ছিন্নমূলদের ঈদ আনন্দ
প্রকাশিত : ০৮:১২ পিএম, ১৪ জুলাই ২০১৫ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৮:১২ পিএম, ১৪ জুলাই ২০১৫ মঙ্গলবার
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : ঈদ মানে আনন্দ,ঈদ মানে খুশি। ধনী-গরীব নির্বিশেষে ঈদ আনন্দ সকলের হওয়ার কথা থাকলেও সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের আনন্দ থেকে যায় দৃষ্টির আড়ালেই। ঈদ উৎসবে তাদের নতুন পোশাক তো দূরের কথা, দু’বেলা ভাতও জোটেনা।
রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশন,বাসস্টান্ড,ধানমন্ডি লেকপাড়, মোহাম্মাদপুর ও মহাখালির বস্তিতে এমন অনেক পরিবার ও শিশুর দেখা মিলে যাদের কাছে ঈদ মানে শুধুই দু’বেলা ভাল খেয়ে দিন কাটানো। সেটিও অনেকের কপালে জোটে না। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে ঈদ আনন্দের রেশ পৌঁছেনি এদের জীবনে।
খোলা আকাশের নিচে ছেঁড়া পলিথিন ও জরাজীর্ণ বাসস্থানের মতোই তাদের জীবনের আনন্দ। ঈদের দিনেও সন্তানের মুখে দু‘মুঠো খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেতে হয় অনেকের। একজনের আয়ে জীবিকার ব্যবস্থা হয় না বলে পুরষের পাশাপাশি নারীদেরও বিভিন্ন হাট বাজারে,বাসাবাড়িতে কাজ করতে হয়। সেখানে নতুন পোশাক,এমনকি দু’বেলা ভাল খাবারের স্বপ্ন তো সোনার হরিণ।
ঈদ প্রসঙ্গে কথা হয় পঞ্চাশ বছর বয়সী রেশমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজ করেন।
তিনি বলেন,‘স্বামী বেঁচে নেই ১০ বছর হলো। জীবিকার তাগিদে মানুষের বাসায় কাজ করি। এক সময় শরীরে শক্তি ছিল,কাজ করতে ভালো লাগতো। আর এখন কাজ করি শুধু পেট বাঁচানোর জন্য। এখন ঈদ বলে আলাদা আর কিছু নেই।’
শ্যামলীতে দেখা মিলে রুমাল বিক্রেতা চুন্নু মিয়ার। তিনি মলিন হাসিতে বলেন,‘শুনছি বর্তমান সরকার দেশের জন্য অনেক ভালো কাজ করছে’। আমাদেরও যদি থাকার একটি নির্দিষ্ট জায়গা করে দিতো তাহলে হয়তো কোন এক সময়ে এই কষ্টের জীবনের অবসান ঘটতো’।
এসব দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুরাও জানে না প্রকৃত ঈদ আনন্দ আসলে কি। বাবা-মায়ের অভাবের মধ্যেও এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে ঈদের আমেজ ঠিকই কাজ করে।
মোহাম্মাদপুর বস্তি এলাকার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেলাম কয়েকজন শিশু নিজেদের মধ্যে ঈদ নিয়ে কথা বলছে। কেউ বলছে ঈদের দিন মানুষের কাছে ঘুরে ঘুরে টাকা তুলবে, কেউ বলছে মা মানুষের বাসা থেকে পুরনো কাপড় আর সেমাই নিয়ে আসবে, সেগুলো পড়ে আর খেয়ে সে ঘুরবে। ঈদে নতুন পোশাক পড়বে কি না এবং ভাল খাবার খাবে কি না এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে- ছোট ছোট শিশুগুলোর কাছ থেকে পেলাম না উত্তর।
বাংলাদেশ একটি শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। ভয়াবহ শ্রেণীবৈষম্য এখানকার এক রূঢ় বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় সমাজের মানুষেরা ঈদের মতো একটি সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসবে ইচ্ছানুযায়ী কেনাকাটা করতে পারবে না,এটাই স্বাভাবিক। ইসলামের যাকাত প্রথার মাধ্যমে ঈদের আনন্দে গরিব শ্রেণীকে শামিল করানোর চেষ্টা চলে বটে, কিন্তু তা দিয়ে পরিস্থিতির সন্তোষজনক উন্নতি ঘটে না। বস্তুত শ্রেণীবিভক্তির অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে না পারলে ঈদের আনন্দ সর্বজনীন হতে পারবে না। এই মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশে শ্রেণীবিভক্তির বিলোপ সাধন করা সহজ কাজ নয়। তারপরও দেশের গরিব মানুষকে ঈদের আনন্দে শামিল করতে হলে সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এজন্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি অতি জরুরি একটি বিষয়।
প্রকৃতপক্ষে এদেশের সাধারণ দরিদ্র শ্রেণীর মানবিক মূল্যবোধ অনেক উন্নত। শত দারিদ্র্য সত্ত্বেও তারা ঈদে আনন্দ করার চেষ্টা করে। ছেঁড়া পাঞ্জাবি গায়ে ঈদের মাঠে যায় নামাজ পড়তে, পরস্পর কোলাকুলি করে, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের টেলিভিশনের সামনে বসে ঈদের অনুষ্ঠান দেখে,অতিকষ্টে জোগাড় করা সামান্য অর্থে তৈরি সেমাই খাওয়ার দাওয়াত দেয় প্রতিবেশীকে। এসব সহজ-সরল মানুষের প্রতি সমাজের বিত্তশালীরা যদি কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলেও দরিদ্ররা অপেক্ষাকৃত ভালো ঈদ উদযাপন করতে পারে। তাই হতদরিদ্র এসকল মানুষের জন্য ঈদের আনন্দকে সমান করার কর্তব্য কিন্তু সব নাগরিকের।
১৫.০৭.২১০৫
