ফিরে দেখা ২০১৭ : নারীর সাতকথা
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ০৪:৫০ পিএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ১২:৪২ এএম, ১ জানুয়ারি ২০১৮ সোমবার
দেশের নারী সেক্টরে নানা ঘটনা ঘটেছে এ বছর। এর মধ্যে কিছু ঘটনা মানুষকে নাড়া দিয়েছে। কিছু ঘটনা নিয়ে চলেছে বিতর্ক। কিছু ঘটনা নিয়ে আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঝড় উঠেছে। সব মিলে ২০১৭ সালটি দেশের মানুষের সামনে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি দেখাতে পেরেছে। এ বছর ঘটে যাওয়া কিছু আলোচিত ঘটনা ফিরে দেখা যাক :
রোহিঙ্গা সমস্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা :
২০১৭ সালের আলোচিত চরিত্র ছিল রোহিঙ্গা। দেশ-বিদেশে- জাতিসংঘ থেকে ওআইসি বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, প্রতিটি ফোরামে আলোচনার কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। সেইসঙ্গে অবধারিতভাবেই প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশের ভূমিকা।
রোহিঙ্গা সংকটের সময়ে সীমান্ত খুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার নব দুয়ার উন্মোচন করেছেন। স্থাপন করেছেন মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে।
জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন সকলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুরু থেকেই বাংলাদেশের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রায় দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা চলে আসার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এটা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বোঝা এবং পরিবেশের উপর বড় ধরনের দুর্যোগ।
কয়েক যুগ ধরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অবস্থানের মধ্যে গত অগাস্টে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সহিংসতা শুরু হলে বাংলাদেশ সীমান্তে নামে রোহিঙ্গাদের ঢল। নতুন করে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। এই পাঁচ দফা বাস্তবায়নের মধ্যেই সমস্যার সমাধান রয়েছে।
নারী ফুটবল ইতিহাসের সেরা র্যাংকিং:
ফিফা র্যাংকিংয়ে পুরুষরা লজ্জার ইতিহাস গড়লেও তাদের উল্টো পথেই হাঁটল নারীরা। ফিফা র্যাংকিংয়ে দ্রুতই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণা-মারিয়া-সাবিনাদের সাফল্যে র্যাংকিংয়ের ১০০ তে ওঠে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। রেটিং পয়েন্ট ১০০৩।
র্যাংকিংয়ে নারী দলের এটাই সেরা সাফল্য। অবশ্য এর আগে ২০১৩ সালেও একবার র্যাংকিংয়ে ১০০ নম্বরে উঠেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। কিন্তু সে অবস্থানটা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি তারা।
প্রতিভাবান নারী ফুটবলারের অকাল মৃত্যু:
দেশের নারী ফুটবলে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামের মেয়েরা। বলতে গেলে এক নামেই তাদের চেনে দেশবাসী। সেই গ্রামেই চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ নেমে আসে শোকের ছায়া। তাদের ছেড়ে এদিন না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন দেশের সম্ভাবনাময় এক নারী ফুটবলার সাবিনা ইয়াসমিন।
চোখে স্বপ্ন ছিল, একদিন বড় ফুটবলার হবেন। শুধু দেশ নয়, বিদেশের মাটিতেও আলো ছড়াবেন কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী সাবিনা। কিন্তু সেই স্বপ্নটা পূর্ণতা পেল না। তিন দিনের জ্বরে ভুগেই মারা গেছে দেশের প্রতিশ্রুতিশীল এই কিশোরী ফুটবলার।
২০১৩ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় সাবিনা প্রথম অংশ নিয়েছিল। এরপর সে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ দলের প্রাথমিক ক্যাম্পে প্রথম ডাক পায়। ধীরে ধীরে অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে মাঠ মাতানোর পর সাবিনা ডাক পেয়েছিলেন থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৬ এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য বাংলাদেশ দলের প্রাথমিক ক্যাম্পেও। কিন্তু বড্ড অকালেই না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় কৃষ্ণা রানী-মারিয়া-তহুরাদের সঙ্গে আর মাঠে নামা হল না সাবিনার।
সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরবগাঁথা:
চলতি বছরের জানুয়ারিতে শিলিগুড়িতে সাফ টুর্নামেন্টের মূল আসরে ভারতের কাছে হেরে শিরোপা জেতা হয়নি বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের। তবে বছরের শেষদিকে বড়দের সেই হারের প্রতিশোধ নেয় ছোটরা। বিজয়ের মাসে প্রথমবারের মতো সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের উৎসবের আনন্দে মাতে মারিয়া-শামসুন্নাহাররা। ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হিসেবে নিজেদের শিরোপা ঝান্ডা উঁচিয়ে ধরে বাংলাদেশের মেয়েরা।
এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ কতটা প্রাধান্য বিস্তার করে খেলেছে তার প্রমাণ, পুরো টুর্নামেন্টে একটা ম্যাচও হারেনি বাংলাদেশ। পাশাপাশি সদ্য শেষ হওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্বে কোনও ম্যাচেই বাংলাদেশ গোল হজম করেনি। নেপালকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর লিগের দ্বিতীয় ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে মার্জিয়ারা জিতেছিলেন ৩-০ ব্যবধানে। ফাইনালে ১-০ গোলে জয়ের আগে লিগের শেষ ম্যাচেও ভারতকে ৩-০ ব্যবধানে হারায় বাংলাদেশ।
পুরুষ ফুটবলের চরম দুঃসময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের মেয়েরা। বয়সভিত্তিক ফুটবলে ময়মনসিংহ থেকে উঠে এসেছে একঝাঁক কিশোরী। একটি দল হয়ে মাঠে অসাধারণ ফুটবলশৈলী দেখিয়ে যাচ্ছেন তারা। শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে বছরের শেষটা রাঙিয়ে রাখল এই দল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর শিরোপাটি প্রয়াত সাবিনাকে উৎসর্গ করে মারিয়া-শামসুন্নাহার-আঁখিরা।
বাংলাদেশি দুই নারীর আকাশ জয় :
বাংলার নারীর আকাশ জয়ের গল্প নতুন নয়, কিন্তু এবার সেই সফলতা ছড়িয়ে যাবে বিশ্বের বুকে-শান্তির বারতা নিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগ দিতে কঙ্গো যাচ্ছেন বিমানবাহিনীর দুই সামরিক সামরিক বৈমানিকের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় এসে তাদের প্রথম উড্ডয়ন ছিলো ২০১৪ সালে। সেটাই ছিলো বাংলাদেশের প্রথম নারী বৈমানিকদের সফলতা। এবার তারাই নিজেদেরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। দেশের ইতিহাসে এই নারীর ক্ষমতায়নের ধারায় সামরিক বৈমানিকের মতো এমন চ্যালেঞ্জিং কাজ শুধু বিমান বাহিনীর নয় এই গর্ব বাংলাদেশেরও। শান্তিরক্ষা মিশনে বিমানবাহিনীর সফলতার গল্প নতুন নয়, সেই সফলতার গল্পে আরও দুটি নতুন নাম তামান্না ও নাইমা।
দেশ মাতিয়ে গেল সোফিয়া :
এ বছরে দেশে প্রযুক্তিতে বড় ঘটনা ছিল সোফিয়ার বাংলাদেশে আসা। ডিসেম্বরে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথন ছাড়াও টেক টক উইথ সোফিয়া অনুষ্ঠানে দর্শনার্থীদের সামনে হাজির হয় সোফিয়া। দর্শনার্থীদের মাতিয়ে তোলে বিশ্বের প্রথম কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়া এই রোবটমানবী। সোফিয়ার ঢাকা আগমনকে ঘিরে আগে থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সোফিয়াকে চালু করা হয়। বিশ্বের প্রথম এই হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করে হংকংয়ের হ্যানসন রোবোটিকস। ব্রিটিশ অভিনেত্রী অড্রে হেফবর্নের অনুকরণে তৈরি করা হয় সোফিয়াকে। সামনে থাকা ব্যক্তির বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম সোফিয়া তার কথার ধরনের সঙ্গে মিল রেখে চেহারায় অভিব্যক্তিও প্রকাশ করতে সক্ষম। ২০১৭ সালে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র হিসেবে কোনো দেশের নাগরিকত্ব পায় সোফিয়া। সৌদি আরব তাকে এ নাগরিকত্ব দেয়।
অপু-শাকিব বিচ্ছেদ ও অন্যান্য :
এ বছর বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে আলেচিত ঘটনা ছিলো বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় জুটি অপু-শাকিবের বিয়ের ঘটনা ফ্লাস এবং তার বিয়ে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ানো। গোপনে বিয়ে করার পর দীর্ঘ দশ বছর সংসার করার পর এ বছর মাঝামাঝি অপু শাকিবের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎতার দিয়ে ভেতরের সব কথা বলে দেন। শিশু ছেলে জয়ের ভরনপোষন না দেয়া, অপুকে স্ত্রীর অধিকার না দেয়া এবং হালের নায়কা বুবলীর সঙ্গে শাকিবের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন অপু। এরও কিছুদিন পরে কিছু বিষয়ে আপত্তি এনে অপুকে তালাকনামা পাঠান শাকিব খান।
ভুলে ভরা বই ও প্রশ্নপত্র ফাঁস :
বছরের প্রথম দিনেই পাঠ্যপুস্তকে ভুল দিয়ে যাত্রা হয়েছিল আর শেষটা হয়েছে প্রথম শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কলঙ্ক মাথায় নিয়ে। বছরের প্রথম দিনেই নতুন বইয়ের যে উৎসব শুরু হয়েছিল সেটি মূলত বইয়ের ভেতরে ছাপার মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ভুলে ভরা বই দিয়ে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’র বর্ণ পরিচয় অংশে ‘ওড়না’ বিতর্ক, পঞ্চম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’ এবং ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’- বইয়ে বানান ভুল, প্রথম শ্রেনির ‘আমার বাংলায়’ ১১নং পৃষ্ঠায় ‘ছাগল আম খায়’-এর মতো ‘হাস্যকর’ তথ্য ছিল। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’এ পদ্য ‘বিকৃত’ করাসহ ছিল নানা ধরনের ভুলভ্রান্তি। অষ্টম শ্রেণির আনন্দপাঠ বইটির সূচিপত্রে দেয়া সাতটি গল্পের সবগুলোই বিদেশি লেখকদের গল্প, উপন্যাস অবলম্বনে লেখা বা ভাষাগত রূপান্তর করা হয় বলে সমালোচিত হয়।
চলে গেলেন নাট্যকার বেগম মমতাজ হোসেন
বছরের একদম শেষপ্রান্তে এসে ভক্তদের কাদিয়ে চলে গেলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের আশির দশকের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’ ও ‘শুকতারা’র নাট্যকার ও শিশুসাহিত্যিক বেগম মমতাজ হোসেন। ২৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় রাজধানীর উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।
বেগম মমতাজ হোসেন প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবীরের বোন এবং প্রয়াত চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠুর মা। তার স্বামী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন ১৯৮১ সালে মারা যান।
কর্মক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাকে রোকেয়া পদকে ভূষিত করা হয়। বেগম মমতাজ হোসেন ঢাকার উদয়ন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন।
