোন যমুনার পুজার ফলে ভাই যমের এই অমরত্ব লাভের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বর্তমান কালের বোনেরাও এই সংস্কার বা ধর্মাচার পালন করে আসছে।

অপর একটি সূত্রে জানা যায় যে একদা প্রবল পরাক্রমশালী বলির হাতে বিষ্ণু পাতালে বন্দি হন। দেবতারা পড়েলেন মহা বিপদে, কারন কোন মতেই তাঁরা নারায়ণকে বলির কবল থেকে মুক্ত করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন স্বয়ং লক্ষ্মী। তিনি বলিকে ভাই হিসেবে স্বীকার করেন। সেই উপলক্ষে তাঁর কপালে তিলক এঁকে দেন। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তখন স্বীকার করে বলি লক্ষ্মীকে উপহার দিতে চাইলে লক্ষ্মী চেয়ে নেন ভগবান বিষ্ণুকে। সেই থেকেই ভাইফোঁটা উৎসবের সূচনা

অন্য মতে, নরকাসুর নামে এক দৈত্যকে বধ করার পর যখন কৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে আসেন, তখন সুভদ্রা তাঁর কপালে ফোঁটা দিয়ে তাঁকে মিষ্টি খেতে দেন। সেই থেকে ভাইফোঁটা উৎসবের প্রচলন হয়।

ক্রান্তিকালের ভাঁইফোটা ও রাখীবন্ধন : ভাইফোঁটার দিন ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সম্পর্ক আছে। ১৩১২ বঙ্গাব্দে বা ১৯০৫ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জনের আমলে বঙ্গভঙ্গ আইন পাস হলে তার প্রতিবাদ এবং সৌভ্রাতৃত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে ৩০ আশ্বিন দুই বঙ্গের লোকদের হাতে হলুদ সুতার রাখি পরিয়ে দেওয়া হয়, যা ‘রাখিবন্ধন’ উৎসব নামে পরিচিতি লাভ করে। এর মন্ত্র হলো: ‘ভাই ভাই এক ঠাঁই।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এতে নেতৃত্ব দেন। তিনি রাখি বন্ধনের প্রেরণা লাভ করেছিলেন উত্তর ভারত থেকে। সেখানে হিন্দু ও জৈনসমাজে শ্রাবণী পূর্ণিমায় সৌহার্দ্য বা ভ্রাতৃত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে পরস্পরের হাতে রঙিন সুতা বেঁধে দেওয়া হয়। সুতা বাঁধার সময় তারা বলত "যার দ্বারা মহাবলী দৈত্যরাজ বলিকে বাঁধা হয়েছিল, তার দ্বারা আমি তোমাকে বাঁধলাম" অর্থাৎ এ বন্ধন যেন কখনও ছিন্ন না হয়। বাংলার গৃহবধূদের রাখিবন্ধন আন্দোলনে সামিল করার উদ্দেশ্যে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী 'বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা' নামক পুস্তক রচনা করেছিলেন।

ভাইফোঁটা উদযাপন : পৌরাণিক ব্যাখ্যা বা কাহিনি যাই থাকুক না কেন, বর্তমানে ভাইফোঁটা একটি সামাজিক উৎসব। এই উৎসবে এক দিকে যেমন পারিবারিক সম্পর্কগুলো আরও পোক্ত হয়, অন্য দিকে সূচিত হয় নারীদের সামাজিক সম্মান। তাই, ভাইফোঁটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপেক্ষা সামাজিক ও পারিবারিক গুরুত্ব অনেক বেশী, যেখানে ভাই-বোনের মধ্যেকার প্রীতি ও ভালোবাসার স্বর্গীয় সম্পর্কটিই মূখ্য।

ভাইফোঁটার দিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে ছড়া কেটে বলে-

“ ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা,
যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা,
আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা॥
যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে
যম হল অমর।
আমার হাতে ফোঁটা খেয়ে
আমার ভাই হোক অমর॥”

এইভাবে বোনেরা ভাইয়ের দীর্ঘজীবন কামনা করে। তারপর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ায়। ভাইও বোনকে কিছু উপহার বা টাকা দেয়।

অনেক সময় এই ছড়াটি বিভিন্ন পরিবারের রীতিনীতিভেদে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। অতঃপর, বোন তার ভাইএর মাথায় ধান এবং দুর্বা ঘাসের শীষ রাখে। এই সময় শঙ্খ্যবাজানো হয় এবং হিন্দু নারীরা উলুধ্বনি করেন। এরপর বোন তার ভাইকে আশীর্বাদ করে থাকে (যদি বোন তার ভাইয়ের তুলনায় বড় হয় অন্যথায় বোন ভাইকে প্রণাম করে আর ভাই বোনকে আশীর্বাদ করে থাকে)। তারপর বোন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দ্বারা ভাইকে মিষ্টিমুখ করায় এবং উপহার দিয়ে থাকে। ভাইও তার সাধ্যমত উক্ত বোনকে উপহার দিয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। পশ্চিম ভারতের ভাইবিজ একটি বর্ণময় অনুষ্ঠান। সেখানে এই উপলক্ষ্যে পারিবারিক সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়। মহারাষ্ট্রে মেয়েদের ভাইবিজ পালন অবশ্যকর্তব্য। এমনকি, যেসব মেয়েদের ভাই নেই, তাঁদেরও চন্দ্র দেবতাকে ভাই মনে করে ভাইবিজ পালন করতে হয়। এই রাজ্যে বাসুন্দি পুরী বা শ্রীখণ্ড পুরী নামে একটি বিশেষ খাবার ভাইবিজ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করার রেওয়াজ আছে।

ভাইফোঁটার সামাজিক গুরুত্ব : আমরা সামাজিক জীব। আমাদের সমাজ তৈরী হয় প্রথমে ঘর থেকে। মা-বাবা, ভাই-বোন দিয়ে যে পরিবার শুরু হয়, সেই পরিবারটিই সময়ের সাথে সাথে আত্মীয়তার বন্ধন বিস্তৃত করে, ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশী, প্রতিবেশী পেরিয়ে পাড়া, গ্রাম ছাড়িয়ে একদিন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। আজ বাংলার যে নানা লোকাচার রয়েছে, যা দিয়ে বাঙালির সংস্কৃতির সতন্ত্রতাকে চিহ্নিত করা যায়, তারই অনিবার্য রূপ ভাইফোঁটা।

উপসংহার : ভাঁইফোটা শুধু ভাই-বোনের ভালবাসার বন্ধনকেই দৃঢ় করেনা, সহোদরদের মিলনক্ষেত্রের ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করে। প্রেম, মৈত্রী ও ঐক্যের এক অপূর্ব মিশেল গড়ে তোলে।

“ভাইফোঁটা” উপলক্ষে সকল ভাই-বোনদের প্রতি রইলো শুভকামনা। ভাইফোঁটা হোক সম্প্রীতির উৎসব৷ জীবন ভরে উঠুক আনন্দ ও খুশির জোয়ারে।