ঢাকা, শনিবার ১৫, আগস্ট ২০২০ ১৩:৫৬:৩৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মুর্তজা বশীরের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর আর নেই আজ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস শেখ কামালের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবে আবাহনী

মানুষ মানুষের জন্য : বিউটি হাসু

বিউটি হাসু | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৫১ পিএম, ৪ মে ২০২০ সোমবার

বিউটি হাসু

বিউটি হাসু

প্রতিদিন টিভি পর্দায় দেখায়-এ সময় প্রোটিন জাতীয় খাবার মাছ, মাংস, দুধ, ডিম বেশি করে খাবেন। এছাড়া শাক-সবজি, ফল-মূল ও ভিটামিন সি’ জাতীয় খাবার খাবেন। এসব খাবার আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। করোনাকে প্রতিহত করতে এই দুর্যোগকালে আমাদের এসব ভিটামিন সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া জরুরি। এসব মূল্যবান কথা যতবার শুনি ততবার ভাবনার অতলে ডুবে যাই।
যারা উচ্চবিত্ত তাদের এসব খাবার খাওয়ার সামর্থ্য আছে, মধ্যবিত্তরা চাইলে কম-বেশি খেতে পারেন। তারপরও এই লকডাউনে সামর্থ্য থাকলেও বাজার করে খাওয়াই এখন ঝুঁকিপূর্ণ।ফ্রিজে রেখে কতদিন আর খাওয়া যায়। যাহোক, আলোচনার বিষয় এটা নয়। কিন্তু যারা নিম্নবিত্ত, সারাদিনে যাদের পেটে জুটছে না- আলুসিদ্ধ দিয়ে একমুঠো ভাত। আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ, তারা না পারছে কারো কাছে হাত পাততে, না পারছে অভাবের সাথে পেরে উঠতে।ভিটামিন দূরে থাক, করোনা নিপাত যাক; তারা ক্ষুধার সাথে কিভাবে লড়ছে? কিভাবে লড়বে? এই চিন্তাই মনটাকে বিষন্নতায় আচ্ছন্ন করে।
প্রতিরাতে ভাবি, উচ্চবিত্তদের প্রত্যেকের আলাদা শোবার ঘর থাকেই। আমাদের মধ্যবিত্তদেরও সবার জন্য আলাদা করে একটা শোয়ার ঘর আছে।কিন্তু নিম্নবিত্তদের অবস্থা? পরিবারের ২ জন থেকে শুরু করে ৫/৭ জনের জন্যও যাদের একটিমাত্র ঘর, একই বিছানা। ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ ও ‘আইসোলেশন’ –এ দুটি শব্দের কি অর্থ তারা সত্যিই কি বোঝেন? তাদের জীবনে এ শব্দ দুটি আদৌ কি কোন মানে রাখে? এক ঘরে, এক বিছানায় যারা ঠাসাঠাসি করে পাঁচ/সাতজন ঘুমায়। তাদের জন্য লকডাউন কি, আর উন্মুক্ত আকাশই কি! ঘর-বাহির দুটোই তাদের জন্য সমান। তাদের মধ্যে যদি একজন করোনায় আক্রান্ত হয়, তাহলে পরিবারের কারোই রেহাই নেই। এ ভাবনাটাই অহর্নিশ অস্থির করে তোলে।
তবে হ্যা, নিম্নআয়ের মানুষ ঘরে থাকলেই আমাদের রক্ষা। তাদের পরিবার আক্রান্ত হলেও অন্য পরিবারকে তাদের থেকে আক্রান্ত হওয়া রোধ করা সম্ভব। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়ানো বা সামাল দেয়া সম্ভব।কিন্তু পোশাক শিল্প, হোটেল-রেস্তোরা, শপিংমল খুলে দিয়ে এমন প্রহসনমূলক লকডাউন রাখলে চরম মূল্য দিতে হবে। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। এজন্য ঘরে থাকা এবং সবাইকে ঘরে রাখা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাই যেকোনভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে নিম্নবিত্তদের ঘরে থাকাটা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন সরকার নির্বিঘ্ন সহায়তা নিশ্চিত করতে পারবে। চুরি বন্ধ, দুর্নীতি প্রতিহত করে ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারবে। সেই সাথে আমাদের প্রত্যেকেই নিজেদের অবস্থান থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
ক্ষুধার্তদের আর্তনাদ শুনে শুধু নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিলে হবে না।মানবিক মানুষ যাদের মন অন্যের ব্যথায় কাঁদে। গরীবের দু:খ, কষ্ট দেখে নির্জনে চোখ ভেজে তাদের সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। এই সমস্যা একা বা কয়েকজনের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না।অসহায় দরিদ্রের সাহায্যে সম্মিলিতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সহমর্মী মনের তীব্র ইচ্ছেশক্তি!   
করোনার এ দু:সময়ে দুজন ব্যক্তি নিজেদের নি:স্ব করে দান করেছেন এবং উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তাদের জানাই অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা!
শারীরিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক রেজাউল (৪০) কয়েক মাসের জমানো ১২ হাজার টাকা দিয়েই প্রতিবেশীদের সাহায্য করেন। তিনি ৬০ জন অনাহারী, অর্ধাহারী প্রতিবেশীর প্রত্যেককে ৪ কেজি চাল, ১ কেজি ও একটি সাবান দেন।
অপরদিকে, হত দরিদ্র ভিক্ষুক মোহম্মদ নাজিম উদ্দিন (৮০) থাকেন ভেন্নাপাতার ছাওয়া ঘরে। একটু বৃষ্টি হলেই যে ঘরে গড়িয়ে পড়ে পানি। সেই ঘর ঠিক করার জন্য দুই বছর ধরে ৫-১০টাকা জমা করে তিনি ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেন। দেশে করোনা সংক্রমণের দুঃসময়ে গরীব মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘবে তিনি সেই টাকা করোনা ত্রাণ তহবিলে দান করেন। মানবিক দুই ভিক্ষুক নিজেদের সবটুকু সম্বল দিয়ে প্রমাণ করেন- “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”।
তাদের মানবিকবোধ, মানুষের জন্য স্বার্থশূন্য ভালোবাসা মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিজেকে নিঃস্ব করে তাদের এই দান আমাদের জন্য, বিশেষ করে বিত্তবানদের জন্য এক অনন্য শিক্ষা।
আর্থিকভাবে দরিদ্র, মানসিকভাবে ঐশ্বর্যবান সেই দুই ফকিরের মতো আমরা নিজেদের ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙ্গে জমানো অর্থ মানবসেবায় দান করে, পুরো সঞ্চয় বিলিয়ে দিয়ে মহান হতে পারব না। আল্লাহ আমাদের এতো বিশাল কলিজা দিয়ে দুনিয়াতে পাঠায়নি, তা করার দরকারও নেই।আমরা সক্ষমরা নিজেদের সকল চাহিদা পূরণ করেও অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে পারি। শুধু প্রয়োজন সৎ ইচ্ছে শক্তি।
আমরা যারা দামি ভালো মানের ব্র্যান্ডের ফাউন্ডেশন মুখে এবং দামি ব্র্যান্ডের লিপস্টিক ঠোঁটে মাখি। সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রয়াসে প্রতিমাসে দুই/একবার বিউটি পার্লারে উকিঁ না দিলেই চলে না। আমরা বাহ্যিক রূপ বাড়াতে পার্লারে ছুটোছুটি করি, ফিটনেস ধরে রাখতে জিমে দৌড়াই। করোনার এই লকডাউনে সেসব কাজ বন্ধ আছে। তার মানে একমাসে সাজগোজ আর পার্লারে যে খরচ হতো সেই টাকাগুলো বেঁচে গেছে। পরিমাণ যাই হোক, এই লকডাউনের মাসে এই বাঁচানো টাকাই আমরা অসহায়, গরীব, দু:খীদের হাতে দিয়ে সাহায্য করতে পারি।
রুপ-লাবণ্য, বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়াতে যতই ঘষামাজা করি, যতই জিমে দৌড়াই রূপ, যৌবন এসব ক্ষণস্থায়ী; গাছের পাতার মতো, সময়ে বিবর্ণ হয়ে যাবেই। কিন্তু মানুষের জন্য নিখাদ ভালোবাসা, মানবিকবোধ, কর্তব্য, বিশ্বাস-এগুলো হচ্ছে শিকড়; তাই এরা চিরসবুজ।
আমাদের সৌন্দর্য পিপাসা, শখ ও আধুনিক সভ্যতা আমাদের কৃত্রিম হতে শিখিয়েছে। তবে গোসলের পরে স্নো-ক্রীম-পাউডার  ছাড়া, অকৃত্রিম নির্মল, সতেজ, পরিষ্কার-বিশুদ্ধ যে আমিটা; সেইটাই আসল আমি। সেই সত্যিকার আমিকেই ভালোবাসি। করোনামুক্ত হলে আমরা আবার লিপস্টিক মাখব। দুর্দিন কেটে গেলে নাহয় আমরা আবার কৃত্রিম সাজের উৎসবে মাতবো। রূপের যত্ন তো আমরা অনেক নিয়েছি। এবার মনের যত্ন নেই, এই দুঃসময়ে মানবিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টা করি।
আর যারা ঠোঁট পুড়িয়ে সুখটানে ‘সুখ’ খোঁজেন। হৃদপিণ্ডটা দূর্বল, নাজুক করে দেয়ার অপচেষ্টায় সারাদিনে এক প্যাকেট বেনসন বা গোল্ডলিফ সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে উড়িয়ে, পরিবেশ দূষিত করে পরম তৃপ্তি পান। তারা হৃদয়টা কমজোর না করে সুস্থ রাখুন, অন্তত সিগারেটের টাকা বাঁচিয়ে নিজে ভাল থাকুন, অসহায়ের সহায় হোন। বিনীত অনুরোধ, সারা মাসের সিগারেটের খরচের টাকাটা গরীবদের হাতে তুলে দিয়ে জাতিকে উদ্ধার করেন।
আর যারা পিয়ালায় চুমুক দিয়ে দামি শ্যামপেন পানে শান্তি খোঁজেন তারা জানেন না, বোতলে কোন সুখ নেই, শান্তি নেই। ভাল কাজ করে অসহায় মানুষের পাশে থেকেই প্রকৃত সুখ নিতে পারেন। এতে হৃদপিণ্ডটাও বলিষ্ঠ, সবল থাকেবে। কবি কামিনী রায়ের ভাষায়- ‘পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও,/তার মত সুখ কোথাও কি আছে?/আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
সন্তানের জন্মদিনে দশ বিশ হাজার টাকা ব্যয় না করে ছোট করে ঘরোয়াভাবে করা যায়। সেখান থেকে টাকা বাঁচিয়ে গরীবদের অনায়াসে সাহায্য করতে পারেন। ঈদে যাদের ৫টা জামা, ৫টা শাড়ি, পাঞ্জাবি-শার্ট-টি-শার্ট মিলে ৫/৭টা না কিনলে ঈদ সফল বা জায়েজ হয় না, সেখানে তারা পোশাকের সংখ্যা কমিয়ে অসহায়দের সাহায্য করতে পারেন। আর যারা লাখ টাকার ঈদ বাজার করেন, তারা যদি একটু মানবিক হতেন তাহলে কোন শিশুকে খালি গায়ে, খালি পেটে ছেঁড়া কাপড় পড়ে ঈদ করতে হতো না। মুসলমান বিত্তবানরা যদি ঠিকমতো যাকাত আদায় করতো তাহলে ধনী-দরিদ্রের এই ব্যবধানের বিশালতা সৃষ্টি হতো না। দুর্নীতিবাজরা অর্থের পাহাড় গড়ে গরীবের অধিকার কেড়ে নেয়। নদীতে ফেলে, সিন্দুক বন্দী টাকা পোকা-মাকড় দিয়ে খাওয়াবে, তবু মানুষের উপকার করবে না। এসব মানুষরূপী পশুদের কাছে তো কোন প্রত্যাশাই নেই। যাদের মনুষত্ববোধ এখনো মরে যায়নি, অন্যের ব্যথায় মন কাঁদে, গরীবের দু:খ-কষ্ট দেখে নির্জনে চোখ ভেজে, তারা এই কাজগুলো করতে পারি।
বৈশ্বিক সমস্যা করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসার বিকল্প নেই। অর্থ, বিত্ত-প্রতিপত্তি কিছুই সঙ্গে যাবে না, শুধু সাথে যাবে কর্মফল। তাই যাদের সামর্থ্য আছে, তারা সময় থাকতেই মানুষের জন্য কিছু করি, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। আমরা আরো বেশি মানবিক হই। অসহায়দের ফেলে নিজে একা নয়, তাদের পাশে হাঁটি। সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁচি। বেঁচে থাক পৃথিবী, বেঁচে থাক মানুষ। মানবতার জয় হোক।

বিউটি হাসু: লেখক ও সাংবাদিক