ঢাকা, মঙ্গলবার ০৭, ডিসেম্বর ২০২১ ১৫:৪৫:৫৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মেঘনা নামে কুমিল্লা ও পদ্মা নামে ফরিদপুর বিভাগ হবে: প্রধানমন্ত্রী ওমিক্রনের সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি হলেও মারণ ক্ষমতা কম: ফাউসি সারা দেশে সংক্রমণরোধী পদক্ষেপ জোরদারের নির্দেশ বিশ্বে করোনায় আরও ৫ হাজারের বেশি প্রাণহানি সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়: স্পিকার পঞ্চম-অষ্টমে সমাপনী পরীক্ষা না থাকলেও থাকবে বৃত্তি-সনদ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার আহ্বান

বইয়ের নেশা, নেশার বই

সেলিম জাহান | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:৫৪ পিএম, ১৬ জুলাই ২০২১ শুক্রবার

সেলিম জাহান

সেলিম জাহান

মোড়কটির কোনায় লেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ’ বছর। মোড়কটি খুলতেই বেরিয়ে এলো। কি আর বেরুবে-টাটকা নিপাট গত বছরেরে শারদীয়া 'দেশ'। এক প্রিয়জন পাঠিয়েছেন ঢাকা থেকে। আমি ‘দেশটি’ দু'হাতে তুলে লম্বা শ্বাস নিলাম - নতুন পত্রিকাটির কাগজের গন্ধ, মলাটের রংয়ের গন্ধ, বাঁধাইয়ের আঁঠার গন্ধ। আহা, 'দেশের' স্বাদই আলাদা।
মনে পড়ল প্রথম শারদীয়া 'দেশ' কিনি ১৯৬৯ সালে - বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র আমরা তখন। সাপ্তাহিক 'দেশ' পত্রিকার সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয়ও সে বছরে। নিউমার্কেটের আজিমপুরের ফটক পেরিয়ে একটু ভেতরে ছিল 'নলেজ হোম' - পত্র-পত্রিকার গুদামখানা বলা চলে। কি পত্রিকা ছিল  না সেখানে? 
সপ্তাহের একটি নির্দ্দিষ্ট দিনে নলেজ হোমে যেতাম। তুলে নিতাম সাপ্তাহিক 'দেশ'। ধারাবাহিক কতো লেখা তো 'দেশেই' পড়া - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'একা এবং কয়েকজন', প্রতিভা বসুর 'স্মৃতি সততই সুখের', শিব্রাম চক্রবর্তীর 'ঈশ্বর, পৃথিবী, ভালবাসা' ও 'ভালবাসা, পৃথিবী, ঈশ্বর'। 
কিংবা বুদ্ধদেব বসুর 'মহাভারতের কথা'। আরো ভালো লাগত সমরজিৎ করের 'বিজ্ঞান বিচিত্রা' ও মৌলিনাথের (বুদ্ধদেব তনয় শুদ্ধশীল বসুর কলমী নাম) 'পশ্চিম বঙ্গের পথে-ঘাটে'।সত্যি কথা যদি বলি, তবে প্রতি সপ্তাহের 'দেশ' খুলেই চলে যেতাম শেষ পাতায় 'অরন্যদেব' পড়তে।
স্বাধীনতার পরে একটা সময়ে বাংলাবাজারে গিয়ে পুরোনো ‘দেশ’ কেনা আমার নেশায় পরিণত হয়েছিল - ষাট দশকের প্রথম দিককার দেশ, এমন কি পঞ্চাশ দশকেরও কিছু কিছু। ১৯৭৭ সালে যখন বিদেশে যাই উচ্চশিক্ষার্থে, তখন কয়েক চটের বস্তার দেশ দিয়ে এসেছিলাম ‘দেশের’ আরেক ভক্ত কণাফুপুকে - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম.এম আকাশ আর অধ্যাপক আয়েশা বানুর মা। তিনি অতশত ‘দেশ’ ভারী সুন্দর করে বাঁধিয়ে সাদিয়ে রেখেছিলেন। আজ কণাফুপু নেই, কিন্তু ‘দেশ’ পত্রিকার কথা উঠলেই আমার তাঁর কথা বড় মনে পড়ে।
কি যে ভালো লাগত 'দেশের' লেখা - খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম প্রথম পাতা থেকে শেষ তক। পড়ে ফেলতাম চিঠিপত্রও। সাহিত্যের কত বিতর্ক, কত মতানৈক্য- তা'ও তো জেনেছি ওই 'দেশ' পড়েই। পত্রিকাটির মাঝামাঝি জায়গায় থাকতো কবিতাগুচ্ছ। শেষের দিকে সঙ্গীত, শিল্প, চলচ্চিত্র, নাটক বিষয়ক সমালোচনা। এ সব কিছু ছাপিয়ে ভালো লাগত ছাপার গন্ধ, পাতা ওল্টানোর শব্দ, দু'করতলের মধ্যে একটি পুরো পত্রিকার স্পর্শ।
‘নলেজ হোমের’ পাশেই ছিল 'মহিউদ্দীন এন্ড সন্স' এর দোকান - 'পেঙ্গুইন' আর 'পেলিকান' বইয়ের স্বর্গ। তখন মার্কিন ১ ডলার পাকিস্তানী ৪ টাকা ৭৫ পয়সার সমান ছিল। ফলে আমার মত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও ঐ সব বই কিনতে পেত। মহিউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল।আশির দশকে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তখন প্রায়ই যেতাম সেখানে সরকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্হার প্রকাশনা কিনতে। প্রায়শ:ই মহিউদ্দীন সাহেব আমাকে নতুন প্রকাশনার সন্ধান দিতেন। 
আশির দশকে নিউমার্কেটে গেছি, কিন্তু ‘জীনাত বুক শপের’’ ফয়সালের সঙ্গে দু’দন্ড দাঁড়িয়ে গল্প করি নি, তেমনটা হয় নি। কি থাকতো না সে গল্পে - বিশ্ব রাজনীতি থেকে বই ব্যবসা, লেখক থেকে ‘দারুল আফিয়া’ পর্যন্ত। প্রয়াত অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর পৈত্রিক বাড়ীর অনেককেই ফয়সাল চিনতো। মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে আমাদের কনিষ্ঠা কন্যা মেখলা থাকতো। আমাদের গাল-গল্পের কালে সে দোকানের মেঝেতে গাদা করা বইয়ের ওপরে বসে ‘নন্টে-ফন্টে’ পড়তো। প্রায়ই ফয়সাল ঠাট্টা করে বলতো, ‘মেখলা, প্রতিদিন তুমি এসে বইয়ের পর বই পড়ে শেষ করে যাবে, কিন্তু কোন বই কিনবে না, সেটা তো হয় না’। মেখলা হাসতো। কোন কোনদিন সেখানে দেখা হয়ে যেতো জনাব সাঈদুজ্জামান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড: মশিউর রহমান বা প্রয়াত ড: ফসিহউদ্দীন মাহতাবের সঙ্গে - বই-পাগল অনন্যসাধারন একদল মানুষের সঙ্গে। 
সম্ভবত: ‘বুকমার্টের’ স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন কিশোর সাহিত্যিক জনাব গোলাম রহমান। চিনতাম তাঁকেও। আমার কৈশোরে তাঁর ‘রকমফের’ বইটি পুরস্কার পেয়েছিলাম । পড়ে পড়ে হদ্দ হয়ে গিয়েছিলাম। ‘জীনাত বুক শপ’ ভিন্ন ইংরেজী বইয়ের জন্যে যেতাম ‘ওয়ার্সী বুক সেন্টার’ বা ‘মল্লিক ব্রাদার্সে’। 
তবে বইয়ের ব্যাপারে আমার একটি বড় প্রিয় জায়গা ছিল স্টেডিয়ামের দোতলায় ছোট্ট দোকান ‘ম্যারিয়েটা’। দোকান ছোট্ট, কিন্তু কাঙ্খিত বহু বই পাওয়া যেত সেখানে। আশির দশকে আমার ক্রীত বহু বইয়ের উৎস ‘ম্যারিয়েটা’। আজও আমার পড়ার ঘরের তাক থেকে বই নামালে দেখতে পাই, বহু বইয়ের প্রথম পাতাতেই সেই মুদ্রিত নাম ‘ম্যারিয়েটা’। ম্যারিয়্টার মালিক খুব ভালেবাসতেন আমাকে। গেলে পরেই নানান গল্প করতেন। কখনো কথনো তাঁর ছোট্ট মেয়েটি তাঁর পাশে বসে থাকতো। বহু বছর বাদে আজিজ সুপার মার্কেটের একতলায় একটি শিল্পকর্মের দোকানে গেলে তার তরুনী মালিকটি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে জানালেন যে তিনি আমাকে চেনেন, ‘ম্যারিয়েটা’র সেই ছোট মেয়েটিই তিনি। জানালেন, আমি তার বাবার প্রিয় মানুষ ছিলাম, আমার কোন টেলিভিশন অনুষ্ঠান তিনি বাদ দিতেন না।
‘ম্যারিয়েটার’ পাশেই ছিল ‘স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স’ - রাশিয়ার প্রগতি প্রকাশনীর আড়ত বলা চলে। ম্যাক্মিম গোর্কীসহ বহু রুশ সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্মের বাংলা অনুবাদ সেখান থেকেই কিনেছি।
পুরেনো বইয়ের জন্যে ঢুঁ মারতাম দু’ জায়গায়। প্রথমত: বাংলা বাজারে। আর দ্বিতীয়ত: শহীদ মিনারের পাশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক অট্টলিকার পাশের দেয়াল ঘেঁসা দু’টো পুরোনো বইয়ের দোকান। তার একটির মালিকের কথা মনে আছে - উর্দূভাষী এক ভীষন ভদ্র মৃদুকণ্ঠ একজন মানুষ। বহু বই কিনেছি তাঁর কাছ থেকে। 
মনে পড়ে যেত শৈশবে প্রতিবছরের শুরুতেই সেতারের তারের মতো টান টান উত্তেজনা নতুন শ্রেণীর নতুন বইয়ের জন্য। বইয়ের তালিকা পাওয়ার পরেই বাবাকে অস্হির করে মারতাম কবে বই কিনতে যাওয়া হবে। তারপর যাওয়া যেত 'স্টুডেন্ট লাইব্রেরী' তে। তালিকা ধরে ধরে বই মেলানো হত। 
প্রতিটি বই আমাদের সামনে রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। প্রথমেই প্রচ্ছদে হাত বুলাতাম। তারপর ভারী সতর্কতার সঙ্গে পৃষ্ঠা ওল্টানোর পালা। নাকের কাছে নিয়ে পৃষ্ঠা শুঁকতে গেলেই 'স্টুডেন্ট লাইব্রেরীর' মালিক হারান কাকা বলতেন, 'ওটা কোর না হে, ছাপাতে সিসে থাকে'।
তারপর বইগুলো কাগজে মুড়িয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে আসা হতো বাসায়। বাবা সুন্দর করে বইগুলোতে মলাট লাগিয়ে নাম লিখে দিতেন। অতপর: আরেকবার স্পর্শ, শোঁকা এবং এক টানে পড়ে ফেলা বিশেষ করে বাংলা আর দ্রুত পঠনের বইগুলো। 
বই পড়ার মজা তো ওখানেই। শুধু তো পড়া নয়, তার সঙ্গে বইয়ের স্পর্শ, গন্ধ , হাতের মধ্যে ধরা। পৃষ্ঠা ধরে চলে যাওয়া যায় সামনে পেছনে অনায়াসেই। পাতার খস খস শব্দ কানে ঝংকার তোলে। ছাপার অক্ষরের সারি কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দেয়। হস্তস্তিত জিনিসটি কেমন যেন আপনার মনে হয়।
আজকের নব্য প্রযুক্তির যুগে বই আর বই পড়া ক্রমেই কমে আসছে। আমাদের পড়া এখন অনেকটা যান্ত্রিক উপায়েয়ই।তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে জলজ্যান্ত বইয়ের জায়গা নেই। প্রয়োজন কি স্পর্শ, গন্ধ বা হস্তস্হিততার? পড়া হলেই হল। কিন্তু বই পড়া,বই এর ঘ্রাণ অন্য রকম। টেবিলের ওপরের শারদীয়া 'দেশ'টির তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, একদিন হয়তো এর পাঠকও থাকবে না কিংবা ঐ পত্রিকাটিই হয়তো বিলীন হয়ে যাবে।

সেলিম জাহান: অর্থনীতিবিদ ও লেখক।