নার্সরা নানা বৈষম্যের শিকার
প্রকাশিত : ০৭:২১ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৪ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৭:২১ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৪ মঙ্গলবার
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম
ঢাকা : প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে বাংলাদেশে বাড়ছে না নার্সিং পেশার মান। বাড়ছে না সুযোগ-সুবিধাও। সরকারি ও বেসরকারি নার্সদের বেতন কাঠামোর বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। বিশেষ করে সামাজিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় এই পেশায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে মেয়েরা। কর্মস্থলেও শিকার হতে হচ্ছে নানা হয়রানীর। রোগী অনুপাতে নার্সের সংখ্যা কম হওয়ায় যথার্থ সেবা থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে রোগীদের। নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে দেশের নার্সদের কাজ করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, নার্সিং সার্ভিস ও শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ’৭৭ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রনে নার্সদের স্বতন্ত্র বিভাগ ‘সেবা পরিদফতর’ সৃষ্টি করা হয়। তখন দেশে সরকারি নার্সের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার। বর্তমানে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৪৪৪ জনে। বেসরকারী নার্স রয়েছে ১৫ হাজার। তবে জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে দেশের ৪০টি সেবা ইনষ্টিটিউট ও সরকারি হাসপাতালগুলোর নার্সিং বিভাগ এই পরিদফতরের নিয়ন্ত্রনাধীন।
সেবা পরিদফতর সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ি হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে চারজন রোগীর জন্য একজন ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) রোগী প্রতি একজন নার্স থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে দেশে ১৩ জন রোগীর জন্য নার্স আছে মাত্র একজন। তা ছাড়া একটি আদর্শ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতি একজন চিকিৎসকের সহায়তার জন্য ৩ জন নার্স থাকার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে প্রায় ২ জন চিকিৎসকের জন্য নার্স রয়েছেন মাত্র একজন।
নার্স নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরুষদের সুযোগ সুবিধা খুবই কম। এখনো দেশে ৯৫ শতাংশই নারী নার্স। সংশ্লিষ্টরা বলেন, ’৮৮ সালের আগ পর্যন্ত পুরুষ নার্স নিয়োগ বন্ধ থাকায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ চিকিৎসা সেবায় পুরুষ নার্সরা যে কোন প্রাকৃতিক দুযোর্গ ও পাবর্ত্য এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাহসী ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসকরা জানান, বিশেষ করে জরুরী বিভাগ, ক্যাজুয়েলটি, ইউরোলজি ও মানসিক ওয়ার্ডে পুরুষ নার্স ছাড়া রোগীদের সেবা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশে সহকারি নার্সেরও তীব্র সংকট চলছে। ’৯২ সাল থেকে সহকারি নার্স নিয়োগ ও পদোন্নতি বন্ধ। সূত্র জানায়, সহকারী নার্স থেকে প্রতি বছর ৮ জন করে দেশের ৮টি ট্রেনিং ইনষ্টিটিউটে ৬৪ জন ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির সুযোগ পান। বর্তমানে এ কোর্সে পাস করে বসে রয়েছে ৪ শতাধিক সহকারী নার্স। পদোন্নতি বন্ধ থাকায় তারা চাকরির শেষ দিকে এসেও ডিপ্লোমা নার্সের পরিচয় দিতে পারছেন না।
সরকারি হাসপাতালে কর্তব্যরত নার্সরা জানিয়েছেন, তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ভাষা শিক্ষা অতি জরুরী হলেও তা অবহেলিত। প্রতিটি ইনষ্টিটিউটে বাইরে থেকে আসা শিক্ষকরা প্রতি ক্লাসের জন্য মাত্র ৬০ টাকা পান। ফলে ক্লাসে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তারা। বর্তমানে ১৮০জন ডিপ্লোমা ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ৬ জন শিক্ষক অপ্রতুল। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময় মাত্র ৮৫০ টাকা বৃত্তি এবং প্রতি বছর মাত্র ৫০ টাকা ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে নার্সদের। নার্সরাও জড়িয়ে পড়েছে নানা রাজনীতিতে। দেশব্যাপি নার্সদের রয়েছে ৮টি গ্রুপ।
বর্তমানে নার্সদের আবাসন সমস্যাও প্রকট আকার ধারণ করেছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় নার্সদের জন্য আবাসন থাকলেও জেলা হাসপাতালগুলোয় তা নেই। ফলে সেখানে অন কল, ওয়ার্ড ও ওটি ইনচার্জ দায়িত্বরত নার্সরা সেবা দিতে পারছেন না। হাসপাতালগুলোয় তাদের জন্য আলাদা ড্রেসিং রুম নেই। অথচ চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও ওয়ার্ড মাষ্টারদের বাসা রয়েছে।
বেতন কাঠামোর বৈষম্যরও শিকার নার্সরা। ২১ বছর আগেও একজন নার্সের মূল বেতন ছিল মাত্র ২ হাজার ৫৫০ টাকা। ২১ বছর পর তা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৪০০ টাকায়। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে বেতন ১৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। কয়েকটি হাসপাতালে এর পরিমান আরো বেশি। ফলে সরকারী নার্সরা আগ্রহ হারাচ্ছে।
০৫.১১.২০১৪
