ঢাকা, রবিবার ০৭, জুন ২০২০ ১৬:০৭:১৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মন্ত্রী বীর বাহাদুর সিএমএইচ-এ ভর্তি দেশের ৫০ জেলা পুরোপুরি লকডাউন করোনা: দেশে ২৪ ঘন্টায় মৃত্যুর নতুন রেকর্ড, শনাক্ত ২৭৪৩ দেশের একমাত্র ‘গ্রিন জোন’ ঝিনাইদহ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মোহাম্মদ নাসিম

ছোটগল্প # ফাতেমার ফ্রক

কাজী কেয়া | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৫৩ পিএম, ৯ মে ২০২০ শনিবার

ছোটগল্প # ফাতেমার ফ্রক : কাজী কেয়া

ছোটগল্প # ফাতেমার ফ্রক : কাজী কেয়া

হঠাৎ প্রকৃতি দুঃখে ছেয়ে গেল। কী অসুখ হলো প্রকৃতির? গাছগুলো থির হয়ে গেল। বাতাসে কেমন কষ্ট কষ্ট রেশ। সব ফুল হলুদ হয়ে হয়ে ফোটে। লাল জবাফুল। নীল নীলমনি। শাদা বেলফুল। গোলাপি গোলাপ, সব ফুলের নিজস্ব রং উধাও হয়ে গেছে। সব ফুল এখন হলুদ। ছোট্টো ফাতেমা ভাবে, কী হইছে সবার?

মেঘও কেমন হলুদ হলুদ। সব প্রজাপতি হলুদ। পাখিগুলো হলুদ। ভোরের রং হলুদ। মানুষের চোখের ভেতরটাও কেমন ফ্যাকাসে হলুদ।

দুঃখের রং বুঝি হলুদ? এমন প্রশ্ন জাগে ছোট্টো ফাতেমার মনে।

ক’দিন ধরে ফাতেমা লক্ষ্য করছে শহরের মানুষগুলো এখন বাইরে তেমন বের হয় না। দু-একজন বের হলেও মুখ-নাক ঢেকে বের হয়।

সবার মধ্যে কেমন ভয় ভয় ভাব। বাহিরকে ভয় কেন মানুষের? আহা, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোকে আর দেখা যায় না। ওদের ইশকুল নাকি বন্ধ। আগে রাস্তা কাঁপিয়ে কত গাড়ি চলত। কত ভিড় মানুষের। চিৎকার করে বাসের হেলপাররা যাত্রীদের ডাকত, মতিঝিল গুলিস্তান যাত্রাবাড়ি...।

এখন কেউ কোথাও নেই। রাস্তাঘাট সব ফাঁকা। অফিসগুলোও বন্ধ। সবাই এখন ঘরে থাকে। বাইরে বের হতে কিসের ভয়? ছোট্টো ফাতেমা এসবের কারণ খুঁজে পায় না।

ফাতেমা। ছোট্টো ছয় বছরের ফাতেমা। তার কোনো ঘর নেই। বাবা-মা, স্বজন বলতে কেউ নেই। একা মানুষ, দিনভর হাইকোর্ট মাজারে কাটায়।

শুক্রবারে মাজারের মসজিদে মানুষজন নামাজ পড়তে আসে। তখন  দয়া করে কেউ কেউ  দু-পাঁচ টাকা করে দেয় ওকে। এদিন ওর মন খুশিতে ভরে ওঠে। সে বটতলার খালার পিঠার দোকানে বসে। মন ভরে গরম গরম পিঠা কিনে খায়। বাকি পয়সা দিয়ে বানরুটি কেনে। সেই রুটি নিয়ে পার্কে যায়। ওকে দেখেই পাখিরা উড়ে আসে। সে রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাখিদের দেয়। পাখিরা মনের সুখে খায় আর শিস দেয়। ফাতেমার মনও তখন খুশিতে ভরে ওঠে। মিষ্টি সুরে গান গায় ফাতেমা,
        পাখির সুখে আমার সুখ
        গাছের সুখে আমার সুখ
        ফুলের সুখে আমার সুখ
        এরা সুখে থাকলে আমার
        থাকে না আর কোনো দুখ..
গান করতে করতে একসময় ফাতেমা বকুলগাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়ে।

অন্যদিনগুলো ওর কষ্টে কাটে। কেউ দয়া করে কিছু দিলে খায়, নয়তো মাজারের কল থেকে পেট পুরে পানি খেয়ে দিব্যি কাটিয়ে দেয়। রাত কাটে ফুটপাতে, পার্কে বা মাজারের বারান্দায়।

এখন দুঃসময়। প্রকৃতির অসুখ। সবার মনে দুঃখ। মাজারে লোকজন আসে না। তার দিন কাটে উপোসে, রাত কাটে উপোসে। খিদে লাগলে পেট পুরে পানি খেয়ে নেয় মাজারের কল থেকে। রাস্তায় পুলিশ আর আর্মি টহল দেয়। পথে কাউকে দেখলে তাড়া দেয়। জানতে চায়, কেন বাইরে বের হয়েছে।

ছোট্টো ফাতেমা ফুটপাতে শুয়ে থাকে। কখনো ফুটপাত ধরে হাঁটে আপন মনে। পুলিশ-আর্মিরা ওকে দেখেও যেন দেখে না।

তো একদিন সে এক পুলিশকে দেখে সাহস করে এগিয়ে যায়। গিয়ে বলে, ও পুলিশ মামা, কী হইছে দেশে? আপনাগো মুখ বান্ধা ক্যান? শহরের মানুষজন কই গেল?

ওর কথায় ধমকে ওঠে পুলিশ মামা, এই তোর নাম কী?
সে হেসে বলে, ফাতেমা।

বাড়ি কোথায়?

বাড়ি নাই।

বাবার নাম?

জানি না।

মা কোথায়?

জানি না।

থাকিস কোথায়?

পথে।

তোর মুখ খোলা কেন? জানিস না, দেশে করোনা এসেছে। গোটা দেশ লকডাউন। কত মানুষ মারা যাচ্ছে।

তাই? তো করোনার বাড়ি কই? তার কী খুব শক্তি? তারে গুলি করতে পারেন না! লকডাউন কী মামা?

দূর বোকা! করোনা মহামারি। আর লকডাউন হচ্ছে ঘরের বাইরে আসা নিষেধ। তুই এসব বুঝবি না। জলদি বাসায় যা।

কইলাম তো আমার বাসা-বাড়ি নাই। এই বলে ফাতেমা হাসতে থাকে।

কী মিষ্টি হাসি! ক’দিন ধরে শুধু পানি খেয়ে আছে। ওর কী খিদে লাগে না! তারপরও মুখে এমন হাসি! আপন মনে আবার হাঁটতে থাকে ফাতেমা। পুলিশ মামাও আর ওর দিকে ফিরে চায় না।  

তখন খনখনে দুপুর। মৎস্য ভবনের কাছে এসে দাঁড়ায়। কী ভাবে যেন। তারপর রাস্তা পার হয়ে রমনা পার্কে ঢোকে।  গিয়ে বসে বটতলায়। যেখানে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের ভোরে ছায়ানটের অনুষ্ঠান হয়। এবার করোনার জন্য সবকিছু বন্ধ। পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠানও হয়নি।  

পার্ক একবারে জনশূন্য। সে একা। ওর মতো অন্য কোনো শিশু নিশ্চয় এমন একা থাকলে ভয় পেত। ওর ভয়ডর বলে কিছু নেই।  পুবপাশের বকুলতলাটা কেমন আঁধার আঁধার। হঠাৎ ওপাশ থেকে পাখির ডাক ভেসে এলো। সে-ও পাখির মতো করে বার দুয়েক ডাকল। তারপর সেদিকে ছুটে গেল।  

ওহো, বলাই হয়নি, ও কিন্তু পাখিদের বন্ধু। অন্যদিন না পারলেও শুক্রবার দিন ও পাখিদের জন্য খাবার কিনে আনে। বনরুটি তো আনেই, পারলে মুড়ি, বিসকুটও কিনে এনে পাখিদের খেতে দেয়। ফাতেমাকে দেখলে পাখিরাও কোত্থেকে উড়ে এসে ওর সামনে কিচিরমিচির করতে থাকে। ফাতেমা তখন  রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছুঁড়ে দেয়, ছড়িয়ে দেয় বিসকুট, মুড়ি। পাখিদের খাওয়া দেখে সে  খুশিতে মাথা দুলিয়ে গান গায়।

তো, এদিনও ও বকুলতলায় যেতেই পাখিরা উড়ে এল। কিন্তু আজ তো ওর কাছে কোনো খাবারই নেই। সে নিজেই তো উপোস। খুব কষ্ট হয় ফাতেমার। পাখিদের সে কিছুই খেতে দিতে পারবে না যে! মনে কষ্ট নিয়ে সে বকুলতলার ঘাসে শুয়ে পড়ে। সুর করে ছড়াগান গাইতে  থাকে,
             ও আমার সুন্দর পাখিরা
             ভুল বুঝিস না তোরা
             শুক্কুরবার আইলে আবার
             তোদের জন্য আনব খাবার..

সে খাবার আনবে কী করে! এখন তো মাযারে, মসজিদে লোকজন আসে না। এখন যে করোনা, না কী যেন আইছে। ভয়ে তো মানুষজন পথেই নামে না। তো তারা না আইলে দু-পাঁচটাকা কে দেবে তারে! ভাবে সে, আহারে, এই পোড়ামুখো করোনারে কী করে যে তাড়ানো যায়!

অমন ভাবতে ভাবতে তার চোখে ঘুম নেমে আসে। ঘুমের মধ্যে তার সুন্দর পাখিরা মধুর সুরে গান গাইতে শুরু করে।

হঠাৎ খুব কাছ থেকে ওর নাম ধরে কে ডাকল। চোখ মেলতেই দেখে এক অপরূপ পরি ওর কাছে দাঁড়ানো। তার গায়ে মেঘরঙা কাচের মতো একটা মনকাড়া ফ্রক। সেই ফ্রকে নানারঙের প্রজাপতি আর পাখি আঁকা। ফাতেমা ওর রূপে তো মুগ্ধই, আর ফ্রকটা থেকেও চোখ ফেরাতে পারে না।

পরিটা ওর মুগ্ধ চাহনি দেখে হেসে কুটিকুটি। হাসিতে যেন চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে। পরি বলল, কী হলো ফাতেমা,  আমাকে? নাকি আমার ফ্রকটা? কাকে দেখে এমন অবাক হয়ে গেলে? কথা বলছ না যে!

পরির কথায় সম্বিত ফিরে পায় সে। বলে, তুমিও সুন্দর, তোমার ফ্রকটাও  সুন্দর।

ফাতেমার কথায় পরি আবারও হেসে উঠল, আর সে হাসতেই তার ফ্রকে আঁকা প্রজাপতি আর পাখিরা সত্যি হয়ে গেল। তারা ডানা মেলে উড়ল খানিকখন, তারপর আবার ফ্রকে এসে ছবির মতো বসে গেল।

এমনও হয়!  ফাতেমা বিস্ময়ে হতবাক। পরি বলল, এই ফ্রকটা হলো করোনা তাড়ানো জাদু। তোমার জন্যই এটা এনেছি। আমি চাঁদের পরি। তুমি ভেবেছিলে না, কী করে করোনাকে তাড়নো যায়? সেটা আমি বুঝতে পেরেই এটা নিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছি। আসলে, তুমি অনেক ভালো মেয়ে। তোমার কোনো লোভ নেই। কষ্ট হলেও কিছু মনে করো না। তাছাড়া গাছ, পাখি, ফুল- এদের তুমি ভালোবাসো। আর তুমি কখনো মিথ্যে কথা বলো না, কোনো হিংসে নেই তোমার মনে। এমন মানুষ তোমাদের দেশে কেন, সারা পৃথিবীতেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর এমন মানুষের জন্যই এই জাদুর ফ্রক। আর কেউ পরলে কাজ হবে না।

কী কাজ হবে না?

বললাম তো, করোনা তাড়ানোর কাজ। এটা তোমার গায়ে পরিয়ে দিয়ে আমি চাঁদের দেশে উড়ে যাবো। আমার মা অপেক্ষায় আছে। তুমি ফ্রকটা পরলেই পরি হয়ে যাবে, এবং উড়তেও পারবে। আর যতদূর উড়বে ততদূর করোনা আর থাকবে না।

তাই? তাহলে আমি সারা পৃথিবী উড়ে বেড়াবো। যাতে পৃথিবীর কোথাও একটা করোনাও না থাকে।

ওর কথা শুনে পরি হাসতে হাসতে ওকে ফ্রকটা পরিয়ে দিলো। আর পরিয়ে দিয়েই আকাশের দিকে ডানা মেলে দিলো। সে উড়ে গেল যেখানে গোল সোনালি চাঁদটা ঝলমল করে জ্বলছে সেখানে।

তারপর কী হলো জানো? রাত পোহাতেই সারা ঢাকা শহরে নেমে পড়েছে মানুষের আনন্দমিছিল। সবার কণ্ঠে, আমরা করেছি করোনাকে জয়, নেই নেই নেই আর ভয়। সেইসাথে আগের মতোই গাড়ি চলছে। দোকানপাট, অফিস আদালতও খুলে গেছে। ছেলেমেয়েরা পিঠে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে ইশকুলে চলেছে। কিন্তু কীভাবে এমন হলো, এ-প্রশ্ন কিন্তু কেউ করছে না।

তবে, মহল্লার অনেক গৃহিণী আর শিশুরা, ভোর রাতে যাদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তারা দেখেছিল। কী দেখেছিল তারা? দেখেছিল, স্বচ্ছ কাচের মতো ফ্রক পরা ডানাহীন পরির মতো ছোট্টো একটি মেয়ে উড়ে যাচ্ছে। আর তার  আগে আগে উড়ছে নানারঙের পাখি আর প্রজাপতি।  
আরো একটা ব্যাপার। আকাশ থেকে তখন ভেসে আসছিল, আজ থেকে করোনা উধাও..!

হ্যাঁ, আর সেই বুড়ি..। বুড়ির কথা আগে তোমাদের বলাই হয়নি। হাাইকোর্ট বটতলার সেই বুড়ি, যাকে ফাতেমা দাদি বলে ডাকত। সেই বুড়িও তাকে দেখেছে উড়ে যেতে। সে স্পষ্ট দেখেছে, পরি না, সে তার আদরের ফাতেমা। কারণ, উড়ে যেতে যেতে ফাতেমা দাদি.. দাদি বলে দু’বার তাকে ডেকেছিল।

পরে বুড়ির কাছে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হলো। কারণেএর পর ফাতেমাকে আর কোনোদিনও মাযারে, পার্কে, বটতলায়, ফুটপাতে, কোথথাও দেখা যায়নি।