ঢাকা, বুধবার ০৪, আগস্ট ২০২১ ২:০৮:২১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

কমলা ভট্টাচার্য বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র নারী ভাষা শহীদ

অনলাইন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:০৩ পিএম, ১৯ মে ২০২১ বুধবার

কমলা ভট্টাচার্য বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র নারী ভাষা শহীদ

কমলা ভট্টাচার্য বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র নারী ভাষা শহীদ

কমলা ভট্টাচার্য মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। ১৯৬১ সালের ১৯ মের কথা। ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার তৎকালীন অবিভক্ত কাছাড় জেলার শিলচরে বাংলা ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলন চলছে। ঠিক এ সময় শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে পুলিশের গুলিতে ১১ জন বাঙালি নিহত হন। ভাষার দাবিতে আত্মোৎসর্গকারী সেই ১১ বাঙালি বীর সন্তানের মাঝে একজন ছিলেন নারী। কমলা ভট্টাচার্য নামে মাত্র ষোল বছর বয়সী এই নারী বাংলা ভাষাকে আসাম রাজ্যের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

কমলার জন্ম ১৯৪৫ সালে, আসামের সিলেট (শ্রীহট্টে)। রামরমণ ভট্টাচার্য ও সুপ্রবাসিনী দেবীর সাত সন্তানের পঞ্চম সন্তান হলেন কমলা। কমলারা ছিলেন তিন ভাই ও চার বোন। চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবেই তার বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটতে থাকে কমলার পরিবারের। 

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এক বিতর্কিত গণভোটের মাধ্যমে আসামের শ্রীহট্ট সিলেট (শ্রীহট্ট) জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কমলারা পাকিস্তানেই থেকে যান। কিন্তু ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের সার্বিক গণহত্যা আরম্ভ হলে তার রেশ সিলেট (শ্রীহট্টে)ও এসে পড়ে। কমলার পরিবার শরণার্থী হিসেবে আসামে চলে আসতে বাধ্য হন। তারা সিলেট পার্শ্ববর্তী আসামের কাছাড় জেলার শিলচরে এসে আশ্রয় নেন।

শিলচরে কমলারা থাকতেন শিলচর পাবলিক স্কুল রোডের একটি ভাড়া বা[ড়িতে। কমলার বড় বোন বেণু নার্সের চাকরি পেয়ে শিমূলগুড়ি চলে যান প্রশিক্ষণ নিতে। কমলার মেজ বোন প্রতিভা ছিলেন শিক্ষিকা। কমলার পরিবার তার মেজ বোনের আয়ের উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। 

শৈশবে কমলা ভর্তি হন শিলচরের ছোটেলাল শেঠ ইন্‌ষ্টিটিউটে। কিন্তু স্কুলের বই কেনার ক্ষমতা ছিল না কমলার। কমলা একবার বড় বোনকে বেণুকে একটি অভিধান কিনে দিতে বললে তিনি সেটা কিনে দিতে পারেননি। কমলা তার সহপাঠীদের কাছ থেকে পাঠ্যপুস্তক ধার করে তার বিষয়বস্তু খাতায় টুকে নিতেন। ১৯৬১ সালে কমলা ম্যাট্রিক পরিক্ষায় বসেন। তার ইচ্ছা ছিল পারিবারিক আর্থিক অনটন সত্ত্বেও তিনি স্নাতকস্তর পর্যন্ত পড়বেন। ম্যাট্রিকের পর তিনি টাইপরাইটিং শিখবেন বলে মনস্থির করেন।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঠিক পরের দিন শিলচর রেল স্টেশনে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার দাবীতে একটি পিকেটিংয়ের ডাক দেওয়া হয়। সেদিন সকালে, অর্থাৎ ১৯ মে সকালে কমলাও পিকেটিং-এ যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। সকালে স্নান করে মেজ বোনের জন্য রাখা শাড়িটা পড়ে নেন কমলা। মেজ বোন পিকেটিং-এ যেতে বারণ করলেও শোনেন না কমলা। 

এমন সময় ২০-২২ জনের একটি মেয়েদের দল কমলাদের বাড়িতে আসে কমলাকে নেওয়ার জন্য। কমলার মা উদ্বেগ প্রকাশ করলে তারা কমলার মাকে বুঝিয়ে রাজি করেন। 
কমলার মা কমলাকে এক টুকরো কাপড় দেন কাঁদানে গ্যাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। কমলার সাথে বেড়িয়ে পড়ে কমলার ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল এবং বড় বোনের ছেলে বাপ্পা। 

দুপুরবেলা কমলার মা দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন রেল স্টেশনে। বকুল ও বাপ্পাকে একবার পুলিশে ধরেছিল আবার ছেড়েও দিয়েছে। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসেন কমলা, মায়ের পা ধুয়ে দিয়ে, শরবত খেতে দেন। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা নিবারণ করে মাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

সেদিন সকালে রেল অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়। যদিও অবস্থানের সময়সূচি ছিল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা, কিন্তু শেষ ট্রেনটি ছিল বিকেল ৪টা নাগাদ, যার পড়ে গণ অবস্থান স্বভাবতই শিথিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই আসাম রাইফেল্‌সের জওয়ানরা জায়গাটাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বেলা ২-৩৫ নাগাদ বিনা প্ররোচণায় তারা অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের কুঁদো দিয়ে পেটাতে থাকে। এলোপাথারি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ও দিকবিদিকজ্ঞানশুন্য হয়ে যে যেদিকে পারে পালাতে থাকে। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির ঘায়ে মাটিতে পড়ে যান। তিনি সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকেন। ইতমধ্যে আসাম রাইফেল্‌সের জওয়ানরা পলায়নরত জনতার উপর গুলিবৃষ্টি শুরু করে। 

মঙ্গলাকে বাঁচাতে কমলা ছুটে গেলে একটি গুলি তার চোখ ভেদ করে তার মাথা চুরমার করে দেয়। অন্যন্য আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থানকারীদের সাথে কমলাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখনেই তার মৃত্যু হয়। 

মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যান।

এই ঘটনার পর আসাম সরকার বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। কমলা ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর তার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, সেখানে মেধাবী শিক্ষার্থী কমলা ভালোভাবেই পাশ করেন। পরীক্ষার পর তিনি টাইপ রাইটিং শিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার সেই ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়।

কমলা ভট্টাচার্যের স্মরণে শিলচর পাবলিক স্কুল রোডের নাম করা হয় 'কমলা ভট্টাচার্য রোড'। এছাড়াও ২০১১ সালে আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সু্বর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে তার স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউটে কমলা ভট্টাচার্যের একটি আবক্ষ ব্রোঞ্জনির্মিত ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়।