ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১৩:১৯:০৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

নারীর জন্যে বিকল্প গণমাধ্যম কেন প্রয়োজন

প্রকাশিত : ১০:৪১ এএম, ৫ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার | আপডেট: ১১:৩৫ এএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৩ রবিবার

Sajeeb-Sarker-ssসজীব সরকার: রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (বেগম রোকেয়া) পুরুষ ও নারীকে একই গাড়ির সামনের ও পেছনের চাকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর এই তুলনার উদ্দেশ্য ছিলো সমাজ উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হিসেবে নারীর উন্নয়নের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা। গত কয়েক দশকে নারী ও নারীর উন্নয়নের গুরুত্ব অনুভূত হয়েছে ঠিক, কিন্তু সে অনুযায়ী যথেষ্ট ও যথাযথ উদ্যোগ পর্যাপ্ত চোখে পড়েছে-এমনটি বলা যাবে না। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, গণমাধ্যম সমাজ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। কিন্তু অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মতো এখানেও পুরুষের সংখ্যাধিক্য ও প্রাবল্য অনিবার্যভাবেই সুপ্রতিষ্ঠিত। এমন ব্যবস্থায় এ ধরনের মাধ্যমে নারীবিষয়ক ইস্যুগুলোকে ‘নারীর চোখে দেখা’ বা নারীর মতো করে অনুভব করার বিষয়টি বাস্তবিকই অসম্ভব। এটি অনস্বীকার্য যে, গণমাধ্যম সাধারণ মানুষ ও নীতি-নির্ধারকদের হাতে ‘এজেন্ডা’ তুলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, নারী ও নারীবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সবসময়ই এই এজেন্ডার বাইরে থেকে যায়। গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সূচিত পরিবর্তনগুলোর কারণে প্রায়ই নারী ও সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে আলোচনা-সমালোচনার বিষয় হতে দেখা যায়। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, সেগুলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গৃহীত বা বাস্তবায়িত হয় খুব কমই। এর অন্যতম দুটি কারণ হলো:এক. পুরুষতন্ত্রের কাঠামোতে গড়ে ওঠা ও বিকাশমান গণমাধ্যমে নারীর অনুপস্থিতি এবং দুই. নারী যতটুকুই বা উপস্থাপিত হয়, তার প্রায় সর্বাংশই হয় একেবারেই পুরুষের প্রয়োজনের আদলে। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, গণমাধ্যমে নারীর উপস্থিতির একটি একরৈখিক ধারা রয়েছে; এসব মাধ্যমে পুরুষের বিপরীতে নারীর উপস্থিতির হার একেবারেই নগণ্য এবং যতটুকু উপস্থিতি দেখা যায়, তা মূলত নারীকে দুর্বল, করুণার যোগ্য ও পুরুষের প্রয়োজন মেটানোর সামগ্রী হিসেবেই তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত প্রতিটি তত্ত্ব দাবি করে যে, এই পক্ষপাতদুষ্ট বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সমাজের উন্নয়ন অসম্ভব। কিন্তু কে দায়িত্ব নেবে এই বৃত্ত ভাঙ্গার? অবশ্যই গণমাধ্যম। কিন্তু এটি প্রমাণিত যে, মূলধারার গণমাধ্যম এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের অনেকেই দেখিয়েছেন, ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’-সহ নানা কারণে সর্বজনীন চরিত্রটি হারিয়ে বিশেষ করে মূলধারার গণমাধ্যম বিশেষ একটি শ্রেণীর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট তথা মূলত একটি ‘শ্রেণীমাধ্যম’ হয়ে ওঠে। সবার সঙ্গে তুলনায় এলে এই শ্রেণীটি হয় সমাজের বিত্তশালী ক্ষমতাশীল অংশ। আর নারী-পুরুষ বিবেচনায় অর্থ-প্রতিপত্তি নির্বিশেষে পুরুষেরা হয়ে যায় সুবিধাভোগী এই শ্রেণী। এমন একটি বাস্তবতায় নারী তথা সমাজের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে সবার আগে গণমাধ্যমের চরিত্রের সংশোধন প্রয়োজন। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে একেবারে নতুন আদল দেয়া সত্যিই বেশ কঠিন ও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ। আর বিদ্যমান বাস্তবতা ও কাঙ্খিত পরিবর্তন-এই দুইয়ের মাঝে এই যে একটি শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেখানেই চলে আসে একটি বিকল্প মাধ্যমের (অল্টারনেটিভ মিডিয়া) প্রয়োজনের কথা। মূলধারার গণমাধ্যমের বিপরীতে বিকল্প গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা সবসময় সব স্থানেই অনুভূত হয়েছে। তবে তা স্বীকৃত হতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু এজন্যে থেমে থাকলে চলে না, পথচলা ধরে রাখতেই হয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করলে এটি স্বীকার করতেই হয়, এ দেশের নারীদের কথা তুলে ধরার জন্যে একটি বিকল্প কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই। দেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় দুটি রাজনৈতিক দলের প্রধানরা নারী। দেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার একজন নারী। সংসদের উপনেতা একজন নারী। দেশের বহু প্রতিষ্ঠানের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। অথচ এই দেশেরই গণমাধ্যমে নারী সংবাদ হয় ধর্ষণের শিকার হলে বা ভবনধসে মারা গেলে। বিনোদন পাতায় নারী সংবাদ হয় পুরুষের জন্যে ‘মুখরোচক’ ও ‘আকর্ষক’ বস্তু হিসেবে। নারীর সাফল্য পত্রিকার খবর হয় খুব কম। যদিও বা হয়, সেখানে থাকে তার জীবন সংগ্রামের নির্মম কাহিনী যা নারীর সামর্থ্যকে আড়াল করে তাকে পুরুষ পাঠকের করুণায় সিক্ত করে। আর যেখানে নারীর বঞ্চনা উঠে আসা দরকার, সেখানে মনোযোগ না দিয়ে গণমাধ্যমের দৃষ্টি পুরুষ পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্যে নারীকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা ও উপস্থাপন করা। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ লরা মালভি বহু আগেই দেখিয়েছেন, গণমাধ্যমগুলো কীভাবে (পুরুষ) দর্শকদের চোখের তুষ্টি নিশ্চিত করতে নারীকে যেন-তেন-প্রকারেণ পুরুষের ভোগের সামগ্রী হিসেবে উপস্থাপন করে। এই যেখানে বাস্তবতা, যৌক্তিক উদারতার যেখানে সঙ্কট, সেখানে নারীর চোখে নারীকে দেখতে বা নারীর চোখে বিশ্বকে দেখতে হলে নারীর প্রতি সত্যিকার অর্থেই শ্রদ্ধাশীল ও নারীবান্ধব একটি বিকল্প ও বিশেষায়িত মাধ্যম আজ অনেক বেশি প্রয়োজন। এই অবস্থাটি থেকে উত্তরণের জন্যে নারী ও নারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইসু্যুগুলোকে নির্মোহভাবে তুলে ধরতে এ ধরনের একটি বিকল্প মাধ্যমের গুরুত্ব অনেক। কেননা এ ধরনের মাধ্যমই নারীর বিদ্যমান বিস্মৃতপ্রায় ও পিছিয়ে পড়া অবস্থাটি সবার সামনে তুলে ধরতে পারে যথাযথ গুরুত্বসহ। আর এটিই ক্রমান্বয়ে পথ দেখাতে পারে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে : তাদের কী দায়িত্ব ছিলো, তারা কী করছে আর সমাজকে তারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই বিভিন্ন সময় নারীর জন্যে আলাদা উদ্যোগের নেতিবাচক সমালোচনা করেন। তাদের বক্তব্য হলো, এভাবে আলাদা ব্যবস্থার মাধ্যমেই বরং নারী-পুরুষ বিভেদ করা হয়। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না, শত-সহস্র বছরের চেষ্টায় নারীকে যতোটা পেছনে ফেলা হয়েছে, কয়েকদিনের চেষ্টায় নারীর পক্ষে সেই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব নয়। তাই সবসময় সবক্ষেত্রেই, প্রয়োজন হলেই নারীকে তথাকথিত ‘কোটা’; বা নারীর জন্যে ন্যায্য অগ্রাধিকার দিতেই হবে। আগে অতীতের দূরত্ব ঘুচবে, তারপর নারীরা পুরুষের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটবে; যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে সামনে এগিয়ে যাবে, নয়তো আবারো পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত নারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নেয়ার সব প্রচেষ্টাকেই উদারচিত্তে সাধুবাদ জানাতেই হবে। সজীব সরকার: স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক এবং গবেষক।