অভিবাসী নারী শ্রমিকরা ভালো নেই
প্রকাশিত : ০৬:২০ এএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৩ সোমবার | আপডেট: ০৫:২১ এএম, ১৯ নভেম্বর ২০১৩ মঙ্গলবার
সোমা দেব, উইমেননিউজ২৪.কম
ঢাকা : বাংলাদেশী অভিবাসী নারী শ্রমিকরা ভালো নেই৷ ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে গিয়ে যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের দুর্দশার শিকার হচ্ছেন তারা৷ শারীরিক নির্যাতন, হুমকি-হয়রানি ও বেতনবৈষম্য তো আছেই, সেইসঙ্গে খুনের শিকারও হচ্ছেন অনেকে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলোতে এ সমস্যা বেশি৷ এসব দেশের মধ্যে লেবানন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও মালয়েশিয়া অগ্রগণ্য৷ সহিংসতার শিকার নারীর মধ্যে ৮৭ ভাগই বাংলাদেশের স্থানীয় দূতাবাস বা মিশন থেকে কোনো সহযোগিতা পান না৷
সমপ্রতি কাতার থেকে কোনভাবে বেঁচে ফিরে আসা কুলসুম আক্তার ও আছিয়া বেগমের বর্ণনায় বেরিয়ে আসে এমন চিত্র৷
কাতার থেকে ফিরে আসা ফরিদপুরের কুলসুম আক্তার জানান, মাত্র কয়েক মাস আগে গার্মেন্টসে কাজের কথা বলে তাকে কাতাওে পাঠানো হলেও তার কাজ হয় গৃহকর্মী হিসেবে৷ কিন্তু মালিকের বাড়িতে অন্যান্য পুরুষ সদস্যের অশোভন আচরণের কারণে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি৷
তিনি জানান, শুধু গৃহকর্তার বাড়িতেই নয়, ফিরে আসার অপেক্ষায় আটদিন এজেন্সি অফিসে থাকাকালেও প্রতিদিনই নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে৷
তিনি বলেন, এজেন্সির পুরুষ কর্মীরাই নয়, নারী কর্মীদের দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন তিনি৷
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আছিয়া বেগমকেও একই ধরণের ঘটনার শিকার হতে হয়েছে৷ নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায় তার শরীরেও৷ নির্যাতনের কারণে তার ডানপাশের চোখে জমাট হয়ে রয়েছে রক্ত৷ তিনি জানান, পারিশ্রমিকের কোনো টাকা ফেরত আনতে পারেননি৷
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তার অভাবে সম্ভাবনাময় এই ক্ষেত্রটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই৷ অনেকেই নিরাপত্তার অভাবে দেশের বাইরে গিয়ে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহ হারাচ্ছেন৷ ফলে জনশক্তি রপ্তানির এই ক্ষেত্রটি থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স আসার সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ৷ সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসছেন নারী শ্রমিকরা৷
আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) তথ্য মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৩৫ ভাগ নারীই সহিংসতা, নির্যাতনসহ নানা সমস্যার শিকার হচ্ছেন৷ নির্যাতনের পর তারা চিকিত্সাও পাচ্ছেন না৷ তাছাড়া দালালদের মাধ্যমে বেশি টাকা খরচ করে বিদেশ গিয়ে শ্রমজীবী নারীরা বেতন কম পাচ্ছেন৷ এজন্য বছরের পর বছর নারী অভিবাসী শ্রমিক সংখ্যা কমে যাচ্ছে৷ নানা সমস্যার পর দেশে ফেরত আসা অন্তত অর্ধেক নারীকেই পুনর্বাসন করা যাচ্ছে না৷ দেশে ফিরে এসে ওইসব নির্যাতিত নারী শ্রমিক ট্রাভেল এজেন্ট, কর্মস্থলের ঠিকানা ও মালিকের নাম দিতে না পারায় তাদের জন্য কোনও পদক্ষেপ নেয়াও সম্ভব হয় না৷ সূত্র মতে, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ নারী শ্রমিক বিদেশে যান কোনও দালাল, আত্মীয়ের মাধ্যমে৷ বিদেশে গিয়ে তারা কি কাজ করবেন তার কোনও দিকনির্দেশনা থাকে না৷
এ প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রবাসী নারীদের পুরুষদের চেয়ে বেশি সমস্যায় ভুগতে হয়৷ এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এখন কোনো নারী শ্রমিক বিদেশে যেতে চাইলে তাকে আমরা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি৷ যেন বিদেশে গিয়ে সমস্যায় না পড়েন৷ সেইসঙ্গে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রশিক্ষণের সময় প্রত্যেককে যে দেশে যাবে সেই দেশের মোবাইল দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে৷
এদিকে বাংলাদেশ জনশক্তি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান বু্যরোর ২০১১ ও '১২-এর হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০ হাজার ৫৭৬ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন৷ ২০১২ সালে গেছেন প্রায় ৩১ হাজার নারী৷ ২০১০ সালে বিশ্বের মোট নারী শ্রমিক অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশের অভিবাসী ছিল ৭ দশমিক ৯ ভাগ৷ তবে পরের বছর তা কমে ৫ দশমিক ৩৮ ভাগ হয়েছে৷
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক এডভোকেট সালমা আলী জানান, গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে বিদেশে যাওয়া অনেক নারী শ্রমিক যৌন ও শারিরীক নির্যাতন, চুক্তিভিত্তিক বেতন না পাওয়া ইত্যাদি সমস্যার সম্মুখীন হন৷ লেবানন, সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহপরিচারিকার কাজে মেয়েদের পাঠানোর জন্য দালালদের একটি চক্র তৈরি হয়েছে৷ তারা এটিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখছে৷ তারা গ্রামের লেখাপড়া না জানা, অল্প বয়স্ক মেয়েদের বেশি বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাঠায়৷ অথচ কোথায় কোন কোম্পানিতে বা গৃহকর্তার অধীনে সে কাজ করছে তা আগে থেকে সে জানতেও পারে না৷ কর্মক্ষেত্রে এসব নারীর প্রায় ৮০ শতাংশ যৌন ও শারিরীক নির্যাতনের শিকার হয়৷
অভিযোগ রয়েছে দেশে রেকর্ডহীন অনেক ছোট ছোট রিক্রুটিং এজেন্সি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যারা বিদেশে জনশক্তি রফতানি করে৷ যারা কোন মানদণ্ড মেনে চলে না৷
জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৯ শতাংশ নারী শ্রমিক যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদেশে যান৷ বাকিদের এ সবের বালাই নেই৷ যাদের বেশিরভাগই আবার অক্ষরজ্ঞানহীন৷ কোন কিছু না জেনে বুঝে, প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমান তারা৷ যৌন হয়রানি, নানা নির্যাতন ও বঞ্চনা ছাড়াও ঘাতক ব্যাধি এইডসে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকেন তারা৷
সূত্র মতে, যত নারী বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছেন, তাদের প্রায় ৪৮ শতাংশ কখনো স্কুলে যাননি এবং প্রায় ৬৭ শতাংশ প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যাচ্ছেন৷ তাদের প্রায় ৫৬ শতাংশ বিপুল টাকা ধার করেন এবং অনেকেই ধার শোধ করতে পারেন না৷ তারা মূলত দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রচুর টাকা খুইয়ে বিদেশে যান এবং ধার শোধ করতে গিয়ে জমানো টাকা শেষ করেন৷
কেন নারীদের এরকম অবস্থায় পড়তে হচ্ছে জানতে চাইলে অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, নারী শ্রমিকদের নিয়মিত মনিটরিং করার ব্যবস্থা সরকার করেনি৷ ফলে অনেক নারী পাচার গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে৷ বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে নিয়ে গিয়ে পতিতাপল্লীতে বিক্রি করা হচ্ছে৷ তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যাপারে সক্রিয় থাকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে৷
জানা গেছে বাংলাদেশ হতে ১৯৯০ সাল থেকে পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি মহিলা শ্রমিকরাও অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন৷ অভিবাসী নারী শ্রমিকরা অল্প শিক্ষিত ও অসচেতন হবার কারণে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমস্যা এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন৷ রামরুসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারকে প্রভাবিত করেন নারী অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে নারী শ্রমিককে বিদেশ পাঠানোর জন্য৷ ফলে ২০০৩ সালে সরকার নারী অভিবাসনের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়৷ ২০০৬ সালে প্রণীত অভিবাসী শ্রমিক নীতিমালায় পুরুষ এবং নারী শ্রমিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে৷
২৮ অক্টোবর'২০১৩ 