ভারতীয় নারীদের কাছে মোদী যে কারণে জনপ্রিয়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:০২ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২২ বুধবার
ফাইল ছবি
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাফল্যের পেছনে দেশটির লাখ লাখ নারীর ভূমিকা রয়েছে। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি দুটি জরিপ অনুসারে, ফেব্রুয়ারী-মার্চের নির্বাচনে পুরুষদের চেয়ে নারীরা বিজেপিকে বেশি ভোট দিয়েছেন। ফলে পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে চারটিতেই জয়ী হয় বিজেপি। এসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের চেয়েও বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজ্য উত্তরপ্রদেশও।
১৯৬২ সাল থেকে মহিলারা সবসময় জাতীয় স্তরে সর্বভারতীয় দল কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে আসছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে, প্রথমবারের মতো, বিজেপি সর্বাধিক নারীভোট পাওয়া দল হয়ে ওঠে। যদিও বিজেপি‘তে নারীবাদীদের সংখ্যা খুবই কম। এই দলের নেতারা প্রায়ই নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যের জন্য খবরের পাতায় শিরোনাম হন এবং কিছু রাজ্যে এই বিজেপি সরকার ধর্ষণের ঘটনাগুলির সঠিক বিচার না করার জন্য বিশ্বব্যাপী শিরোনাম হয়েছে।
এছাড়া, মোদী সরকারের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে সোচ্চার বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছেন নারীরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও, নানা তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, আরও অধিক সংখ্যায় মহিলারা এখন বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন। তাহলে বিজেপি কীভাবে ভারতীয় মহিলাদের পছন্দের দল হয়ে উঠল?
দিল্লি-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিস (CSDS)-এর সঞ্জয় কুমার মনে করেন এটা সম্ভব হয়েছে নরেন্দ্র মোদির কারণে। তিনি বলেন, ’হঠাৎ করেই যে দলটি মহিলাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এমন নয়। অবশ্যই নরেন্দ্র মোদীই এখানে একটি প্রধান ফ্যাক্টর"
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং লেখক নলিন মেহতা তার সাম্প্রতিক বই ’দ্য নিউ বিজেপি’-তে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা করেছেন, তিনি বলেছেন, দলটি ১৯৮০ সালে নারীদের দলে টানার জন্য প্রচার শুরু করে এবং একটি মহিলা শাখা গঠন করে।
বিজেপির তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী নারীনেত্রী ছিল এবং এটি নারী সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু অনেক মহিলাই কয়েক দশক ধরে বিজেপিকে ভোট দেয়নি। দলটিকে মূলত পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষ প্রভাবিত দল হিসেবে দেখা হয়েছিল এবং মহিলাদের জন্য বিজেপি’র আবেদন ছিল অনেক কম।
২০১৯ সালে জাতীয় স্তরে যে বড় পরিবর্তন হয় তার মূল আছে ২০০৭ সালে যখন নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পুনঃনির্বাচনের জন্য ভোট করেছিলেন।
নলিন মেহতা জানান, প্রথমবার মোদি বলেছিলেন যে তিনি সম্পূর্ণভাবে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রায়ই তার সমাবেশে পুরুষদের চেয়ে মহিলারা বেশি। তিনি তাদের কাছে আবেদন জানাতেন, 'আমি আপনার ভাই, আমি আপনার ছেলে, আমাকে ভোট দিন এবং আমি আপনার স্বার্থ দেখব'।
২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এই কৌশলটিকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিলেন। সেই বছরের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে তার প্রথম ভাষণে তিনি কন্যা ভ্রূণহত্যার বিরুদ্ধে আবেদন জানান, ধর্ষণের নিন্দা করেন এবং বাবা-মাকে ভালোভাবে দেখাশোনার জন্য ছেলেমেয়েদের পরামর্শ দেন।
২০১৯ সালে বিজেপি অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি মহিলা প্রার্থী দিয়েছে এবং মন্ত্রী পদে আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে বেশি মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। এটি বিজেপি’র সাংগঠনিক কাঠামোকেও পুনর্গঠন করেছে, মহিলাদের জন্য কোটা নিয়ে এসেছে। যেহেতু দলটির নারী সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রামীণ এলাকার এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী, তাই এদের উন্নয়নের জন্য মোদী সরকার কাজ করেছে।
২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দরিদ্রদের জন্য অনুমোদিত ১৭ লাখেরও বেশি বাড়ির প্রায় ৬৮ ভাগ শুধুমাত্র মহিলাদের নামে বা পুরুষদের সাথে যৌথভাবে নিবন্ধন করা হয়৷ সরকার লক্ষ লক্ষ পরিবারের জন্য টয়লেটও তৈরি করে দিয়েছে এবং মহিলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে সাহায্য করেছে যাতে তারা সরাসরি পেনশন, ভর্তুকি এবং অন্যান্য সুবিধা পেতে পারে।
নরেন্দ্র মোদীকে প্রায়ই বলতে শোনা যায় যে, তারা একটি কল্যাণ নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন যা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত নারীদের দেখভাল করবে।
নলিন মেহতা বলেন, ’মোদী অত্যন্ত কেতাদুরস্ত এবং তার সমর্থকদের কাছ থেকে অসাধারণ সহানুভূতি পেয়ে থাকেন। তাদের কাছে তিনি বরাবরই একজন আকর্ষণীয় মানুষ। কারণ ৭১ বছর বয়সেও তিনি দারুন ফিট, তিনি দাম্ভিক নন এবং যখন জনসমক্ষে আসেন তখন সমর্থকরা তাকে পুণ্যবানের প্রতীক মনে করেন ।‘
তার মতে, ’ভারতে বেকারত্ব বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী এবং জ্বালানির দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, কিন্তু যা তার সমর্থকদের জোটবদ্ধ রেখেছে তা হলো শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। যদি এদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়ে যায় এবং অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরা না হয় তাহলে এই মহিলারাই, যারা দেশজুড়ে ঘরকন্না সামলাচ্ছে, তারাই একদিন চলে যাবে তার বিরুদ্ধে।’
’তবে সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত এখনো আসেনি, আসতে তো পারে!’ বিবিসি
