ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১৩:১৯:০৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

গণমাধ্যম ও ইভটিজিং : আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

প্রকাশিত : ০৬:৪৯ এএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৩ সোমবার | আপডেট: ০৬:৫৭ এএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৩ সোমবার

টিভি খুললেই, 'তোমার জন্য মরতে পারি ও সুন্দরী তুমি গলার মালা' কিংবা 'তুমি নামটা বলে যাও' গান গেয়ে গেয়ে পুর্ণিমার পেছনে পেছনে সজলের দৌড়ানো, বুড়ো এ্যান্জেলিনা জোলিকে দেখিয়ে ডাউন লোড কর গরম গরম', ' থান্ডারের, এ পাড়ায় নতুন নাকি?' এরকম বিভিন্ন বিজ্ঞাপন আমরা প্রতিদিন টেলিভিশনে দেখে থাকি৷ বাড়ির ২ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছর বয়সী পরিবারের সদস্যরা একসাথে বসে এসব বিজ্ঞাপন দেখা হয়৷ বড়দের পাশাপাশি শিশু-মনেও দাগ কাটে বিজ্ঞাপন গুলো ৷ অবচেতন মনে যেন গেঁথে যায় বাড়ী, সোনার গয়না, বিস্কিট, চিপস , কোক কিংবা ফ্রিজ দিলেই মেয়েরা বন্ধু হয়৷ হাত বাড়ালেই তাদের পাশে পাওয়া যায়৷ সুপ্রিয় পাঠক মনে কি হয়না এ ধরনের বিজ্ঞাপনগুলো মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার জন্য একটু হলেও প্রভাব বিস্তার করছে ? প্রিয় অভিনেতা যখন রাস্তা ঘাটে একটা মেয়েকে প্রেম নিবেদন করে, তার জন্য ফুল পাঠায়, মোটর সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, পাশ দিয়ে হেটে গেলে ফুল ছুঁড়ে মারে তখন নাটক- সিনেমার নায়িকারা হেসে কুটি কুটি হয় ৷ দর্শকরাও তাই দেখে বিষয়টি অতি স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিয়ে অনেকেই এই আচরণ তাদের বাসত্মব জীবনে প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেন৷ রোমিওদের ভীড় বাড়ে মেয়েদের স্কুল কলেজ গুলোর সামনে৷ মেয়েদের টিজ করাটা তারা ফ্যাশন বা হিরোর পযর্ায়ে ফেলে নিজেকে নায়ক রুপে কল্পনা করে৷ পরিবারের মযর্াদা চিনত্মা না করে তারা তখন ভাবে সিনেমা নাটকে তো বড়লোকের মেয়ের সাথে গরীবের ছেলে কিংবা বড়লোকের ছেলের সাথে গরীবের মেয়ের প্রেম, বিয়ে তো হয়৷ তারটাও হবে৷ তাদের ভাবনায় তখন থাকেনা নাটক নাটকই গল্প গল্পই৷ সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি সিনেমা বা নাটকে নায়িকার কাছ থেকে প্রত্যাখাত হলেই বা একটু দু:খ পেলেই নায়ক মদ খেয়ে তা ভোলার চেষ্টা করে৷ যায় যৌন কমর্ীদের কাছে৷ বাংলা হিন্দী প্রায় সব সিনেমাতেই তাই৷ যদিও বা শেষে নায়িকা তার প্রসত্মাবে রাজী হলে মদ খাওয়া ছেড়ে নায়ক ভালো হওয়ার চেষ্টা করে৷ এই ধরনের অভিনয় একজন কিশোরকেও অনেক সময় ভাবায়৷ কিশোর বয়সে প্রত্যাখাত হলে সেও তখন হাতে তুলে নেয় রঙিন পানীয়৷ বন্ধুদের আড্ডায় বসে পরিকলপনা চলে মেয়েটিকে অপহরনের কিংবা জোর করে বিয়ে করার৷ বাহবা পাওয়া কিংবা হিরো হওয়ার আশায় সে থাকে বিভোর৷ যখনই তা থেকে বঞ্চিত হয়৷ তখনই সে করে ধংসাত্বক আচরন৷ প্রেমে প্রত্যাখাত হলেই কেন মদ খেতে হবে নায়ককে ? মেয়েটারও তো পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে ? কেন সে বিষয়ে ভাবা হয়না ? মিডিয়ায় কেন বেশী করে ওঠে আসে না সাহসী মেয়েদের কাহিনী ? রাসত্মা দিয়ে বই বুকে নিয়ে মাথা নিচু করে চলা, কেউ কিছু বললে উত্তর না দেয়া, বখাটেদের ভয়ে পালিয়ে আসা , নিজেকেই দোষী মনে করা, এই ধরনের চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসা দরকার৷ 'নারী অবলা', 'নারী পণ্য', 'নারী পরগাছা', 'নারী লতা', 'নারীর মেধা নয় নারী সৌন্র্দয্যই আসল' এই ধরনের ডায়ালগ বন্ধ করা দরকার৷ দরকার বিলবোর্ড গুলোতে মডেলদের মার্জিত পোশাকের ব্যবহার৷ বিজ্ঞাপন দাতা, নিমর্াতা, চিত্র পরিচালক ও প্রযোজকদের এ বিষয় গুলো নিয়ে ভাবার অনুরোধ জানাচ্ছি্ ৷ ইদানিং কালে আমাদের দেশের কিছু নিমর্াতার নাটকে দেখা যায় বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করার শিৰা, একই সাথে তিন চারজন ছেলে/ মেয়ের সঙ্গে ডেট করা, ফোনে অনবরত মিথ্যা কথা বলা, পাড়ার মেয়েদের সমর্্পকে খোজ খবর নেয়া, চিটিংবাজী করার বিষয় গুলো খুব পজিটিভ ভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে৷ প্রতিনিয়ত এসব অনৈতিক কর্মকান্ডের কাহিনী দেখতে দেখতে তা আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে৷ তৈরী হচ্ছে মেয়েদের সস্তা ভাবার প্রবনতা৷ আর তাই বখাটেদের হামলার শিকার হয়ে ক্রমশ বাড়ছে মৃতু্যর ঘটনা৷ সিমি গেছে, গেছে তৃষা রুমি মহিমা ফাহিমা, রুপালীর মতো প্রতিভাবান মেয়েরা৷ কাল যে আমার আপনার মেয়ে যাবেনা তার নিশ্চয়তা কি ? কি শিখাচ্ছি আমরা আমাদের উত্তরসুরিদের ? ইভটিজিং বন্ধ করতে না পারলে চাঁপা রানী ভৌমিক আর শিৰক মিজানুর রশীদের পরিবারের কাছে কি জবাব দেব আমরা ? গণমাধ্যম নৈতিকতা, মুল্যবোধ তৈরীর ৰেত্রে অনেক বড় একটা শিক্ষার জায়গা৷ তাই এ মাধ্যমে কর্মরতদের জেন্ডার সেনসিটিভ হওয়া সবচে বেশী জরুরী৷ নারীদের পণ্য নয় মানুষ হিসেবে মুল্যায়ন করা দরকার৷ এ জায়গাটায় মনে হয় আমাদের ভাবতে হবে৷ নাটকে কিংবা বিজ্ঞাপনে মেয়েদের ইতিবাচক চরিত্র তুলে ধরা হয় তাহলে তার প্রভাব পড়বে তরম্নন বা কিশোর ছেলেটির মনে৷ এৰেত্রে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন৷ আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে সনত্মানরা টিভি রেডিও ইন্টারনেট বা পত্রিকা থেকে কি দেখছে, শিখছে বা জানছে তা খোঁজ করা দরকার৷ শুধু বাণিজ্যিক কারণে নয় সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে যদি গণমাধ্যমকে ব্যবহার না করা যায় তবে সামনে রয়েছে আরও সর্বনাশ৷ আহমেদ মুশফিকা নাজনীন সিনিয়র নিউজরুম এডিটর-একুশে টেলিভিশন