ভ্যাকসিন অনুমোদনের তড়িঘড়ি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:১১ পিএম, ২ সেপ্টেম্বর ২০২০ বুধবার
ছবি: ইন্টারনেট
ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার আগেই দ্রুতগতিতে ভ্যাকসিন অনুমোদনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারকে সতর্ক করছে ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞরা।
ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) কমিশনার ড. স্টিভেন হান ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে জানান, পর্যাপ্ত তথ্য পেলে লেট স্টেজ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হবার আগেই জরুরি ভিত্তিকে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়া হতে পারে।
আর এ-ব্যাপারেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাড়াহুড়ো করে অনুমোদন দেয়া ভ্যাকসিনের প্রভাব কতো বিরূপ হতে পারে তার প্রমাণও আছে অনেক।
বিকল্প ওষুধ পাওয়া না গেলে জরুরি ভিত্তিতে কোনো ওষুধ বা টিকার অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা আছে এফডিএ’র কমিশনারের। তবে, এই ইমার্জেন্সি ইউজ অথোরাইজেশন (ইইউএ) পূর্ণ অনুমোদন নয়, যেকোনো সময় এই অনুমোদন প্রত্যাহার করেও নেয়া যায়।
এই ব্যাপারটিই ঘটেছিল হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন অনুমোদনের ক্ষেত্রে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনের পর ২৮ মার্চ এই দুইটি ওষুধের অনুমোদন দেয় এফডিএ। জুন মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় এই দুইটি ওষুধ কার্যকর নয় বরং কিছুক্ষেত্রে হৃদরোগের আশঙ্কা থাকে। এরপরই এফডিএ অনুমোদন প্রত্যাহার করে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রমাণসহ ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করার পরই ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয় এফডিএ। তথ্য জমাদানের পরবর্তী কয়েক মাস এফডিএ’র উপদেষ্টারা মূল্যায়ন করার পরই মেলে অনুমোদন।
তবে ইমার্জেন্সি ইউজ অথোরাইজেশন (ইইউএ) এর অনুমতি আরও দ্রুত পাওয়া যায়। এফডিএ ইতোপূর্বে একবারই ভ্যাকসিনের জরুরি অনুমোদন দেয়। সৈনিকদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ায় তাদের জরুরি অনুমোদন নিয়ে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় মামলাও করা হয়।
এছাড়া, সবসময়ই সম্পূর্ণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হবার পর ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েক মাস এমনকি বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করা হলেই এর বিরূপ প্রভাব দেখা গেছে।
১৯৫৫ সালের ১২ই এপ্রিল প্রথম পোলিও ভ্যাকসিন অনুমোদনের ঘোষণা আসে। কয়েকদিনের মধ্যেই হাজার হাজার ভ্যাকসিন বানাতে হয়। কাটার ল্যাবস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বানানো ভ্যাকসিনে দুর্ঘটনাক্রমে জীবন্ত পোলিও ভাইরাস থেকে যায়। এরফলে রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে যায়। ২০০,০০০ এর বেশি সংখ্যক শিশুকে টিকা দিয়ে দেয়া হয়, একদিন পরেই ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের সেন্টার ফর দ্য হিস্ট্রি অফ মেডিসিনের পরিচালক ড. হাওয়ার্ড মারকেল জানান, ওই ঘটনায় চল্লিশ হাজার শিশু পোলিও আক্রান্ত হয়, মারা যায় ১০ জন।
১৯৭৬ সালে বিজ্ঞানীরা সোয়াইন ফ্লু মহামারির আশঙ্কা করেন। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ মেডিসিনের অধ্যাপক মাইকেল কিঞ্চ বলেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গেরাল্ড ফোর্ডকে তার উপদেষ্টারা বলেন এই মহামারি স্প্যানিশ ফ্লু এর চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে।
তার নতুন প্রকাশিত ‘বিটুইন হোপ অ্যান্ড ফিয়ার’ বইতে বিভিন্ন ভ্যাকসিনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ফোর্ড সোয়াইন ফ্লু ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেন। সাত মাসের মধ্যে প্রস্তুতকৃত এই ভ্যাকসিন দেয়া হয় ৪০ মিলিয়ন মানুষকে। পরবর্তীতে গিলেন ব্যারে নামক একটি স্নায়ুজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার সাথে ভ্যাকসিনটির সম্পর্ক আছে জানা যায়। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানায়, সোয়াইন ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া ১০০,০০০ জনে ১ জনের গিলেন ব্যারেতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরবর্তীতে এই ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এধরণের বেশ কিছু ঘটনার কারণেই জনসাধারণের মাঝে ভ্যাকসিন নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়। ১৯৫৫ সালে প্রথমবার ভ্যাকসিন দেয়ার পর, ভুলের কারণে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়। তবে, তারপরও পুনরায় ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম শুরু করার পর শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়ান অভিভাবকেরা।
ড. মারকেল জানান, ১৯৫৫ সালের পোলিও ভ্যাকসিনের ঘটনা ও ১৯৭৬ সালের সোয়াইন ফ্লু ভ্যাকসিনের ঘটনার পর থেকেই ভ্যাকসিন সম্পর্কিত আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।
‘এফডিএ জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন অনুমোদন দিলে এটি অত্যন্ত নির্বোধের মতো সিদ্ধান্ত হবে। একটি বাজে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেলেই জটিল হয়ে যাবে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম’, বলেন ড. মারকেল।
এফডিএ কমিশনার হান জানান, ভ্যাকসিনের সিদ্ধান্তে রাজনীতির প্রভাব থাকবেনা, তথ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তবে এব্যাপারে ড. মারকেলের মতোই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক মাইকেল কিঞ্চ। তিনি নিজেই একটি করোনাভাইরাস ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের দ্রুতগতিতে ইইউএ দেয়া হলে বেশ কিছু কারণে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমত, ভ্যাকসিনটি নিরাপদ না হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অনিরাপদ হলে মানুষ পরবর্তীতেও ভ্যাকসিন গ্রহণে অনাগ্রহী হবে। তৃতীয়ত, ভ্যাকসিনটি সম্পূর্ণ ভাবে কার্যকর না হলে জনসাধারণ নিজেদের সুরক্ষিত ভেবে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করবেনা। এছাড়াও, মানসম্পন্ন নয় এমন কোনো ভ্যাকসিন অনুমোদন পেলে পরবর্তীতে মানসম্মত কোনো ভ্যাকসিনের অনুমোদন না-ও মিলতে পারে।
এসকল কারণেই তাড়াতাড়ি জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়া উচিৎ নয় বলে মনে করেন মাইকেল কিঞ্চ। সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
-জেডসি
