ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৬, মার্চ ২০২৬ ৬:১৫:০২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

এক টুকরো রুটির জন্য জুতা পালিশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪০ পিএম, ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ মঙ্গলবার

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কয়েক দশকের যুদ্ধ ও দুর্দশার পর আফগানিস্তান আবারও একটি গুরুতর সংকটের মধ্যে পড়েছে। এবার সেখানে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশটির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎক্ষাত করে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে শুরু করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তহাবিল বন্ধ করে দেওয়ায় কর্মসংস্থান হারিয়ে অনেক পরিবারই অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। খিদের যন্ত্রণায় তাই এক টুকরো রুটির জন্য জুতা পালিশ করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটির শিশুরা।

আফগানিস্তানের এখন যেখানেই যাওয়া হোক না কেন শিশু শ্রমিকদের দেখতে পাওয়া যায়। গাড়ি পরিস্কার, আবর্জনার স্তুপ থেকে কিছু সংগ্রহ, জুতো পালিশ থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করছে তারা। নিজের ও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতেই তাদের এ চেষ্টা।

১৩ বছর বয়সী পারভেজ। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পরিবারের সঙ্গে সে থাকে। প্রতিদিন স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে কাজে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বাইরে যায় সে। মাত্র কয়েক মাস আগেই পারভেজ এবং তার চাচাতো ভাই জুতো পালিশের কাজ শুরু করে। 

পারভেজ বলে, ‘আমি প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ আফগানি টাকা আয় করি। আগে আমি ১৫০ আফগানি টাকা আয় করলেও এখন কাজে খুব মন্দা চলছে। যখন আমার বাবার চাকরি চলে যায় তখন থেকে আমি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে টাকা উপার্জন করতে শুরু করি। এখন সবকিছুরই দাম আকাশ ছোঁয়া। এক বস্তা আটার দাম ৩ হাজার আফগানি টাকা, তেলের দাম ৩ হাজার ৫০০ আফগানি টাকা।’

পারভেজ এবং তার ভাই প্রতিদিন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে জুতা পালিশ করে। ব্যবসায় মন্দা থাকায় তাদের সঙ্গে প্রায়ই অন্য শিশু শ্রমিকদের মারামারি ও ঝগড়া হয়। 


পারভেজের বাবা মালিক শাহ প্রতিদিন সকালে দিনমজুরের কাজ করতে অন্যদের সঙ্গে কাবুলের একটি রাস্তার নিদৃষ্ট স্থানে অপেক্ষায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিনই কাজের সন্ধানে এখানে আসি। কিন্তু কোনো দিনও ১০ আফগানি টাকার বেশি আয় হয়না। এমনকি আমি দুপুরে খাবারের জন্য এক টুকরা রুটিও জোগাড় করতে পারিনা। একই পরিস্থিতি এখানে আসা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেও।’

পারভেজের চাচা বলেন ফয়েজ-ই-খুদা বলেন, ‘শিশুরা কাজে যাক এটা আমাদের পছন্দ নয়। কিন্তু কিছুই করার নেই। ওদের কাজে পাঠাতে আমরা বাধ্য হই। কারণ এখানকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আসলেই খুব বাজে।’

পারভেজ বলে, ‘লোকজন তাদের জুতো আমাদের দিয়ে পালিশ না করালে আমার খুব খারাপ লাগে। তারা জুতা পালিশ করালেই আমরা দুই থেকে তিন টুকরা রুটি কিনতে পারি। মাঝে মধ্যে কাজ না থাকায় আমকে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।’

কাজ না থাকলে পারভেজ এবং তার বন্ধুরা নিজেদের হারিয়ে যেতে বসা শৈশবকে খুঁজে পেতে কাবুলেরে একটি পার্কে গিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। সেখানে বসে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। লেখাপড়া শেষ করে তাদের কেউ হতে চাই চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট বা অন্যকিছু।  

স্কুল শুরু হলে আবারো লেখাপড়ায় ফেরার ইচ্ছা আছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে পারভেজ জানায়, ‘আমার বাবা কাজ ফিরে পেলে অবশ্যই আমি স্কুলে ফিরবো। আর যদি কাজ না পাই তাহলে সে সুযোগ আমাদের আর নেই।’


 
দুপুরে কি খাওয়া দাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে পারভেজ ও তার বন্ধুরা জানায়, কাজ পাইনি। তাই আজ দুপুরে খাবরও জোটেনি। যতোক্ষণ আমরা কাজ করে কিছু টাকা না পাচ্ছি ততক্ষণ আমরা রুটি কিনতে পারবো না। ফলে সন্ধ্য পর্যন্ত আমাদের না খেয়েই থাকতে হবে। তাই সন্ধ্যার আগে আমাদের কাজ জোগাড় করে রুটি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। 

কাবুলের স্থানীয় এক নাগরিক বলেন, ‘আমি সকালেই আমার জুতা পালিশ করিয়েছি। এরপরও ওদের সাহায্য করতে আবারও জুতা পালিশ করালাম। কাজ পেয়ে ওদের মনটা আনন্দে ভরে উঠেছে।‘  


 
দ্রব্য মূল্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কাবুলের রাস্তায় বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে সরকারি কর্মকর্তাদের। প্রতিটি ব্যাংকের বাইরে টাকা তুলতে দীর্ঘ লাইনও দেখা গেছে। তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো তহাবিল বন্ধ করে দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও দেশটির বৈদেশিক রিজার্ভ আটকে দিয়ে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে চলেছে। যার ফলে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়ও। সূত্র: বিবিসি।