ঢাকা, শনিবার ০৭, ডিসেম্বর ২০১৯ ১৫:০৫:৪৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বাহারি পাখি নীলকণ্ঠ : আইরীন নিয়াজী মান্না

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:১৫ এএম, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার

বাহারি পাখি নীলকণ্ঠ

বাহারি পাখি নীলকণ্ঠ

বাহারি পালকের কারণে পাখিটি সকলের দৃষ্টি কাড়ে। নীল রঙের ঝলকে চমকে দেয় পাখি প্রেমিদের মন। আমি প্রথম পাখিটিকে দেখি চন্দ্রা পিকনিক স্পটে। একটি নাগেশ্বর গাছের ডালে বসেছিলো এক জোড়া পাখি। চঞ্চলা হরিণীর মতো ছেুাটাছুটি করছিলো এ ডাল থেকে সে ডালে। ওদের দৈহিক সৌন্দর্যে মুহূর্তেই ওরা জয় করে নেয় আমার মন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, রমনা পার্ক, চিড়িয়াখানা এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনে অনেকবার দেখেছি এই পাখিটি। বাহারি রঙের এই পাখিটির নামটিও চমৎকার, নীলকণ্ঠ!

পাখিটির পোশাকি নাম ‘ইন্ডিয়ান রোলার’ (Indian rollar)। বৈজ্ঞানিক নাম ‘কোরাসিয়াস বেনঘালেনসিস’ (Coracias benghalensis)। আর আদরের নাম নীলকণ্ঠ পাখি।

আমাদের দেশে সাধারণত দুই রকমের নীলকণ্ঠ আছে। সাধারণ এবং পাহাড়ি নীলকণ্ঠ। সাধারণ নীলকণ্ঠই বাংলাদেশে বেশি দেখা যায়। আর পাহাড়ী নীলকণ্ঠ থাকে পাহাড়ে। সাধারণ নীলকণ্ঠ রাজধানীসহ সারা দেশের খোলামেলা জায়গায় দেখা যায়। জনবসতি এদের খুব পছন্দের জায়গা। গভীর অরণ্য ওরা পছন্দ করে না। মাঠের পাখি নীলকণ্ঠ খোলা প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে ভীষণ ভালোবাসে। রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক তার ও টেলিগ্রাফের তারের ওপর ওদের একা বা জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকতে দেখা যায়। বেশ সাহসী ও সতর্ক পাখি নীলকণ্ঠ। শত্রু আক্রমণ করলে ভয় না পেয়ে ওরাও পাল্টা আক্রমণ করে বসে।

নীলকণ্ঠের মাথা শরীরের তুলনায় বড়। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বায় ১৩ থেকে ১৪ ইঞ্চির মতো। নীলাভ ও বাদামি রঙের পাখি নীলকণ্ঠ। ওদের শরীরে হালকা ও গাঢ় নীল রঙ রয়েছে। মাথা, ডানা, লেজ, উরু ও পাশের দিকেও নীল। পেটের দিকের রঙ নীলচে বাদামি। ডানা ও লেজ বেশ লম্বা। উড়ন্ত অবস্থায় ডানা এবং লেজের উজ্জ্বল পালক দেখে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। চঞ্চু বেশ মোটা, শক্ত এবং ধারালো। পা ও ঘাড় খাটো। পা মরিচা রঙের।

নীলকণ্ঠের খাবার মেন্যুতে আছে পোকামাকড়, মৌমাছি, ফড়িং ইত্যাদি। ব্যাঙ, ইঁদুর, গিরগিটিও ওরা খেয়ে থাকে।

শহুরে নীলকণ্ঠ দালানের ফোকরে বাসা বাঁধে, আর গ্রামের নীলকণ্ঠ বাসা তৈরি করে গাছের ফোকরে। কখনো কখনো ওরা অন্য পাখির তৈরি করা গর্তও দখল করে বসে। খড়-কুটো, পালক ও নানা রকম আবর্জনা দিয়ে বাসা বানায়। এই বাসায় গ্রীষ্মকালে ৪ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। গোলগাল আকৃতির ডিমের রঙ ফকফকে সাদা। বাবা-মা দুজনে মিলেই ডিমে তা দেয় এবং বাচ্চাদের খাওয়ায়।

প্রজনন ঋতুতে নীলকণ্ঠরা সারাক্ষণ চেঁচামেচি করে ঝগড়া করে। এ সময় পুরুষ নীলকণ্ঠ স্ত্রীকে আকর্ষণ করার জন্য শূন্য আকাশে চমৎকার ভঙ্গিতে নাচানাচি করে। ডিগবাজি খেয়ে নানা রকম কসরত দেখায়। চেঁচামেচিতে ওস্তাদ এই পাখি খুব উঁচু সুরে ডাকাডাকিও করতে পারে।

বাংলা সাহিত্যে বার বার এসেছে এই পাখিটির নাম।  নীলকণ্ঠ পাখির সঙ্গে পৌরাণিক আখ্যানের সম্পর্কও গভীর। এই পাখি নাকি উড়ে গিয়ে কৈলাসে মহাদেবকে জানায়, সপরিবারে মা দুর্গা ফিরছেন।

আবার হিন্দু পুরান মতে, দুর্গাপুজোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এই পাখির। প্রচলিত বিশ্বাস, বিজয়া দশমীতে এই পাখি দেখতে পাওয়া খুবই শুভ।

বলা হয়, রাবণবধের আগে এই পাখির দর্শন পেয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। আবার অনেকের মতে, নীলকণ্ঠ পাখি পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রামচন্দ্র ও তার বাহিনীকে। তাই তার দর্শন পাওয়া শুভ বলে ধরা হয়।

আমাদের দেশে এখনো সন্তোষজনক হারে নীলকণ্ঠ পাখি আছে। কিন্তু অবাধে গাছ কাটার কারণে ওদের বাসা তৈরির সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে দিন দিন। মাঠের পাখি নীলকণ্ঠকে আমাদের প্রকৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এদিকে সকলের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন সঠিক সচেতনতাবোধ।

লেখক : বাংলাদেশ বার্ড ওয়াচার সোসাইটির আহবায়ক।