দুই নেত্রীর সংলাপে বাধা কোথায়?
প্রকাশিত : ০৮:০৭ এএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৩ রবিবার | আপডেট: ০৮:০৭ এএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৩ রবিবার
সজীব সরকার
আওয়ামী লীগ বা বিএনপি-যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, অপরিহার্যভাবে একটি প্রশ্নের জন্ম দেয় : 'দুই নেত্রীর সংলাপে বাধা কোথায়?' এই প্রশ্নটি তারা এতই বেশি বার জনমনে উদ্রেক করেছেন যে বিষয়টি এখন শিক্ষিতের ভাষায় 'ক্লিশে' হয়ে উঠেছে৷ কিন্তু কথা হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পরিচালিত দেশে এই প্রশ্ন জন্ম নেয় কী করে?
প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর মধ্যে একটি সত্য লুকিয়ে রয়েছে : দুই নেত্রীর সংলাপ প্রয়োজন৷ সংলাপ যখন প্রয়োজন কিন্তু সেই প্রয়োজনটি মেটে না, তখনই এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে উঁকি দেয়৷ একটি 'সভ্য' দেশের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দলটির প্রধান একে অপরের ছায়া মাড়াতেও বিবমিষা বোধ করেন -দেশের মানুষের জন্যে এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কী থাকতে পারে!
একটি দল নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছে৷ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যনত্ম তারা সরকারের দায়িত্বে থেকে দেশ ও দেশের মানুষের দরকারগুলো মেটাবেন-এটিই তো সহজ ও স্বাভাবিক কথা৷ বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরে সেসব শুধরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে সাধারণ মানুষের মন জয় করা৷ কিন্তু সেজন্যে সরকারের ভালো কোনো উদ্যোগকে প্রশংসা না করলেও অনত্মত তা স্বীকার করার মতো উদারতা তো বিরোধী দলগুলোর দেখাতে পারা উচিত৷ কিন্তু এর কোনোকিছুই না করে বিরোধী দলগুলো যেন সরকারের পিঠের চামড়া তোলার কসম খেয়ে মাঠে নেমেছে আর সরকারও মরিয়া হয়ে উঠেছে সমুচিত জবাব দেওয়ার৷ এই যদি হয় একটি দেশের 'কর্তৃপক্ষের' মানসিকতা, সেই দেশের তাহলে ভবিষ্যত কী?
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যখন দেখা যায় যে-কোনো সভা-সমাবেশে তাঁর বক্তব্যের অনত্মত ৯০ শতাংশ জুড়েই থাকে বিরোধী দলের নেতার ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ, তখন তা মর্মবেদনার কারণ হয়ে ওঠে৷ একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মানসিক দৈন্য মেনে নেয়া যায় না৷ মনে প্রশ্ন জাগে, একটি দেশের যিনি প্রধানমন্ত্রী, তাঁর কীভাবে প্রতি দিন প্রতিটি সভা-সমাবেশে সেই একই সুরে একই অভিযোগ করে সময় অপচয় করার মতো সময় থাকে? এত হালকা, এত খেলো বিষয় নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপচয় করার মতো সময় একজন প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকতে পারে-নিজের চোখ-কানকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়!
যদি আসা যায় বিরোধী দলের নেতার প্রসঙ্গে, তিনিই-বা কম কীসে! দেশের অন্যতম বড় দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্বশীল আচরণ করা শিখতে পারার দরকার ছিলো; বিরোধী দল মানে সরকারের সবকিছুতে যে শুধু বিরোধিতা করা নয়-এ শিক্ষা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি যার মূল্য তাদের নানাভাবে দিতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দিতে হবে৷ আওয়ামী লীগ দুধে ধোয়া কোনো তুলসি পাতা নয়; দলটির ভেতরে নানা ধরনের ত্রম্নটি-বিচু্যতি ও অন্যায়-অপরাধের বীজ রয়েছে৷ কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে বিরোধী দল যখন সরকারের প্রতি পদক্ষেপে 'ভুল' আর 'দুর্নীতি'র পোশাক পরাতে যায়, তখন সত্যিকারের ভুল-ত্রুটিগুলো আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়৷ কাজেই কৌশলগতভাবে বিরোধী দলগুলো নিজ নিজ অবস্থানে ব্যর্থ হয়েছে৷ আর সরকারের ব্যর্থতা হলো, অভাবনীয় রকমের জনসমর্থন পেয়ে ক্ষমতায় এলেও তারা মানুষের সেই বিশ্বাস ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে৷ সুযোগ পাওয়ার পরও যেখানে সামান্য কিছু কাজ দিয়েই মানুষের সমর্থন ধরে রাখা যেতো, সেখানে দুর্নীতিবাজ গুটিকয় মন্ত্রী-এমপি-নেতা আর ছাত্রলীগকে 'আস্কারা' দিয়ে সরকারের সার্বিক সাফল্যের গায়ে তারা কালিমা লেপন করেছে৷ সরকারও এটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, বিরোধী দলের 'আন্দোলনের' জবাবে মুখে মুখে তর্ক না করে নিজের কাজগুলো করে গেলে ওইসব 'আন্দোলন-সংগ্রাম' গণমাধ্যম তথা সাধারণ মানুষের কাছে এতটা পাত্তাও পেত না আর সরকারকেও ভীত-সন্ত্রসত্ম হয়ে 'যেন-তেন প্রকারেণ' বিরোধী দলগুলোকে দমন করার যুদ্ধে নামতে হতো না; সরকারের প্রতি জনসমর্থন অটুট থাকতো, আর দুই দলের অসহিষ্ণুতার মূল্য সাধারণ মানুষকে দিতে হতো না৷
দেশের সবচেয়ে বড় দুটি দল তো এটি জানেই, তৃতীয় বড় কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে দেশে নেই এবং অদূর ভবিষ্যতেও এমন সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ৷ তাই এটি স্পষ্ট যে, যে দলটি চিরাচরিত লুটপাট আর স্বজনপ্রীতির হার কমিয়ে সাধারণ মানুষের স্বার্থ কিছুটা হলেও দেখবে, সে দলটি সহজেই ৰমতায় আসার টিকিট পেয়ে যাবে৷ এরপরও সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে একটি দল অপরটির ভুলের গান গাইতে গাইতে মুখে ফেনা তুলতে থাকে-তাতে যদি নিজের ক্ষতিও হয় তাতেও কোনো আপত্তি নেই!
দুই নেত্রীর উভয়েই দেশের সব অনুন্নয়নের জন্যে, খুন-খারাপির জন্যে একে-অপরকে দোষারোপ করেন৷ তাঁরা দুজন কি দেশের উন্নয়ন বা অনুন্নয়নে তাদের কার কী ভূমিকা তা জানেন না? অবশ্যই জানেন৷ তবু তাঁরা একজন অন্যজনকে সবকিছুর জন্যে দোষারোপ করে যাচ্ছেন৷ তাঁরা শুধু ভাবছেন, আরেকজনের ঘাড়ে দোষটা চাপিয়ে দিলাম মানেই দোষটি তার হয়ে গেল আর আমি জনসমর্থন পেয়ে গেলাম; কিন্তু বাসত্মবতা কি আসলে এত সসত্মা?
আওয়ামী লীগ এখন ৰমতায় থেকে বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে যে 'অগণতান্ত্রিক' ও 'দমন-পীড়নমূলক' আচরণ করছে বলে বিএনপি প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তুলছে, সেই একই আচরণ কি বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে করেনি? আবার বিএনপি যা করেছিলো এবার আওয়ামী লীগ যদি এরই 'শোধ' এখন নিয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি আবার কখনো ক্ষমতায় এলে যে তারাও একইভাবে 'প্রতিশোধ' নেবে-তা কি আওয়ামী লীগ জানে না? ভালো করেই জানে; তাহলে? বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো, একটি দল সরকারে থাকলে বিভিন্ন খাতে যেসব পদৰেপ নেয়, তা সব দিক দিয়ে ভালো হলেও বিরোধী দল শুধু জনসাধারণের সামনে সরকারকে খারাপ দেখাতেই এর বিরোধিতা করে; বিরোধী দলটি জানে, ক্ষমতায় থাকলে তারা একই পদক্ষেপ নিতো৷-এর চেয়ে দুর্ভাগ্য জাতি হিসেবে আমাদের জন্যে আর কী হতে পারে?
শিক্ষা-দীক্ষাসহ নানা কারণে বাংলাদেশের রাজিৈনতক দল ও দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মনমানসিকতায় এখনো যে দীনতা রয়ে গেছে, তা কাটিয়ে ওঠা দরকার৷ চিনত্মা-ভাবনায় স্থূলতা পরিহার করে আচরণে শস্নীলতা ও সহনশীলতা ফুটিয়ে তোলা দরকার৷ তাদের বুঝতে পারা জরুরি, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও শিক্ষিতের হার বাড়ছে; রাজনৈতিক বিষয়াদিতেও সাধারণ মানুষের সচেতনতা ক্রমবর্ধমান৷ কাজেই রাজনীতি বলতে শুধু ৰমতায় যাওয়ার লোভ আর লুটপাটের অধিকার বোঝার দিন আর খুব বেশিদিন নেই-এই বোধ জাগ্রত হওয়া দরকার এখনই৷
বাংলাদেশের দুই নেত্রীর কথা-বার্তা ও কাজের কৌশল পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, একজন ডাকলে অন্যজন সাড়া দেন না শুধু একটিই কারণে : 'হার-জিত' সংক্রানত্ম 'ইগো' সমস্যা৷ দুই নেত্রীর সংলাপে এর বাইরে অন্য কোনো বাধা বোধগম্য হয় না৷ দুঃখজনক হলো, দেশের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এই দুই রাজনীতিকের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন ছেলেমানুষি প্রতিযোগিতাকেও হার মানায়; তাঁদের দুজনই নির্বাচনের ফলের বাইরেও সবকিছুতে শুধু জয়-পরাজয় খোঁজেন৷ একজনের ডাকে সাড়া দেয়াটাকেই অন্যজন পরাজয় মনে করেন আর মুশকিল হলো, দুজনই সবসময় সবকিছুতে শুধু জিততেই চান৷ এই মানসিকতাই যত গোল বাঁধায়৷
বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর ইতহাস ও বিবর্তন পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্টতই দৃশ্যমান হয়, এ দেশের মানুষের সামনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-এই দুটি দলের দুই প্রধাণই মূল আশা-ভরসার জায়গা৷ এই দুজনের চেয়ে ভালো তৃতীয় কোনো বিকল্প মানুষের সামনে নেই এবং অনেকদিন পর্যনত্ম তাঁরা বিকল্পহীন থাকবেন-এমনটিই মনে হয়৷ এই বিকল্পহীনতার বিষয়টিকে তাঁরা অপব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য বাড়বে ছাড়া কমবে না৷ শত নেতিবাচকতার পরও নানা দিক থেকে বাংলাদেশ যে প্রশংসনীয়ভাবে এগিয়ে চলেছে, এতে এই দুই নেত্রীরই বড় অবদান রয়েছে৷ বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাতে এই দুজনের একজনকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এদেশের ভবিষ্যত চিনত্মা করাও দুঃসাধ্য৷ কাজেই দুই নেত্রীকেই তাঁদের অবস্থান ও অপরিহার্যতা উপলব্ধি করতে হবে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে৷ দুজনকেই 'ইগো'-সমস্যা জয় করতে হবে৷ সবকিছুতে জয়-পরাজয় থাকে না; পরাজয়ের মধ্যেও অর্জন থাকতে পারে আর জিতেও সর্বস্ব খোয়ানো যায় - এই শিক্ষা সবার জন্যেই জরুরি৷
সজীব সরকার: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও গবেষক৷
ইমেইল: [email protected]
১৭ নভেম্বর'২০১৩
