ঢাকা, মঙ্গলবার ১১, মে ২০২১ ১:৫০:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

যশোরের ভাষাকন্যা হামিদা রহমানের কথকতা

অপর্ণা আনন্দ

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:১৪ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ বুধবার

যশোরের ভাষাকন্যা হামিদা রহমান

যশোরের ভাষাকন্যা হামিদা রহমান

যশোরে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করা এবং পরিচালনায় নারীনেত্রী হামিদা রহমানের অসামান্য অবদানের কথা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে কাজী আবদুর রউফ যশোরে ভাষা আন্দোলন সংগঠনে সক্রিয় হন। তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এগিয়ে আসেন নারীনেত্রী হামিদা রহমান। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ‘তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের যুক্ত রাষ্ট্রভাষা সাব কমিটি’ নামে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই আলমগীর সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক করে যশোরে ওই সংগ্রাম পরিষদের শাখা গঠিত হয় এবং যুক্ত রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটিতে হামিদা রহমান সদস্য হিসেবে মনোনীন হন।

ব্যক্তিগত জীবন : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হামিদা রহমান ১৯২৭ সালের ২৯ জুলাই যশোরের পুরাতন কসবায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শেখ বজলুর রহমান এবং মা বেগম লুৎফুন্নেছা। ১৯৪২ সালে নোয়াখালীর অধিবাসী সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় তার।

শিক্ষা জীবন : হামিদা রহমান ১৯৪২ সালে যশোর মধুসূদন তারাপ্রসন্ন বালিকা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৭ সালে সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং ১৯৫৮ সালে বাংলায় এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৫৫ সালে রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি পাস করেন।

শিক্ষকতা : ১৯৬৮ সালে লালমাটিয়া গার্লস স্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার শিক্ষকতা জীবনের শুরু। পরবর্তী সময়ে তিনি জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে তিনি পল্টন গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে কলেজের চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোপুরি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন।

ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ : ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে নতুন রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হবে উর্দু এমন যুক্তিতে কোলকাতার আজাদ পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে এমএম কলেজের ছাত্রী হামিদা রহমান ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই সংখ্যায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হবে ‘বাংলা’।

১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের শিক্ষার্থীরাও গঠন করে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ। সেই পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন আলমগীর সিদ্দিকী। আর একমাত্র নারী যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন যশোরের অগ্নিকন্যা হামিদা রহমান।

পরবর্তিতে তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ যশোর জেলার যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব নিয়ে পুরো দেশে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে দেন। ১৯৪৮ সালে ১১ মার্চ দেশব্যাপি হরতাল পালিত হয়। এ সময় যশোরে ওই কর্মসূচি সফল করার জন্য অন্যদের সঙ্গে হামিদা রহমান অগ্রগামী তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। যশোরের ম্যাজিস্ট্রেট নোমানী ১১ মার্চ যশোরে ১৪৪ ধারা জারি করেন।

এদিকে ১১ মার্চ হরতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের প্রতি যশোরের মোমিন গালর্স স্কুলের শিক্ষকরা একমত পোষন করে না। শিক্ষকরা স্কুলের গেট বন্ধ করে দেয় এবং ক্লাস চালু রাখে। এ খবর পাওয়ার পর হামিদা রহমানের নেতৃত্বে মেয়েদের একটি মিছিল মোমিন গালর্স স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে সমবেত হয়। তিনি ও তার সঙ্গিরা লাথি মেরে স্কুলের গেট খুলে ফেলেন।

এ সময় হামিদা রহমানের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রী মোমিন গালর্স স্কুল প্রাঙ্গণে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। স্লোগান দিতে দিতে ছাত্রীরা একটি মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে পরে। ছাত্রী মিছিলটি যশোর কালেক্টর অফিসের সামনে এসে হাজির হয়। এ সময় কোর্টের সামনে দাড়িয়ে হামিদা রহমান সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এ সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তরুণী এই নেত্রী।

এক পর্যায়ে পুলিশ ওই ছাত্রীসমাবেশে বাধা দিতে এগিয়ে আসে। পুলিশ ওই ছাত্রীসমাবেশে লাঠিপেটা করে এবং গুলি চালায়। এতে অনেক আহত হন। হামিদা রহমান আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হন। কিন্তু পুলিশ হামিদা রহমান মনে করে সুফিয়া নামে অন্য একজন মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়।

ওই দিন রাতে যশোর কলেজের ছাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের গোপন বৈঠক বসে। হামিদা রহমান ছেলেদের পোশাক পরে সে বৈঠকে যোগ দেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ১৩ মার্চ হরতাল হবে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য যশোরে ধর্মঘট চালানো হবে।

সিদ্ধান্ত মত ধর্মঘট চলার পাশাপাশি ১৩ মার্চ যশোরে আবারও হরতাল পালিত হয়। হরতাল কর্মসূচি চলাকালীন সেদিন হামিদা রহমানের নেতৃত্বে যশোরে মেয়েদের আর একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি সংগঠিত করতে তাকে সাহায্য করেন রুবি আহমদ ও সুফিয়া খাতুন।

মিছিলটি মোমিন গার্লস স্কুলের সামনে থেকে যাত্র শুরু করে বার লাইব্রেরির সামনে দিয়ে চৌরাস্তা হয়ে কালেক্টরেটর ভবনের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময়ে মেয়েদের মিছিলের পাশাপাশি ছেলেদের আরেকটি বিশাল মিছিলও এখানে এসে সমবেত হয়।

এক পর্যায়ে মিছিলের ছাত্র-জনতা কালেক্টরেট ভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন কোতয়ালি থানার ওসি আবদুল জব্বারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল মিছিলটি প্রতিরোধ করে এবং ওই ভবনে ঢুকতে বাধা দেয়। কিন্তু মিলিছকারীরা সামনে এগোতে চেষ্টা করেন।

এরপর শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ। হামিদা রহমানের নেতৃত্বে মেয়েরা সেই সংর্ঘষে অংশ নেন। জনতার সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলার মধ্যে ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি চলে। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও ছাত্র আহত হন। এক সময় ওসি আবদুল জব্বারের কানে একটি ইটের আঘাত লাগে। তার কান ছিঁড়ে লক্ত ঝরতে থাকে। তিনি মাটিতে পড়ে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ গুলি ছুড়তে শুরু করে। ছাত্র নেতা আলমগীর ছিদ্দীকি এ সময় গুলিবিদ্ধ হন। হামিদা রহমান এবারও রক্ষা পান।

ধর্মঘট একটানা সাতদিন চলে। যশোরের সাধারণ মানুষ তাতে ব্যাপক সাড়া দেয়।

এ সময় পুলিশ হামিদা রহমানকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। তাকে গ্রেপ্তার করতে না পেরে বিভিন্ন থানায় তার নামে ওয়ারেন্ট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পার্টি থেকে তাকে আত্মসমর্পণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ না করে আত্মগোপন করেন এবং পার্টির কার্ড ফেরত দেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে হামিদা রহমান প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারেননি।

সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড : স্কুল ও কলেজে পড়াকালীন সময়ে হামিদা রহমান প্রগতিশীল ধারার ছাত্র আন্দোলনের সাথে কাজ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের মুক্তির প্রশ্নে দৃঢ় নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা রেখেছেন। সমাজসেবা এবং নারীমুক্তি আন্দোলনে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা স্মরণযোগ্য।

যশোরে পুরোনো কসবা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাসহ তিনি বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এই মহান নেত্রী। বাংলাদেশ নারী আন্দোলন সংসদের তিনি সভানেত্রী এবং কার্যকরী সদস্য। তিনি বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সহসভাপতি ছিলেন।

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত লন্ডনে ছিলেন তিনি। এ সময় লন্ডনে দুটি বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। লন্ডন উইমেন্স অ্যাডভাইসরি কাউন্সিলের মেম্বর ছিলেন হামিদা রহমান। হাউস অব লর্ডস এবং হাউস অব কমেন্স-এ তিনি ভাষণ দেয়ার সুযোগ পান।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদান : রাজনীতি ছাড়াও সাহিত্য ও পত্রিকায় লেখালেখির ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। স্কুল ম্যাগাজিনে লেখার মধ্য দিয়েই হামিদা রহমানের সাহিত্যচর্চা শুরু। কলেজ ম্যাগাজিনে তার লেখা ‘সর্বহারা’ ও ‘রিকসাওয়ালা’ শীর্ষক ছোটগল্প দুটি প্রকাশিত হলে সুধীসমাজে লেখক হিসেবে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। যশোর থেকে প্রকাশিত আল মোমিন পত্রিকায় তিনি নারী বিভাগের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত নববানী মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গেও তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ষাট ও সত্তরের দশকে ইত্তেফাকে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ‘বিলকিস বেগম’ ছদ্মনামে লেখা তার বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সাহিত্যিক হামিদা রহমান দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক বেগম, দৈনিক আজাদ, সংবাদ, পূর্বাণী, সাপ্তাহিক সেবা, আজকের কাগজ-এর সাথে লেখা সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ ও বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় স্বাধীনতাযুদ্ধের শহীদদের সম্পর্কে তার গুরুপ্তপূর্ণ তথ্যভিত্তিক লেখা প্রকাশিত হয়।

তার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে, জীবনস্মৃতি, নীল চুড়ি, বেনারসী, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও তার বিকাশ, অধিকার আন্দোলনে নারী সমাজ, নারীর নৈর্বাক্তিক কান্না, বিলেতের চিঠি, নীড় হারা পাখি, নীলচুড়ি, স্বাতী, শাহী মহল।

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে হামিদা রহমান সেখানে দুটি বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সেখানে উইমেন্স অ্যাডভাইসরি কাউন্সিলের মেম্বর ছিলেন। হাউস অব লর্ডস এবং হাউস অব কমেন্স হামিদা রহমান বক্তৃতা দেওয়ার দুলর্ভ সম্মান লাভ করেন।

সমাজসেবা এবং নারীমুক্তি আন্দোলনে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা স্মরণযোগ্য। যশোরে পুরোনো কসবা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাসহ তিনি বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ নারী আন্দোলন সংসদের তিনি সভানেত্রী এবং কার্যকরী সদস্য। বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ এবং বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য তিনি। তিনি বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সহসভাপতি ছিলেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তার দুই ভাই শহীদ হন।

মৃত্যু : হামিদা রহমান ২০০৫ সালের ১৪ আগস্ট ৭৮ বছর বয়সে ঢাকায় নিজ বাসায় মৃত্যুবরণ করেন।