যমুনার চরে ফুলেআরার হাসপাতাল
প্রকাশিত : ০৩:২৪ এএম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩ শুক্রবার | আপডেট: ০৩:২৬ এএম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩ শুক্রবার
রফিকুল আলম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম
বগুড়া : চারদিকে অথৈ জল৷ মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন৷ দ্বীপের মত জেগে ওঠা চরে বসতি গড়েছে লাখো মানুষ৷ দূর্গম চরবাসির মৌলিক চাহিদার অন্যতম সমস্যা চিকিত্সা৷ চরে চিকিত্সা সেবার কোন ব্যবস্থা ছিল না৷ তাই বিনা চিকিত্সায় মানুষকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে৷ চিকিত্সা অভাবে আদরের ছোট ভাইকে হারিয়েছেন চরের এক সংগ্রামী নারী ফুলেআরা৷ ভাই হারানোর কষ্ট বুকে নিয়ে সেদিন তিনি চিকিত্সাসেবার শপথ নিয়েছিলেন৷ স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি চিকিত্সা কেন্দ্র গড়ার৷ দেশের আর দশজন নারীর মতোই একজন ফুলেআরা৷ সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের দূর্গম চরের নাটুয়ারপাড়া তাঁর বাড়ি৷ অসহায় চরবাসীর সেবা করতে তিনি নিজ শ্রমে গড়ে তুলেছেন আমিনা-দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতাল৷ ফলে এখন আর বিনা চিকিত্সায় চরবাসিকে জীবন দিতে হয় না৷
সরেজমিন দেখা যায়, জেলা সদর বা যে কোনো স্থানে যেতে চরবাসির ভরসা নৌকা৷ তা-ও আবার সব সময় মেলে না৷ সবচেয়ে কাছের পয়েন্টে (মেঘাই) যেতেও সময় লাগে প্রায় দেড় ঘন্টা৷ রাতে এই চর থেকে কোনো নৌকা যায় না৷ চরবাসীর প্রয়োজন যতই জরুরি হোক, পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষার কোন বিকল্প নেই৷ বিষয়টি অনুধাবন করে ফুলেআরা চিকিত্সা ব্যবস্থার উদ্যোগ নেন৷ ২০০৫ সালে নিজের বাড়ির পাশে গড়ে তোলেন মানবসেবা হাসপাতাল৷
হাসপাতাল বলতে কাঠ-বাঁশ ও টিনের তৈরি দ্বিতল একটি বাড়ি৷ কক্ষগুলোর ভিতরে রোগীদের জন্য ১৪টি বিছানা৷ সৌর বিদু্যত্ চালিত ফ্যান ও বাল্ব৷ আর যন্ত্রপাতি বলতে অক্সিজেন সিলিন্ডার, নেবুলাইজার, সাকার মেশিন ও গ্লুকোমিটার৷ হাসপাতাল বলতে হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এটুকু যন্ত্রপাতি মোটেই যথেষ্ট নয়৷ তারপরও অনন্য একটি উদ্যোগ চরবাসীর জন্য কতটা সহায়ক তা বাইরে দেখে অনুধাবন করা কষ্টকর৷
হাসপাতাল গড়ার কারণ জানিয়ে ফুলেআরা জানান, ১৯৮২ সালের কথা৷ চরের প্রধাণ সমস্যাই হলো শিশুদের নিউমোনিয়া৷ এক রাতে এই রোগে আক্রান্ত হয় ১১বছর বয়সী ভাই সুজন৷ আশপাশের কবিরাজরা যখন ব্যর্থ, তখন সুজনকে নিয়ে রাতেই নৌকা করে শহরে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়৷ কিন্তু নৌকা না পাওয়ায় সে চেষ্টাও বিফল হয়৷
অশ্রুসিক্ত নয়নে ফুলেআরা বলেন, 'চোখের সামনে আদরের ছোট ভাই সুজনকে বিনা চিকিত্সায় মরে যেতে দেখেছি৷ তখনই শপথ নিয়েছিলাম, এই চরে এভাবে বিনা চিকিত্সায় কাউকে মরতে দেব না৷ এ ক্ষেত্রে চরবাসীও আমাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছেন৷'
ছোট ভাই সুজনকে হারানোর এক বছর পর বিয়ে হয় ফুলেআরার৷ বিয়ের দুই বছর পর স্বামী ইমাম হোসেন ডিপ্লোমা অব মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি পাস করে যোগ দেন নাটুয়াপাড়া চরে পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল পদে৷ স্ত্রীর স্বপ্নের কথা জানলেও এককভাবে হাসপাতাল গড়া দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি৷ সংসার খরচ থেকে প্রতি মাসে টাকা জমানো শুরু করেন ফুলেআরা৷ প্রায় ১৫ বছর পর জমানো এক লাখ টাকা তুলে দেন স্বামী ইমাম হোসেনের হাতে৷ চরবাসীর সেবা দিতে প্রথমে তাঁরা নাটুয়াপাড়া চরের বাজারে গড়ে তোলেন হোমিও চিকিত্সাকেন্দ্র৷ গরিব রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হতো সেখানে৷ দুই বছরের মাথায় এই চিকিত্সাকেন্দ্রটি নদীগর্ভে বিলীন হয়৷ এরপর শুরু হয় তাঁর মানবসেবা হাসপাতাল তৈরির কাজ৷ বর্তমানে এই হাসপাতালে চবি্বশ ঘন্টা চিকিত্সাসেবা দেয়া হয়৷ সপ্তাহে ৩ জন ডাক্তারকে শহর থেকে আনা হয়৷ এখানে ছোট একটি ফার্মেসি রয়েছে৷ সেখান থেকে সামথর্্যবানরা ইচ্ছে করলে ওষুধ কিনতে পারেন৷ আর দরিদ্র রোগীর জন্য সেবা ও ওষুধ ফ্রি৷ ওষুধ বিক্রির লাভের একটি অংশ হাসপাতালের উন্নয়ন তহবিলে জমা করা হয় ৷
হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারী (ডিপ্লোমা) রেনুকা পারভিন জানান, 'আমার বড় বোন ফুলেআরা৷ নিজে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিনা পয়সায় শ্রম দিচ্ছি এখানে৷'
তিনি জানান, বর্ষা ও শীত মৌসুমে চরে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেশি হয়৷ এ ছাড়া ডায়াবেটিস, হাঁপানিসহ নানা ধরনের রোগী আসে এই মানবসেবা হাসপাতারে৷ নাটুয়াপাড়া, তেকানি, ডিগ্রিদরতা, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, খাসরাজবাড়ী, মুনসুরনগর, মেছরা সহ বিভিন্ন চরের লাখ মানুষের কাছে আশার আলো আমিনা-দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতাল৷
হাসপাতালের প্রধান চিকিত্সক (ফুলেআরার স্বামী) ইমাম হোসেন বলেন, 'চারদিকে যখন অন্ধকার নেমে আসে, রাতের আধারে যখন কোথাও যওয়ার উপায় থাকে না, সম্ভব হয় না নদী পাড়ি দেওয়া৷ তখন কেউ অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তার সেবা করার জন্য জেগে থাকি৷ হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা দিতে অনেক অর্থের প্রয়োজন৷ দানশীল মানুষের কাছে কিছু পাচ্ছি৷ কিন্ত তা দিয়ে ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে৷ নানা সমস্য-সংকটের মধ্যেও আমিনা-দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে৷
২৭ ডিসেম্বর ২০১৩
