ঢাকা, রবিবার ২১, জুলাই ২০১৯ ১৭:০২:০০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
অনির্দিষ্টকাল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা ঢাবি শিক্ষার্থীদের প্রিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশনা ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার নালিশ ‘ছোট্ট ঘটনা’: আইনমন্ত্রী প্রিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নেয়নি আদালত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কূটনীতি অনুসরণ করুন: প্রধানমন্ত্রী মিন্নিকে জামিন দেননি আদালত

সমুদ্র ও সাত মানবী

শান্তা মারিয়া | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:০৯ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার

উপন্যাস : সমুদ্র ও সাত মানবী-শান্তা মারিয়া

উপন্যাস : সমুদ্র ও সাত মানবী-শান্তা মারিয়া

ফিচারটা কীভাবে শুরু করা যায় সেকথাই ভাবছিল কঙ্কনা। সাংবাদিক হিসেবে তার মোটামুটি খ্যাতি আছে। তার লেখা ফিচার পত্রিকা ও অনলাইনের পাঠকরা আগ্রহ নিয়ে পড়ে। সমুদ্র দিয়েই না হয় শুরু করা যাক, যদিও এসে অবধি সমুদ্রের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। কেবল শোনা গেছে তার কণ্ঠস্বর। ওরা কক্সবাজার এসে পৌঁছেছে রাতে। জার্নিটা ছিল বেশ ক্লান্তিকর। ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম। সেখান থেকে মাইক্রোতে কক্সবাজারের এই বিলাসী হোটেল। একটা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। এক কথায় এনজিওর প্রকল্প। আগে যার নাম ছিল সমাজসেবা। একসময় সমাজসেবা করা হতো হৃদয়ের প্রেরণা থেকে। এখন তা জীবিকার অনেক বড় মাধ্যম। শুধু উন্নয়ন প্রকল্প চালালেই চলবে না। গণমাধ্যমে সে খবর যদি প্রচার করা না যায় তাহলে সবই মাটি। এজন্যই সাংবাদিকদের এত তোয়াজ করা হয়। সেই উদ্যেশ্যেই এই ট্যুর। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাটির মা-শিশু প্রকল্প রয়েছে এ অঞ্চলে। দেশের বিভিন্ন বড় পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা আগেই এ প্রকল্প ঘুরে গেছেন বেশ কয়েকবার। সংস্থার আপ্যায়নে তৃপ্ত হয়ে অনেকেই প্রশংসাসূচক রিপোর্ট করেছেন। তবে সেইসব সাংবাদিকের অধিকাংশই ছিলেন পুরুষ। এবারের ট্যুরটা একটু ব্যতিক্রমী। এবার বিভিন্ন নামজাদা মিডিয়ার নারী সাংবাদিকরা এসেছেন।

সাতজন নারীকে নিয়ে মহাব্যস্ত এই সংস্থার পিআরও আলফাজ শাহেদ। ঢাকা থেকে এদের সঙ্গে এসেছেন তিনি। ট্রেনে সর্বক্ষণ সঙ্গিনীদের সুখ-সুবিধা দেখতে তটস্থ ছিলেন। বাজীগরের ঝোলার মতো তার ব্যাগ থেকে ক্ষণে ক্ষণে বেরিয়েছে সফট ড্রিংকসের ক্যান, চিপসের প্যাকেট, চকলেট।  দেখে মনে হয়েছে সৃষ্টিকর্তা তাকে বিনয় বিগলিত হাসিসহই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং তার জীবনের পরম লক্ষ্যই হলো এই সাংবাদিকদের সন্তুষ্টি অর্জন। মাঝে মাঝে অবশ্য মোবাইলে তার কণ্ঠস্বর বিরক্তি ও ক্লান্তিতে ঝাঁঝিয়ে উঠেছে। ‘স্টুপিডের মতো কথা বলো না’, ‘এখন ভীষণ ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলবো’ জাতীয় সংলাপ শুনে বোঝা যাচ্ছিল তিনি স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন।

ট্রেনে উঠে প্রথমদিকে সবাই কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সবাই সবার পূর্বপরিচিত হওয়াতে ভালোও লাগছিল বেশ। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ক্লান্তির ছাপ পড়ছিল সকলের চেহারাতেই। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার আসার পথে মাইক্রোতে সকলের মনও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। এরই ফাঁকে ফাঁকে কঙ্কনা তার হাতব্যাগের ছোট্ট আয়নায় দেখে নিচ্ছিল নিজের চেহারা। ফেস পাউডার আর লিপস্টিকের সাহায্যে বিধ্বস্ত মুখকে মেরামত করার চেষ্টাও চালাচ্ছিল সে। রাতে কক্সবাজারের হোটেলে পৌঁছানোর পর রুম, রুমের চাবি, লাগেজ, ডিনার, প্রকল্পের উচ্চস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সাংবাদিকদের অভ্যর্থনা করতে বিশেষভাবে উপস্থিত বিদেশি ভদ্রজনদের সঙ্গে আলাপচারিতার মনে হচ্ছিল যেন শেষ নেই। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে এগারোটায় নিজের রুমে ঢুকতে পেরে ওর মনে হলো ওম শান্তি। রাত পোশাক পরে একটু সুস্থির হওয়ার পর মনে পড়লো সমুদ্রের কথা।

প্রশস্ত লাক্সারি রুম। সঙ্গে ব্যালকনি। এসি বন্ধ করে ব্যালকনির স্লাইডিং ডোর খুলে দিতেই ভেসে এলো সমুদ্রের দরাজ কণ্ঠস্বর আর এক ঝলক ভেজা হাওয়া। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু শোনা যায় তার উদাত্ত আহ্বান। ফসফরাসের স্নিগ্ধ আলো ঘোষণা করছে তার অস্তিত্ব। ব্যালকনিতে পাতা চেয়ারে একটুক্ষণ চুপ করে বসে রইল কঙ্কনা।

অন্ধকার ব্যালকনিতে কঙ্কনার মতোই চুপ করে বসেছিলেন কামরুননাহার জলি। টিম লিডার হয়ে এসেছেন। নারী সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের প্রধান তিনি। সাংবাদিকদের মধ্যে নারী-পুরুষ আবার আলাদা নাকি? এ প্রশ্নটি বহুবার শুনতে হয়েছে জলিকে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নিজেও নিজেকে শুধু সাংবাদিক বলেই ভাবতেন। শুধু নারী-পুরুষের বৈষম্যহীনতা নয়, ধনী-গরীবের বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন তখনও তার দুচোখ ঘিরে ছিল। ষাট দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে জলি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী। স্বাধীনতা যুদ্ধে হাতিয়ার ধরেছেন শক্ত হাতে। স্বাধীনতার পর সাংবাদিকতা শুরু করেন প্রগতিশীল দৈনিকে। সে সময় গভীর রাত পর্যন্ত নিউজ ডেস্কে কাজ করতে করতে ভাবতেন কে বলে মেয়েরা পিছিয়ে আছে। সাহস করে না এগোলে নতুন সমাজ গড়বো কীভাবে। ধীরে ধীরে সেই দৃপ্ত প্রত্যয় কখন যে শিথিল হয়ে গেছে তা তিনি নিজেও বোঝেননি। একটু একটু করে ফিকে হয়ে গেছে পতাকার রং যেমন বিন্দু বিন্দু ঝরে গেছে মাহমুদের ভালোবাসা।

সেলিম মাহমুদ-জলির স্বামী। ষাট দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ সহপাঠী সেলিম যখন তার সঙ্গে তর্কে মেতে উঠতো তখন চেতনা ও আদর্শে তারা ছিলেন সমগোত্রীয়। সহপাঠী, সহযোদ্ধা, সহকর্মী। যখন রেজিস্ট্রি বিয়ের পথ ধরে এক হয়েছে দুজনের জীবন তখনও মাহমুদ সহধর্মী ছিলেন, স্বামী হয়ে ওঠেননি। তারপর বামপন্থী সেলিম ক্রমশ সুবিধাপন্থী হয়েছেন, শ্রেণিশত্রু বুর্জোয়া পত্রিকামালিকের একান্ত কাছের জনে পরিণত হয়েছেন আর দূরে সরে গেছেন জলির কাছ থেকে। অবশ্য এখনও তারা একই অ্যাপার্টমেন্টে বাস করেন, একই সঙ্গে হাসিমুখে বন্ধুবান্ধবের পার্টিতে যান। কিন্তু জলির দাম্পত্য ক্রমশ নিঃসঙ্গই হয়ে উঠেছে।

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে শুধু নারী হওয়ার জন্যই পিছিয়ে থাকা জলি একসময় বুঝেছেন সাংবাদিকতাই হোক আর অন্য পেশাই হোক নারীদের নিজস্ব সংগঠন প্রয়োজন। হ্যাঁ বিভিন্ন সাংগঠনিক মিটিংয়ে একথা তিনি জোর গলায় বলেছেন। তিনবছর ধরে এই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট থাকার পর গভীর গোপনে অন্য ধরনের আত্মতৃপ্তিও বোধ করেছেন তিনি। এখন আর তিনি শুধু সাংবাদিক বা নারীসাংবাদিক নন, একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট। লোকে তাকে বিভিন্ন সভায় ডাকে, বক্তব্য রাখতে অনুরোধ জানায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠনের কার্ডে তার নাম ছাপা হয়। সেই কবে মাহমুদ তার প্রেমে পড়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নিজেকে আর কখনও এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। মেয়েরা মনে করে সংগঠনই বুঝি জলিআপার ধ্যান, জ্ঞান। কিন্তু অন্ধকার সমুদ্রের শব্দে সংগঠন নয়, জলির কেবলই মনে পড়ছিল মাহমুদের কথা। আজকের প্রৌঢ় স্বামী মাহমুদ নয়। অনেক বছর আগে কক্সবাজার বেড়াতে নিয়ে আসা তরুণ মাহমুদ। বন্ধুর গাড়ি ধার করে যে লংড্রাইভে নিয়ে এসেছিল তাকে। সস্তার একটা হোটেলে উঠেছিলেন সেবার। স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিল তবু আজকের মতো নিঃসঙ্গ ছিল না সে রাত্রি।

নতুন জায়গায় কখনও ভালো ঘুম হয় না কঙ্কনার । সূর্য  ওঠার কিছুক্ষণ আগেই ভেঙে যাওয়া ঘুম আর জোড়া লাগেনি। ব্যালকনির স্লাইডিং ডোরটা সরিয়ে বিছানা থেকেই শুয়ে শুয়ে দেখছিল আকাশের ও সমুদ্রের রং বদল। ঠিক যেভাবে বদলে যায় জীবনের রং। আকাশে মেঘের গাঢ় ছায়া, বৃষ্টি ঝরছে ধূসর সমুদ্রের বুকে। দিগন্তজোড়া সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। এই হোটেলটা একদম সমুদ্রের ধারে। হয়তো একসময় এ জায়গাটা ছিল ঝাউবন। এখনও দুচারটে ঝাউগাছ রয়ে গেছে। একটা তো  একেবারে ব্যালকনির সামনেই। তীব্র হাওয়ায় মাথা ঝাঁকাচ্ছে গাছটা। এত ভোরে বৃষ্টি আর ঢেউয়ের দাপট তুচ্ছ করে দূর বিন্দুর মতো চোখে পড়ে দু একটি নৌকা। এগুলোই কি জেলে নৌকা? সমুদ্রের তীর শুনশান। কঙ্কনার ইচ্ছা ছিল ভোরবেলা সিবিচে বেড়িয়ে আসবে। কিন্তু এই বৃষ্টিতে তা সম্ভব নয়। বৃষ্টি যদি এরকম থাকে তাহলে আজ রামু যাওয়ার প্রোগ্রামও ঠিক রাখা যাবে কিনা কে জানে।

চলবে........