ঢাকা, সোমবার ১০, মে ২০২১ ২:০৫:২০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী বেগমের যুদ্ধকথা

অনু সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:০৫ পিএম, ৫ এপ্রিল ২০২১ সোমবার

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী বেগমের যুদ্ধকথা

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী বেগমের যুদ্ধকথা

ফেরদৌসী বেগম৷ একাত্তরের উত্তাল সময়ে মাত্র ১৬ বছর তার। অগ্নিঝরা এই দিনগুলোতে কখনো অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে, কখনো আহত মুক্তিসেনাদের সেবা করে কেটেছে তার দিন।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বাবার নাম গোলাম সরওয়ার মোল্লা৷ মা হামিদা খাতুন৷ ১৯৫২ সালের ১৬ জানুয়ারি মাগুরায় জন্ম৷ ১৯৬৯ সালে বিয়েসূত্রে যশোরে পাড়ি জমান ফেরদৌসী৷ স্বামী হাসনুল করিম কামাল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা৷ স্বামীর উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় নিজেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন ফেরদৌসী৷

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় কলেজ ছাত্রী ফেরদৌসী বেগম৷ সরাসরি বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। তার সঙ্গে যশোরের আরো কয়েকজন নারী ছিলেন৷ তবে যুদ্ধের কৌশলগত কারণে পুরুষ যোদ্ধাদের পেছনে দ্রুত সরে আসার সময় নারীদের সমস্যা হতো৷ তাই পরবর্তীতে নারীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়৷ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা ও শুশ্রূষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের৷

যুদ্ধের শুরুর দিকের একটি ঘটনা তুলে ধরে ফেরদৌসী বেগম বলেন, যশোর সেনানিবাসে পাকসেনাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল যশোরের মুক্তিযোদ্ধারা৷ কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যথেষ্ট অস্ত্র না থাকায় তিনদিনের মাথায় পাকসেনারা ভারি সাঁজোয়া যান নিয়ে সেনানিবাস থেকে বের হয়ে আসে৷ গোটা শহরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে৷ আগুন ধরিয়ে দেয় বহু ঘর-বাড়ি ও স্থাপনায়৷

তিনি আরও বলেন, সেসময় আমাদের সাথে থাকা হেলেনা আপা রাজাকারদের সহায়তায় পাকসেনাদের হাতে পড়ে যায়৷ আমরা দূর থেকে দেখতে পেলাম, হেলেনা আপাকে জনসম্মুখে ধর্ষণ করল, নির্যাতন করল। শুধু তাই নয় তাকে গাড়ির পেছনে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গেলো৷ মোহাম্মদপুর থেকে মাগুরা পর্যন্ত প্রায় আট থেকে দশ কিলোমিটার নিয়ে গেলো তাকে৷ সেখানে গিয়ে হেলেনা আপাকে গুলি করে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিলো শয়তানগুলো৷ এই কঠিন দৃশ্য দেখার পর থেকে আমাদের নিজেদের অবস্থা কল্পনায় ভেসে উঠতো৷

ফেরদৌসী বেগমের শ্বশুর বাড়িতেই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প৷ দুই ঘর ভর্তি অস্ত্র রাখা ছিল৷ সেগুলো দেখা-শোনা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল তার উপর৷ একদিন পাক সেনারা সে বাড়িতে আক্রমণ চালায়৷ সেদিন বাড়ির সামনে তার শ্বশুর পাহারায় ছিলেন৷ সেনারা প্রথমে তাকে বেত দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে আহত করে৷ তারপর তারা বাড়ি-ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়৷ পাশেই ছাপাখানা ছিলো৷ সেটাও জ্বলে-পুড়ে যায়৷ সেদিন বাড়ির পেছনে পাটক্ষেতে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে যান ফেরদৌসী বেগম ও অন্যান্যরা৷

আরেকদিনের সরাসরি যুদ্ধের কথা তুলে ধরেন ফেরদৌসী৷ তিনি বলেন, আমার স্বামী এলএমজি নিয়ে গুলি করে যাচ্ছেন৷ আর আমি তার পাশে থেকে গুলি সরবরাহ করছি৷ সেদিন বিরোধী শিবিরের ৬৪ জন নিহত হয়েছিল৷ এক পর্যায়ে আমার স্বামী আহত হন৷ আমাকে তিনি সরে যেতে বলেন৷

তিনি আরও বলেন, আমি অন্ধকারে পাশে ঝোঁপের আড়ালে চলে গেলাম৷ কিছুক্ষণ পর দেখি কয়েকজন পাকসেনা এসে ওনার গায়ে বুট দিয়ে আঘাত করছে। অন্ধকারে তারা মনে করলো উনি মারা গেছেন৷ কিছু না বলে চলে গেলো শয়তানগুলো৷ এরপর থেকে আমার স্বামীসহ আহত অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষা করে কাটিয়েছি মুক্তিযুদ্ধের ভয়ংকর দিনগুলি৷

দেশ স্বাধীন করার পরও দেশ ও জাতির সেবা থেকে পিছিয়ে আসেননি ফেরদৌসী বেগম৷ যশোর পৌরসভায় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ এখনও সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছেন সমাজসেবার সাথে৷

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, দেশের জেলায় জেলায় যেসব মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কিংবা ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় করা হয়েছে৷ তবে তাদের কার্যক্রমের দিকেও সরকারের আরো দৃষ্টি দিতে হবে৷ দেখা যাচ্ছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এখনও অসহায়, দরিদ্র এবং দুঃসহ জীবন যাপন করছেন৷