ঢাকা, বুধবার ২৭, মার্চ ২০১৯ ২:৫১:৫৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
শিরোনাম
স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত শিশুদের সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে হবে: প্রধানমন্ত্রী অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার: জরুরি বৈঠক ডেকেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী নানা আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতা দিবস শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আজ

হ্যাটট্রিক জয় আওয়ামী লীগের

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:২২ এএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সোমবার

রাজধানীর সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশে বোন শেখ রেহানা ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

রাজধানীর সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশে বোন শেখ রেহানা ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

রেকর্ড গড়ল আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতিহাস গড়ে জয় হলো নৌকার। টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে আগামী ৫ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্বগ্রহণ করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। এ জয় দলটির হ্যাট্রিক বিজয়। শেখ হাসিনাও চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে কোনো দল এর আগে এত বড় বিজয় পায়নি।

আজ সোমবার ভোরে (৪.১০ মিনিটে) নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গণমাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি ঘোষনা দেন। ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২৫৯টি আসনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ।

এছাড়া এরশাদের জাতীয় পার্টি পেয়েছে ২০টি আসন। বিএনপি পেয়েছে ৫টি আসন। অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র ৩টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি, জাসদ ২টি, বিকল্পধারা ২টি, গণফোরাম ২টি, তরিকত ফেডারেশন ও জেপি পেয়েছে ১টি করে আসন। নির্বাচনের আগে গাইবান্ধা-৩ আসনের এক প্রার্থী নিহত হওয়ার পর ওই আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬০ আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছিল ৮৩ আসন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের নির্বাচনে বিএনপি ২০৭ আসন পায়। আওয়ামী লীগ পায় ৫৪ আসন। সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১৬ আসনে জয়ী হয়। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৬২ আসন। ২০০৮ সালে মহাজোট ২৬৩ এবং চারদলীয় জোট ৩৩ আসন পায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ দল অংশগ্রহণ করেনি।

গতকাল রোববার বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা ছাড়া সারা দেশে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি ভোটগ্রহণ হয়। ভোট চলার সময়ে অন্তত ৬৯ প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। সংঘাতে প্রাণ গেছে অন্তত ১৯ জনের। এর অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। গতকাল থেকে ইন্টারসেবা বন্ধ থাকলেও ভোটের থ্রি জি ও ফোর জি সেবা চালু হয়।

সন্ধ্যায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচটি ইমাম বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচন সম্ভব, তা প্রমাণ হয়েছে এবারের নির্বাচনে।
রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ফল প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। এ জন্য নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানান তিনি।

এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। ভোটার উপস্থিতির তুলনায় ভোট পড়ার হার বেশি বলছেন অনেকে। অসমর্থিত সূত্রের ভোটের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারই মহাজোট প্রার্থীদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান অনেক। কোথাও কোথাও ব্যবধান আড়াই লাখ থেকে প্রায় তিন লাখ। ২০০১ সালের এসব আসনের বেশ কয়েকটি এবং ২০০৮ সালেও কয়েকটি আসনে বিএনপি জয়ী হয়েছিল।

এ বিপুল বিজয়ে এখনো পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পরিচিত প্রভাবশালী প্রার্থীর পরাজয়ের খবর পাওয়া যায়নি। জাতীয় পার্টি ছাড়া মহাজোটের শরিক দলগুলোর কোনো প্রার্থী পরাজিত হয়নি বলেও জানা গেছে।

এ পরাজয়ের পর বিএনপি এখন কী করবে তা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সন্ধ্যায় নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় এসেছেন। দলের নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করছেন। বিএনপির যারা বিজয়ী হয়েছেন তার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন কি-না তা নিয়েও কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করছেন। বিষয়টি গতরাতে দল এবং ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে অল্পবিস্তর আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের মাধ্যমে আন্দোলনে নামার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ।

ভোটগ্রহণ শেষে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, মানুষের প্রত্যাশিত বড় ভোট উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। ২৯৩ আসনে ভোট উৎসব হয়েছে ব্যালটের মাধ্যমে। আর ৬টি আসনে ভোট উৎসব ছিল ইভিএমে। ৪০ হাজার কেন্দ্রের মধ্যে গোলযোগ ও অনিয়মের কারণে ২২টিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়েছে। বাকি আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়। তিনি আরও বলেন, কিছু জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে কমিশনের নজরে এসেছে। কমিশন সহিংসতার ঘটনার কেন্দ্রগুলোর প্রতিটিতে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

এর আগে সকালে রাজধানীর সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নৌকার জয় হবে, হবেই। নির্বাচনে যে ফলই আসুক না কেন, তিনি ও তার দল তা মেনে নেবেন।

বেলা ১২টার দিকে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমি কারও মুখে কোনো আনন্দ উল্লাস দেখছি না। যা খবর পাচ্ছি তা উদ্বেগজনক।
বেলা ১১টার দিকে উত্তরায় ভোট দেওয়ার পর সিইসি কেএম নুরুল হুদা বলেন, এখন পর্যন্ত সারা দেশে নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।

ভোট দিতে গিয়ে নিজের ভোটকেন্দ্রে বিরোধী দলের কোনো পোলিং এজেন্ট পাননি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। রাজধানীর ইস্পাহানী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, সকাল থেকেই আমি অসংখ্য টেলিফোন পেয়েছি। আমার কাছে অসংখ্য অভিযোগ এসেছে। কমিশনার হিসেবে আমার একক কোনো দায়িত্ব আছে বলে এখন আর আমি মনে করি না।

দুপুরে ভোটগ্রহণের মাঝপথে কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে যায় বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল লিখিত অভিযোগে বলেছেন, শনিবার রাতে দেড় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সহযোগিতায় ৪০০ থেকে ৫০০ ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। নির্বাচন শুরুর আগে প্রায় ২৫০টি আসনের ধানের শীষের প্রতীকের এজেন্টদের বাধা দেওয়া হয়েছে। ২২১টি আসনে নানা অনিয়মের অভিযোগ ইসিতে জানিয়েছে বিএনপি।

সকাল থেকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম দেখা গেছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে ভোটার বাড়তে থাকে। উৎসাহ নিয়ে পরিবারের সদস্যদে নিয়ে অনেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। রাজধানীর বিভিন্ন আসনে ভোটকেন্দ্রগুলোয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেন নারীরা। তরুণদের উপস্থিতিও ছিল বেশ। নির্বাচনের আগের রাতে সারাদেশের কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কথা জানা গেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ১৯ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থক। তবে রাজধানীতে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

এবারের ভোট নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্র সরেজমিনে ঘুরে দেখার পর ভারতের পর্যবেক্ষক গৌতম ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ভোট দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের নির্বাচনের মধ্যে কোনো মিল আছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একই জিনিস দেখতে পাচ্ছি। সেখানেও জনগণ লাইনে দাঁড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়। এখানেও একই ঘটনা ঘটছে।

এদিকে ঢাকায় নির্বাচন ভবনের ফোয়ারা প্রাঙ্গণে বিশেষ মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হয়। বিভাগ অনুসারে ৮টি এলইডি টিভিতে এ ফল প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া দলীয় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে দুটি মনিটরে পৃথকভাবে ফল দেখানো হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। ইসি ঘোষিত ফল অনুসারে শেখ হাসিনা পান ২ লাখ ২৯ হাজার ৫৩৯ ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ পায় ১২৩ ভোট। শেখ হাসিনাকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে ইসি।

এবার ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৭ জন; এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৫ জন ও নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩১২। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। তবে জোটের আড়ালে বেশ কয়েকটি অনিবন্ধিত দলের নেতা নিবন্ধিত দলের প্রতীকে প্রার্থী হন। এ নির্বাচনে সব মিলিয়ে প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৮৬১ জন। ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৫ হাজার ৬৯১টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ করা হয়।

নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর ৬ লাখ ৮ হাজার ও বাকি ৬৮ হাজার ৬১০ জন সদস্য নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার পুলিশ; ৪ লাখ ৪৬ হাজার আনসার এবং ৪১ হাজার গ্রামপুলিশ। ৬০০ প্লাটুন র‌্যাব এবং ৯৮৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্যও দায়িত্ব পালন করে ভোটের মাঠে। এর বাইরে ৩৮৯ উপজেলায় ৪১৪ প্লাটুন সেনাসদস্য, ১৮ উপজেলায় নৌবাহিনীর ৪৮ প্লাটুন এবং ১২ উপজেলায় ৪২ প্লাটুন কোস্টগার্ড সদস্য ভোটের দায়িত্ব পালন করেন। সারাদেশে ১ হাজার ৩২৮ নির্বাহী হাকিম এবং ৬৪০ বিচারিক হাকিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ১২২টি নির্বাচনী তদন্ত কমিটির ২৪৪ সদস্য ছিলেন ভোটের মাঠে।