ঢাকা, মঙ্গলবার ১২, নভেম্বর ২০১৯ ১২:৪৯:৪০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

পুরাণ : বনদেবী আর্টেমিস

শান্তা মারিয়া

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:২২ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার

বনদেবী আর্টেমিস

বনদেবী আর্টেমিস

গ্রিক পুরাণের দেবীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান দেবী আর্টেমিস। প্রাক গ্রিক যুগ থেকেই সম্ভবত তার উপাসনা প্রচলিত ছিল। তিনি শিকারী দেবী ও বনদেবী হিসেবে পূজিত হতেন। তিনি ছিলেন কুমারীদের রক্ষাকর্ত্রী। পরবর্তীতে সন্তান প্রসবে সহায়ক দেবী হিসেবেও তার পূজা প্রচলিত হয়।

আর্টেমিস সংগীত ও আলোর দেবতা ফিবাস অ্যাপোলোর যমজ বোন। তিনি দেবরাজ জিউস ও টাইটান লেটোর কন্যা। হেরার শাপে প্রসব বেদনা নিয়ে ভূ-খণ্ডের সর্বত্র ঘুরে বেড়ানো লেটো ডেলোস দ্বীপে শেষ পর্যন্ত সন্তান প্রসব করেন। প্রথমে আর্টেমিস ভূমিষ্ঠ হন। তিনি মাকে সাহায্য করেন ভাই অ্যাপোলোর জন্মে। এ জন্য তিনি ধাত্রী দেবী হিসেবে পরিচিত কোনো কোনো সম্প্রদায়ের কাছে।

আর্টেমিস বনদেবী। তার প্রতীক হলো সোনালি তীর ধনুক, চাঁদ, হরিণ ও শিকারী কুকুর। এরা তার সঙ্গে থাকে সর্বদা। তার তূণীতে থাকে সোনালি ও রূপালি তীর। তার সঙ্গে আরও থাকে  বনপরীরা। শৈশবে তিনি জিউসের কাছ থেকে একাধিক বর পান।  তিনি প্রার্থনা করেন চিরকুমারীত্ব।  জিউস তাকে দেন তীরধনুক, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা টিউনিক যা শিকারীদের পরিধেয়, শিকারের জুতা। ষাট জন বনপরী ছিলেন তার সহচরী। আর্টেমিসের তীর ধনুক বানানো হয় লিপারা দ্বীপে যেখানে দেবকারিগর হেফাস্টাস আর সাইক্লোপসরা কাজ করেন। তিনি বনদেবতা প্যানের কাছ থেকে সাতটি কুকুরী ও ছয়টি কুকুর পান। এরা দুর্দান্ত শিকারী। তিনি ছয়টি হরিণ ধরেন যাদের শিংগুলো রূপালি। এই হরিণরা তার রথ টেনে নিয়ে যায় অথবা তার সঙ্গে থাকে।

আর্টেমিস ছিলেন চিরকুমারী। তিনি এবং তার সহচরীরা কঠোরভাবে কুমারীত্ব রক্ষা করতেন। তবে শিকারী ওরিয়নের সঙ্গে তার প্রেম নিয়ে কয়েকটি পুরাণ আছে। একটি পুরাণে আছে ওরিয়ন ছিলেন আর্টেমিসের সহচর। দেবী তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু ঈর্ষানিত ভাই অ্যাপোলো বোনের কুমারীত্ব রক্ষার জন্য কৌশলে তাকে হত্যা করান। আরেক পুরাণে রয়েছে অ্যাপোলোর কৌশলে দেবী শিকার ভেবে ভুলক্রমে ওরিয়নকে হত্যা করেন। আরেক পুরাণে রয়েছে আর্টেমিস ও ওরিয়ন এক সঙ্গে শিকার করে বেড়াতেন। তারা বিপুল জীবজন্তু হত্যা করায় ধরিত্রী দেবী গেইয়া এক বিষাক্ত স্করপিয়ন বা কাঁকড়াবিছা পাঠান। বিছার দংশনে মৃত্যু হয় ওরিয়নের। জিউস তখন ওরিয়ন এবং বিছা দুজনকেই নক্ষত্রলোকে স্থান দেন।

রাজা ক্যাডমাসের নাতি এবং মৌমাছি দেবতা অ্যারিস্টিউসের ছেলে শিকারী অ্যাকটিয়নকে হত্যা করেন আর্টেমিস। এক পুরাণে রয়েছে অ্যাকটিয়ন নিজেকে দেবীর চেয়ে বড় শিকারী বলে অহংকার করায় তাকে হত্যা করেন আর্টেমিস। আরেক পুরাণে রয়েছে অ্যাকটিয়ন ছিলেন দেবীর সহচর। একবার স্নানরতা নগ্ন দেবীকে ইচ্ছাকৃতভাবে দেখায় বা তাকে কামনা করায় দেবী তাকে হত্যা করেন। আরেক কাহিনীতে রয়েছে অ্যাকটিয়ন ভুলবশত দেবীর স্নানের জায়গায় গিয়ে তাকে  স্নানরতা অবস্থায় দেখে ফেলেন। কারণ যাই হোক দেবী তাকে হরিণে পরিণত করেন। আর নিজের শিকারী কুকুরদের হাতেই নিহত হন অ্যাকটিয়ন।

আর্টিমিস ও আলোইদা দানবদের পুরাণও বিখ্যাত। দানব আলেউসের দুই ছেলেকে বলা হয় আলোইদা দানব। ভবিষ্যতবাণী ছিল যে তারা শুধুমাত্র পরষ্পরের হাতেই নিহত হবে। তারা হেরা ও আর্টিমিসকে পাওয়ার জন্য  স্বর্গ দখল করতে যায়। দেবতারা যুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে পড়লে আর্টেমিসকে দিয়ে দানবদের কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। আর্টেমিস তাদের নাক্সোস দ্বীপে আসতে বলেন। আর্টেমিস যখন তাদের সামনে আবির্ভুত হন তখন তার রূপে বিমোহিত হয়ে তাকে পাওয়ার জন্য  যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং পরষ্পরের হাতে নিহত হয় আলোইদা ভ্রাতৃদ্বয়। গ্রিক পুরাণের এই কাহিনির সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের সুন্দ-উপসুন্দের কাহিনির মিল রয়েছে।

থিবিসের রাজা অ্যাম্ফিয়নের স্ত্রী নাইওবির ছিল সাত পুত্র ও সাত কন্যা। নাইওবি অহংকার করে বলেন যে তিনি লেটোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কারণ তার মাত্র এক পুত্র-কন্যা।  এই অপমানে ক্রুদ্ধ অ্যাপোলো সাত পুত্রকে এবং আর্টেমিস সাত কন্যাকে মতান্তরে ছয়পুত্রকন্যাকে হত্যা করেন। শোকে মৃত্যুবরণ করেন অ্যাম্ফিয়ন। আর শোকগ্রস্ত নাইওবি ও তার অবশিষ্ট পুত্র কন্যাকে আর্টেমিস পাথরে পরিণত করেন।

আর্কেডিয়ার রাজকন্যা ক্যালিস্টো ছিলেন আর্টেমিসের সহচরী। অন্য সহচরীদের মতো তাকেও চিরকুমারীত্বের শপথ নিতে হয়। পরে জিউস আর্টেমিস বা অ্যাপোলোর ছদ্মবেশে তার সঙ্গে প্রণয় সম্পর্ক স্থাপন করলে তিনি আর্কাস নামে এক পুত্রের জন্ম দেন। ক্রুদ্ধ আর্টেমিস বা হেরা অথবা দুজনেই ক্যালিস্টোকে মেয়ে ভালুকে পরিণত করেন। আর্কাস বড় হয়ে শিকারী হয়। এক মন্দির প্রাঙ্গণে ভালুকবেশী ক্যালিস্টোকে দেখ তাকে শিকারের উদ্যোগ নিলে জিউস তাকেও ভালুকে পরিণত করে মা-পুত্র দুজনকেই নক্ষত্রলোকে স্থান দেন।

ট্রয় অভিযানে গ্রিক বাহিনী আর্টেমিসের প্রিয় বন্যপ্রাণী এক খরগোসকে শাবকসহ হত্যা করে। ফলে ক্রুদ্ধ আর্টেমিস অনুকূল বায়ুপ্রবাহ বন্ধ করে দেন এবং আগামেমননের কন্যা ইফিজিনিয়াকে বলি হিসেবে চান। ইফিজিনিয়াকে বলি দেওয়ার সময় আর্টেমিস তাকে উঠিয়ে নিয়ে যান এবং পরবর্তিতে নিজের পুরোহিতানি নিযুক্ত করেন। অন্য কাহিনিতে আছে আগামেমনন আর্টেমিসের একটি পবিত্র হরিণকে এক তীরে হত্যা করেন এবং গর্ব করে বলেন যে দেবীর চাইতেও বড় শিকারী তিনি। এই ঘটনায় ক্রদ্ধ আর্টেমিস গ্রিক বাহিনির গতি রুদ্ধ করে দেন।

ট্রয় যুদ্ধে তিনি ভাই অ্যাপোলোর মতোই ট্রোজান পক্ষে ছিলেন। হেরা তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষণ আঘাত করেছিলেন।

আর্টেমিসকে নিয়ে অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। আর্টেমিস সহজেই ক্রুদ্ধ হন। খামখেয়ালী তবে হিংস্র নন। কিন্তু কখনও কখনও ভীষণ নিষ্ঠুর। তিনি খুবই সুন্দরী। অরণ্যচারী। নারীদের প্রতি বিশেষ করে কুমারীদের প্রতি সদয়। শিকারীদের প্রতিও তিনি সদয়। থিসিউসপুত্র হিপ্পোলাইটাস ছিল তার প্রিয়পাত্র।

আর্টেমিস নারীদের রোগের উপশম করতেন। স্পার্টা, ডেলোসসহ গ্রিসের বিভিন্ন স্থানে তিনি পূজিত হতেন কল্যাণময়ী সদয় দেবী হিসেবে। আর্টেমিসকে অনেক সময় চন্দ্রদেবীও বলা হয়ে থাকে। কোন কোন স্থানে আর্টেমিসকে চন্দ্রদেবী এবং তার ভাই অ্যাপোলোকে সূর্যদেব হিসেবে পূজা করা হতো। তবে অধিকাংশ পুরাণকারের আর্টেমিস চন্দ্রদেবী নন, বরং স্বতন্ত্র বনদেবী।