নারীর ক্ষমতায়ন : যেন প্রদীপের নিচেই অন্ধকার
প্রকাশিত : ১০:২৭ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩ বুধবার | আপডেট: ০৯:৩৪ এএম, ১৭ জানুয়ারি ২০১৪ শুক্রবার
তাসকিনা ইয়াসমিন
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি৷ না কবির এই বাক্যে আমি একটু এডিট করে বলতে চাই এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা দুজনেই যেখানে নারী৷ সত্যি এমন দেশ খুঁজে পাওয়া ভার৷ যেখানে দেশ পরিচালনার ভার এক নারীর হাতে৷ অন্য নারীর হাতে তার কাজের সমালোচনার ভার, ছায়া সরকারের দায়িত্ব৷ আর এই দুই নারীই গত ১৯৯১ সাল থেকে ভাগে ভাগে দেশ চালাচ্ছেন৷ মাঝখানের দুই বছর ছিল, এক এগারোর সরকার৷ এর কিছুদিন দেশ চালিয়েছেন৷
বর্তমানে যে নারীটি দেশ শাসনের দায়িত্বে আছেন, উনি নিজেকে নারীবান্ধব, মানবতাবাদী, জনদরদী এক নেতা হিসেবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন৷ আর তিনি মানবতাবাদী অনেক কাজের মধ্যে সেটি বারবার প্রমাণ দেবার চেষ্টাও করেছেন৷ তিনি ক্ষমতায় আহরণের পরপরই তার মন্ত্রী-সামন্তদের ভীড়ে ঠাঁই দিয়েছেন মোট পাঁচজন নারীকে৷ এদের মধ্যে দুজন নারীকে দিয়েছেন পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব৷ অন্য তিনজনকে দিয়েছেন কৃষি, নারী ও শিশু এবং শ্রমের দায়িত্ব৷ তার আগে এদেশের পূর্ববর্তী সরকারগুলো কেউই পাঁচ-পাঁচ জন নারীকে মন্ত্রীদের ভিড়ে ঠাঁই দেয়নি৷ তাকে অন্তত এ বিচারে তাদের মুখের দাবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা না জানিয়ে উপায় নেই৷ হ্যাঁ, মানছি তিনি নারীবান্ধব৷ ও হ্যাঁ, এখানে বলতে ভুল হয়েছে৷ তিনি কিন্তু তার নারীবান্ধব আচরণের প্রমাণ রেখেছেন এবারের নির্বাচনের সময়ই৷ সেসময় তিনি তার বেশ কিছু নির্বাচনী এলাকায় নারীদের এমপি পদে নির্বাচনের জন্য সুযোগ দেন৷ তার দল ও অন্য দল সব মিলিয়ে ১৯ জন নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য এখন সংসদে আছেন৷ তিনি ক্ষমতায় আসার পরপরই নারীদের দাবির মুখে আগে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ছিল ৩০ জন৷ সেটিকে বাড়িযে ৪৫ জনে উন্নীত করেন৷ এখন সেইসব সদস্যদের সংখ্যা ৪৫৷ যারা আবার বারবার এভাবে নির্বাচিত হতে বিব্রত বোধ করছেন অনেকেই৷ এখন অনেক নারীই দাবি করছেন নারীদের এই সংরক্ষিত আসনেও নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক৷ সেটি তিনি এখনও করবেন কিনা সেটা অবশ্য জানাননি৷ এ নিয়ে নারীদের দাবি উত্থাপন চলছেই৷ তবে, এই নারী সাংসদদের নিয়ে স্পিকার এডভোকেট আব্দুল হামিদের একটি বক্তব্য যোগ করতে চাই৷ তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, নারী সংসদ সদস্যরা নারীদের অধিকার নিয়ে কোন প্রশ্ন সংসদে উত্থাপন করেন না৷ যদি তারা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতেন তাহলে সংসদে নারীদের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতো৷ আবার আপনারা যেসব আইন ঠিক করার কথা বলছেন, এগুলো যদি তারা সংসদে তোলে আর আমি হ্যাঁ, না ভোটের ব্যবস্থা করি তাহলেতো এমনিতেই নারীর অধিকারের পক্ষে যারা তাদের ভোটে সেগুলো হয়ে যাওয়া কথা৷ এখানে নারী সদস্যদের ভোটেই তো অনেক দূর এগিয়ে থাকবে কিন্তু আমি নারী সদস্যদের তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখি না৷
এই নারীবান্ধব নারীর আমলেই সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুই নারী চেয়ারম্যান ভোটে জয়ী হয়েছেন৷ প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের একজন করে ভাইস চেয়ারম্যান নারী নির্বাচন করে জিতেছেন৷ ইউনিয়ন পরিষদ তৃণমূলের নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে-এতে কোন সন্দেহ নেই৷ এতো গেল বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা নারীবান্ধব নারীর নারীর উত্তোরণের পক্ষের কিছু চিত্র৷ তার প্রধান প্রতিপক্ষ যে তাকে এ ব্যাপারগুলোয় পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন-তার প্রমাণ উপরে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করলাম এমন নারীবান্ধব কাজে তিনি কোন ধরণের বিরোধিতা করেননি৷ নিশ্চয় করলে আমরা তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারতাম৷ তাই তাকেও আমি নারীবান্ধব হিসেবেই স্বীকার করছি৷
বাংলাদেশ দেশটি ১৯৭১ সালে এই পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন দেশ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে৷ এখন চলছে সেই স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৪১ বছর৷ এই সময়টা নতুন স্বাধীন হওয়া কোন দেশের জন্য একেবারে খুব বেশি সময়ও নয়৷ আবার একেবারেই কোন অংশেই কম সময়ও নয়৷ বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তালিকায়৷ যদিও আমাদের বিদেশী বন্ধুরা কখনও কখনও আমাদের হাততালি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ অর্থনীতিতে খুব ভাল করছে৷ কিন্তু দিন দিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া এবং বছর বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় তা আমার কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়না৷
এখন আসি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে৷ যেহেতু বর্তমানের দেশপ্রধান নারীবান্ধব৷ তাই তার সময়েই নারীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্য বন্ধে উল্লেখজনক ভূমিকা থাকবে-এটাই আশা করা যায়৷ কিন্তু এখানে ঘটছে উল্টো ঘটনা৷ দেশের মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্যমতে, ২০১২ সালে নারীর প্রতি সহিংসতার হার চরম আকার ধারণ করে৷ ২০১২ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৮০৫ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে৷ এঁদের মধ্যে ২৯৯ জন নারী, ৪৭৩ জন মেয়ে শিশু এবং ৩৩ জনের বয়স জানা যায়নি৷ ঐ ২৯৯ জন নারীর মধ্যে ৩১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ১০১ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ৪৭৩ জন মেয়ে শিশুর মধ্যে ৩৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৮৪ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ এই সময়কালে ১০ জন শিশু আত্মহত্যা করেছেন৷ এর মধ্যে ১৩ জন খোদ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷
অধিকার এর তথ্যানুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৭৯ জন নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন৷ এদের মধ্যে ১৮ জন আত্মহত্যা করেছেন, ০৩ জন নিহত, ২৪ জন আহত, ১৫ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন, ০৯ জন অপহরণের শিকার, ৬৯ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ও ৩৪১ জন বিভিন্ন ভাবে যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন৷ যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটে বা তাদের পরিবারের সদস্যদের আক্রমণে যথাক্রমে ০৭ জন পুরুষ নিহত, ৭৪ জন আহত ও ৪৬ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং ১৪ জন নারী আহত এবং ০৫ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন৷ অধিকার এর তথ্যানুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২২ জন বিবাহিত নারী যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন৷ এঁদের মধ্যে ২৭৩ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে দুই জন নারী বাল্য বিবাহের শিকার৷ এছাড়া ৫৩৫ জন বিবাহিত নারী বিভিনড়বভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যাঁদের মধ্যে দুই জন নারী বাল্য বিবাহের শিকার৷ এই সময়কালে ১৪ জন বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে আত্মহত্যা করেছেন৷ এছাড়া যৌতুক সহিংসতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন পুরুষ নিহত ও ১০ জন পুরুষ আহত হন এবং যৌতুকের কলহের কারণে ০৩ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে ও ০২ জনকে আহত করা হয়েছে৷ অধিকার এর তথ্যানুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০৫ জন এসিডদগ্ধ হয়েছেন৷ এঁদের মধ্যে ৫৮ জন নারী, ১৭ জন পুরুষ, ২০ জন বালিকা এবং ১০ জন বালক৷
অধিকারের এই রিপোর্ট দেখে একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীর ক্ষমতায়নের যে বুলি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন আওড়াচ্ছেন তার ঠিক পুরোপুরি বাস্তবায়ন সমাজে হচ্ছে না৷ হলে নারীদের উপর এমন বিপর্যয় নেমে আসার সুযোগ কম থাকতো৷ আবার নারী যে শুধু একা এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন সেটিও নয়৷ নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সমাজ, পৃথিবী, রাষ্ট্র-এমনটি একাত্তরের বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে৷ এর সুফল কুফল দুটিই দুই লিঙ্গের মানুষ ভাগ করে নিতে হচ্ছে৷
আমাদের নারীবান্ধব নেতা আরও একটি কাজ করেছেন৷ তিনি ১৯৯৭ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে যে নারী উন্নয়ন নীতিটি তৈরি করেছিলেন সেটির আবারও সংশোধিত রূপ নতুন নামে ."জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১" আবারও নারীদের উপহার দিয়েছেন৷ কিন্তু এ নীতিতে তিনি নারীর উত্তরাধিকার ও সম্পত্তিকে ক্ষমতায়নের যে বিষয়টি রেখেছিলেন ৯৭ তে সেটির একটু কাটছাঁট করেছেন৷ তিনি এবার "২৩.৫ ধারায় বলেছেন, সম্পদ, কমৃসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া৷ ২৫.২ ধারায় বলেছেন, উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা৷"
এদেশটি দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তান নামে একটি দেশের অধীনে ছিল৷ কিন্তু সেই দেশটির সঙ্গে এদেশের ধর্মের মিল ছাড়া আর অন্য কোন মিলই ছিলনা৷ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছে৷ কিন্তু আজ ৪১ বছর পরও আমরা দেখছি সে দেশের ফেলে যাওয়া অনেক নারীবিমুখ আইন-কানুন এই সরকার, বিরোধীদল এবং জনগণ মেনে নিচ্ছে৷ যার ফলে বন্ধ হচ্ছে না-নারীর প্রতি নির্যাতন, নিপীড়ন৷ এগুলো বন্ধে সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থানে থেকে কাজ করার ক্ষমতা রাখে দেশের বর্তমান নারীবান্ধব রাষ্ট্রপ্রধান৷ কিন্তু তার দেখা যাচ্ছে, অন্য এত কাজের চাপ যে উনি নারীর জীবন-মান রক্ষার মতো, নারীর মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসু্যতে সময় দিতে পারছেন না৷ তিনি যে নারী নীতিটি করেছেন, তার বাস্তবায়ণ এখনও শুরু করতে পারেননি৷ তিনি নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে একটি আইন করলেও সেটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয় প্রচারে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন৷ তিনি যৌতুকের অভিশাপ থেকে নারীকে রক্ষায় যৌতুক বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি৷ নারীর কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও কর্মমান নিশ্চিত করতে তিনি এখনও দেশটিকে একটি শ্রমবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারেননি৷ এদেশে এখনও প্রতি মুহুর্তে কর্মক্ষেত্রে চাকরি চলে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকছে নারী-পুরুষ সবাই৷ কর্মক্ষেত্রে নায্য মজুরি পাচ্ছেনা বেশির ভাগ মানুষ৷ বেশির ভাগ নারীই অপুষ্টির শিকার৷ নারী এখনও সমাজের দ্বিতীয় লিঙ্গ৷ দেশের আইনে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনে বাংলাদেশের উপস্থাপনে৷ এই দেশের সরকার জাতিসংঘ ঘোষিত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ সিডও তে অনেক আগেই অনুমোদন দিলেও এই নারীবান্ধব সরকার তারা দুটি ধারা থেকে আপত্তি তুলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে৷ এতে করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আগে যে অবস্থানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে৷ তবে, অবশ্য তার উত্তরসূরি ডা. দীপু মনির মতে, এ ধারার আপত্তি না তুললেও ঐ ধারা দুটিতে যা লেখা আছে তার সব বাংলাদেশ পালন করছে৷ যদি তাই হয়, তাহলে আপত্তি তুলতে আপত্তি কোথায়? তাহলে কি, বর্তমান নারীবান্ধব নেতা...?
কন্যাশিশুদের রক্ষার কনভেনশনে বাংলাদেশ অনেক আগেই স্বাক্ষর করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে দেশের কন্যাশিশুদের রক্ষায়৷ অধিকারের রিপোর্ট এর বড় উদাহরণ৷ কন্যাশিশুদের সমাজে-পরিবারে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসনে করা পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন৷ কিন্তু এদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ছাড়াও আরও বেশকিছু ছোট ছোট ধর্মব্যবস্থা রয়েছে৷ তাদের সব ধর্মে আবার কন্যাশিশুর স্বীকৃতি সেভাবে মেলেনি৷ যেহেতু বাংলাদেশ কোন ধর্মীয় আইনের আওতায় চলে না তাই দেশের সকল শিশুকে বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার ঘোষণা করে তার বাবা-মায়ের জীবনে সেই সন্তানের সব ধরণের পূর্ণ অধিকার পাওয়ার অধিকার শিশুর আছে৷ কিন্তু এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আইন শিশুর জীবন-মান-মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে৷ শিশুর জীবন রক্ষা ও তার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবিলম্বে এই নারীবান্ধব দেশ প্রধানের উচিত শিশুবান্ধব উত্তরাধিকার আইন প্রতিষ্ঠা করা৷ যেহেতু তিনি জাতিসংঘে নিজেকে একটি নাগরিকবান্ধব, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যমুক্ত, মানবতাবাদী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রকাশ করতে চান৷
তিনি নারীর ক্ষমতায়নে নারীকে কর্মক্ষেত্রে বেশ কিছু সুযোগ করে দিচ্ছেন৷ তিনি পুলিশ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে, বিচারবিভাগে নারীকে নিয়োগ দিয়েছেন৷ নারী কর্মক্ষেত্রে নারীর আসাকে উত্সাহিত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার বিশেষ কোটার ব্যবস্থা করেছেন৷ কিন্তু সেই নারীর আর্থিক-সামাজিক-পারিবারিক নিরাপত্তা দিতে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন৷ আর এটি ঘটছে শুধু কিছু পারিবারিক বৈষম্যমূলক আইনের কারণে৷ আইনে এদেশে এখনও বিবাহিত নারীর অভিভাবক স্বামী৷ কিন্তু স্বামীর অভিভাবক তার স্ত্রী নয়৷ আবার দুজনের সম্পদের অধিকারের ক্ষেত্রে স্ত্রীর আইনগত অধিকার নেই৷ এতেও লঙ্ঘিত হচ্ছে নারীর প্রকৃত অধিকার৷
পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার ক্ষেত্রেও নারীর প্রকৃত মর্যাদা না থাকা বড় কারণ হিসেবে রয়েছে৷ যে দেশের দেশ প্রধান এত মানবতাবাদী সেই দেশে কি নারীর বৈষম্য সত্যিই মেনে নেয়া যায়?
একটা দেশের রাষ্ট্র হচ্ছে একটা ইন্সটিটিউশন৷ কোন রাষ্ট্র যদি চায় সে তার নাগরিকের সব অধিকার নিশ্চিত করবে সেখানে কারো সাধ্য নেই রাষ্ট্রকে বাধা দেবার৷ সাধারণ জনগণতো রাষ্ট্রের পক্ষেই থাকবে, কারণ এতে তারই লাভ৷ আর কিছু মানুষ সবসময়ই থাকে, যারা শুধু বিরোধিতার খাতিরে রাষ্ট্রের নেয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করে৷ কিন্তু আমাদের নারীবান্ধব রাষ্ট্রপ্রধান সেই বিরোধিতাকারীদের মুখে নারীর উত্তরাধিকার আইনে তার পূর্ণ অধিকার দিলেন না৷ তিনি নারীর সম্পত্তিতে তার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন না৷ যুক্তি দেখালেন নারীরা বাপেরটাও পায়, স্বামীরটাও পায়৷ কিন্তু তিনি খেয়াল করলেন না, পুরুষও বাপেরটা পায়৷ স্ত্রীরটা পায়৷ নারী একজন মানুষ৷ তার প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তার মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দিতে চাইলে তাকে সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার দিতে হবে৷ আর এ দায়িত্ব একমাত্র রাষ্ট্রকেই নিতে হবে৷ আর তিনি যখন নিজেকে নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী নারীবান্ধব দেশপ্রধান হিসেবে মনে করেন অন্য সব শাসকদের চেয়ে তার দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি৷
দেশে যে নারী প্রকৃত অর্থে এখনও মানুষ নয়, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই৷ যদি কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে কেউ সাক্ষী হতে চায় তাহলে পুরুষ সাক্ষী হতে চাইলে দুজন হলেই চলবে৷ কিন্তু নারী সাক্ষী হলে একজন পুরুষ সাক্ষীর বিপরীতে দুজন নারীকে সাক্ষী হতে হবে৷ কত বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের আইন দেখে এর প্রমাণ কি এই আইনটা বহন করে না!
এখনও এদেশে সন্তানকে বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আপত্তি আছে৷ রাষ্ট্রের আইনেও কন্যা সন্তান বাবা-মায়ের প্রকৃত উত্তরাধিকার নয়৷ দেশের কিছু কিছু মানুষ না বুঝেই কন্যা সন্তানকে বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না৷ বেশির ভাগ মানুষই না বুঝে এর বিরোধিতা করে৷ এ বিরোধিতার তালিকায় বেশি পুরুষদের দেখি৷ কিন্তু আমার তাদের বোঝার ভুল দেখে দু:খ হয় যে, তাদের কাছে কি নিশ্চয়তা আছে, যে তার জীবনে পুত্র সন্তানই আসবে৷ আবার ধরে নিলাম তিনি নিজে পুরুষ তার পুত্র সন্তান হলো৷ এবার যদি ঐ পুত্র সন্তানের দুটি কন্যা সন্তান হয়৷ কোন পুত্র সন্তান না আসে তখন উনি ওনার উত্তরাধিকার কার মাধ্যমে রেখে যাবেন! নিশ্চয় ঐ কন্যা দুটির মাঝে৷ আমার এই উদাহরণ দেখে অনেকে বিরক্ত হতে পারেন, যে এখন তো কোন সুশিক্ষিত পরিবার কন্যা-পুত্রের মধ্যে বিভেদ করে না৷ আমার প্রশ্ন অশিক্ষিত পরিবার কি করে? আর যদি পরিবারের আপত্তি না থাকে তাহলে রাষ্ট্রের আপত্তি কোথায়, কেন তবে, আমাদের নারীবান্ধব দেশপ্রধান, নারীবান্ধব বিরোধীদলীয় নেতা কি তাদের নিজেদের পরিবারের দিকে তাকিয়ে একটুও চিন্তা করে দেখবেন না৷ তারা দুই দুই বার করে ক্ষমতায় থাকার পরও যদি তাদের পরবর্তী প্রজন্মের লিঙ্গের ঘাটতির কারণে শুধু নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় করাতেই আইনী লড়াই করতে হয়৷ তাহলে তাদের এত ক্ষমতার ব্যবহার কি কাজে লাগবে আদৌ তাদের জীবনে? প্রশ্নটা আমি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনকেই করতে চাই৷ এখনও সময় আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্লিজ, অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজের বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে এদেশের নারীর প্রকৃত জীবন-মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নিন৷ নইলে আপনার পরবর্তী প্রজন্মকে এর কুফল যে ভোগ করতে হবে৷
যে দেশের দেশ প্রধান এত নারীবান্ধব, নারীর ক্ষমতায়নের কারণে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি মিলছে তার৷ তিনি কেন আজ নারীর ক্ষমতায়নের মূল ক্ষেত্র, তার সম্পদের পূর্ণ অধিকারের সুযোগ দিচ্ছেন না৷ তাহলে কি আমরা ধরে নিতে বাধ্য হব প্রদীপের ঠিক নিচেই অন্ধকার!
লেখক:স্টাফ রিপোর্টার-দৈনিক মানবকন্ঠ
১৮ ডিসেম্বর ২০১৩
