ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৯, জুলাই ২০২৬ ১৯:১৫:৫৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে

তাসকিনা ইয়াসমিন

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:১৯ পিএম, ৭ জানুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার

ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে

ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে

রোববার বান্ধবীর বাসায় যাবার পথে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এরপর ক্ষোভে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছেন সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে ধর্ষণ বন্ধ হবে না। তারা বলছেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক উইমেননিউজ২৪.কম’কে বলেন, এটা তো খুবই দু:খজনক একটা ব্যাপার। আমরা একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আজকে কতবছর হয়ে গেল আমাদের দেশ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হয়েছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি। জাতি একটি নতুন প্রেরণাবোধ করছে। তার ভিতরে ধর্ষণের মতো কোন ঘটনা ঘটলে আমরা জাতি হিসেবে খুব নিচে নেমে যাই। জাতি হিসেবে আমরা খুব হীন হয়ে যাই। জাতি হিসেবে আমাদের ভিতরে নিজেদের যে মানমর্যাদা, যে সম্মান আমরা পৃথিবীর বুকে গড়ে তুলেছি হঠাৎ করে যেন তাতে ধস নামে।

তিনি বলেন, আমাদের মান-সম্মান, অর্থসম্পদসহ নানা বিষয়ে আমাদের বিশ্বে যে নাম হচ্ছে তাতে ছেদ পড়ে এসব নেতিবাচক ঘটনায়। আমরা উন্নয়ন করছি, উন্নত জাতি হিসেবে উন্নয়নশীল অর্থনৈতিক সমাজ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলছি, এসবের সবকিছুর ভিতরে ইগো একটা সাইটিক প্যাটার্নে খুব জােরে একটা ধাক্কা লাগে। আমরা নিজেরা খুব নিজেদের ভিতরে খুব নিচু হয়ে পড়ি।

তিনি আরও বলেন, নিজেদের ভিতরে আত্মসম্মানবোধ, আমাদের সভ্যতা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের কৃষ্টি সবকিছুতে মনে হয় যেন একটা ধস নেমে গেছে। সুতরাং এটা তো বলার কিছু না। এটা খুবই লজ্জার কথা, দু:খের কথা এবং আমার মনে হয়, এই ধরণের কর্মকান্ড যদি খুব জোরেসোরে চতুর্দিক থেকে প্রতিবাদ করা না হয় এবং এগুলো যদি বিচার না হয় তাহলে এই ঘটনা ঘটতেই থাকবে। মেয়েদের মুখে এসিড মারা কিছু বছর আগে খুব জোরেশােরে চলছিল। খুব কঠিনভাবে সরকার পদক্ষেপ নেয়ার পরে এগুলো অনেক কমে গেছে। এখন কিছু কঠিন পদক্ষেপ নেয়া উচিত। যার মাধ্যমে মেয়েদের প্রতি অপমানকর এবং অশ্লীল আচরণ যেন অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়।

আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, আজকেও পত্রিকায় দিয়েছে  একটি ১৩ বছরের মেয়ে মনের দু:খে আত্মহত্যা করেছে, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। প্রতি সপ্তাহে খবরের কাগজে কোন না কোনখানে আমরা দেখছি এই ধরণের ঘটনা ঘটছে। এটা কোন আইসোলেটেড ঘটনা না। মনে হয় যেন একটা সিরিজ ঘটনা একের পর এক ঘটে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদের খুব চিন্তা ভাবনা করতে হবে যে, সমাজটা কোনদিকে এগুচ্ছে? আমরা কিভাবে এ সমাজকে সুপথে চালিত করতে পারি। মানুষের মধ্যে শুভ বুদ্ধির উদয় কিভাবে হবে। কিভাবে সকলকে নিয়ে আমরা, সকল মানুষকে নিয়ে দেশ হিসেবে আমরা উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারি।

তিনি বলেন, ঢাকা ভার্সিটির মেয়েরা যেভাবে গতকাল থেকে আন্দোলন করছে, আজকে খবরের কাগজে পড়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। বারবার পিছিয়ে যাচ্ছি। যতবার আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই ততবারই কোন অশুভশক্তি যেন আমাদের পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এইটুকুই বলতে পারি।

কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, এটা চরম মর্মান্তিক একটা বিষয়। এটার বিরুদ্ধে সবারই সোচ্চার হওয়া দরকার। এটা খুবই দু:খজনক। দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের এই ‌ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া দরকার।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজাইনার বিবি রাসেল বলেন, আমরা এখন টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরিতে আছি। আমাদের দেশে যেখানে চারজন নারী টপ লেভেলে আছে। এটা পৃথিবীর আর কোন দেশে নাই। সেখানে থেকে যদি আমরা একটা মেয়েকে মর্যাদা দিতে না পারি, দিনের বেলায় এইরকম ধর্ষণ আমি তো একদম শক্ড। এটা তো একেবারেই কাম্য না। আমরা তো একটা উদাহরণ যে পৃথিবীর কোন দেশেই নাই চারজন নারী টপ লেভেলে আছেন। আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা দুজন প্লাস আমাদের গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে আছেন একজন শিক্ষামন্ত্রী। আজকে সেখানে কি করে একটা মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়। লোকজন কি করে? তারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে? আমাদের হাদিসেই লেখা আছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। সেটা যদি আমরা আজকে না মানি তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি।

তিনি বলেন, আমি খুবই শকড। ঢাকার ভিতরে কেমন করে এই ঘটনা ঘটল! আমি বিশ্বাসই করতে পারছিনা। এই যুগে যেখানে মেয়েরা এগিয়ে যাবে, সেখানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আমি মেয়েদের অধিকার নিয়েই কাজ করি কিন্তু আমি এই ঘটনাটায় খুবই শোকাহত।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারীর নিরাপত্তাটা যেভাবেই হোক নিশ্চিত করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মানুষের কাছে একটা ম্যাসেজ পৌঁছে দিতে হবে যে এই অপরাধ কোনভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। ধর্ষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ লেভেল থেকে জিরো টলারেন্স নিতে হবে।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই ঘটনায় ছাত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছে। এখানে মহিলা মন্ত্রণালয় আছে তাদেরও তো আসতে হবে। মানবাধিকার নেতৃবৃন্দ সবাইকে তো আসতে বলতে হবে। এ পরিস্থিতি তো দিন দিন খারাপ হচ্ছে। নারীর চলাফেরায় বিঘ্নিত হচ্ছে। এটা তো ঘরে ঘরে প্যানিকের মতো অবস্থা হচ্ছে। আজ মেয়েদের পড়ালেখা করার জন্য বাইরে যেতে হবে। চাকরির জন্য যেতে হবে। অন্য কাজে যেতে হবে। সেটাই যদি বিঘ্নিত হয় তাহলে কি ঘরে বসে থাকতে হবে?

তিনি আরও বলেন, সামাজিকভাবে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। যেভাবেই হোক একটি এলাকায় এটি ঘটেছে। আমরা শুনেছি এটা অপরাধপ্রবণ এলাকা। সে এলাকায় সেভাবেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। যথেষ্ট আলো থাকতে হবে। এ সমস্ত এলাকায় টহলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি পরিবার প্যানিকের মধ্যে থাকছে। তাহলে কিভাবে মেয়েরা কাজ করবে। তারপরও তো মেয়েরা বের হচ্ছে। রাষ্ট্র কিভাবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।

তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটছে সেগুলো খুবই মর্মান্তিক, নিষ্ঠুর, আক্রমণাত্মক এবং সঙ্গে সঙ্গে তা খুবই উদ্বেগজনক ঘটনা। আমি বারেবারেই বলব, কঠোরভাবে ধর্ষনকারিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটা যদি না করা যায়, এই ম্যাসেজ যদি না যায় যে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র-সমাজ সবাই সোচ্চার। এই বার্তা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে না পারলে হবে না।