যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়ে পথশিশুরা
প্রকাশিত : ১০:৪৪ এএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ শনিবার | আপডেট: ১১:০০ এএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ শনিবার
অনন্ত জসীম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : সন্ধ্যা (ছদ্মনাম) বয়স ১৪। রাজধানীর রমনা পার্কে তার বসবাস। নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে বছর পাঁচেক আগে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসে। পরিবারের সদস্যদের হাত থেকে অচেনা জায়গায় ছিটকে পরে সে। এখন ভিক্ষা করে আর চেয়ে চিন্তে খায়। রাতে চুপিচুপি ঘুমিয়ে থাকে রমনা পার্কের আশেপাশে। রাতের অন্ধকারে বাজে লোকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সে। কিন্তু কিছুই করার নেই। তার অত্যাচারের কাহিনী কেউ শোনে না। হতাশ হয়ে সব মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে সন্ধ্যা।
কারওয়ান বাজারের ময়নার (ছদ্দনাম) বয়স আনুমানিক ১৫ বছর। সারাদিন সে ফুল বা চিপস বিক্রি করে রাতে রাস্তার পাশের ফুটপাতে ঘুমায়। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ায় বাবা আরেকটি বিয়ে করে। সৎমায়ের অত্যাচারে বাসায় থাকতে না পেরে রাস্তাই এখন তার ঠিকানা। সে জানায় প্রায়ই রাতে নানাশ্রেণীর পুরুষরা নানাভাবে অত্যাচার চালায়। অথচ তার কিছুই করার থাকে না। পুলিশকে অভিযোগ করলেও তারা শোনে না।
ফরিদার (ছদ্দনাম) বয়স ১১ বছর। মা-বাবা নেই। মামার কাছে থাকতো। কিন্তু দু’বছর আগে মামির অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সে। এখন থাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে। সারা দিন পথে পথে ভিক্ষা করে রাতে এখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কিছু দুষ্ট লোকের কারণে প্রায় রতেই তাকে নানা রকম অত্যাচারের শিকার হতে হয়। সব কিছু সহ্য করতে হয় মুখ বন্ধ করে। তা না হলে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে।
শুধু ময়না বা ফরিদা নয় এরকম ভাবে প্রতিনিয়ত স্বয়ং রাজধানীতে মেয়ে পথশিশুরা নিয়মিতভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনিশ্চয়তায় ঢেকে যাচ্ছে তাদের জীবন। কিন্তু তাদের পাশে দাড়ানোর কেউ নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৪ কোটি ২৪ লাখ শিশু পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ২৭ লাখ ছেলে এবং ১ কোটি ৯৭ লাখ মেয়ে শিশু। এই মেয়ে শিশুদের বেশিরভাগই এবয়স থেকেই নানা রকম যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক যৌন নির্যাতন বিরোধী নীতিমালা নিয়ে বেশ আলোচনা হলেও পথশিশু ও কিশোর দের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবছে না। পথে-ঘাটে রাত্রি যাপনের ফলে তারা নানাভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। অথচ তাদের নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোন ভাবনা নেই।
তাদের মতে, এর ফলে এসব শিশুদের এইডসসহ বিভিন্ন যৌন ব্যধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে অনেকাংশেই। যৌন নির্যাতন ছাড়াও অশিক্ষা, অজ্ঞতা, অবহেলা ও তত্ত্বাবধানের অভাবে বেড়ে উঠাসহ নানা কারণে পথশিশুরা যৌন কার্যকলাপে জড়িয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসকল মেয়ে শিশুরা নিয়োজিত হচ্ছে পতিতাবৃত্তিতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই না বুঝে এসব সমাজবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ছে তারা। পরবর্তিতে জীবনধারণের প্রয়োজনের টাকা আয়ের পথ হিসেবে পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিতে বাধ্য হয় তারা। দেশের ভাসমান পতিতাদের অধিকাংশই ছিন্নমূল শিশু। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ৬১ লাখ শিশুশ্রমিকের মধ্যে মেয়েদের শতকরা ৩২ জন পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত।
জানা গেছে যৌন নির্যাতনের শিকার এসব মেয়ে শিশুদের দেখার মতো সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান নেই। নামে মাত্র কয়েকটি শিশুসদন থাকলেও তা পথ শিশুদের প্রয়োজনে আসে না। ফলে পথশিশুদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। এমন কি পথ শিশুদের ওপর এধরনের অত্যাচার চললেও সরকারসহ সুশীল সমাজের সংশ্লিষ্টরা নিরব ভূমিকা পালন করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, দেশে পথ শিশুদের নিয়ে অপরাজেয় বাংলাদেশ, পদক্ষেপ, বার্ড, বিকশিত বাংলাদেশ, টিএসটিসি, এএসডিসহ বেশ কয়েকটি এনজিও কাজ করছে। এসব এনজিগুলোর মধ্যে কিছু এনজিওতে ডে-নাইট উভয় সময়ই পথশিশুদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা পথশিশুদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাছাড়া অধিকাংশ শিশুই এসব ডে কেয়ার সেন্টারের কথা জানে না। পথশিশুদের থাকার জন্য সরকারিভাবে আশ্রায় হোম, বেবি হোমসহ দেশে মোট ৮০টি শিশু পরিবার রয়েছে। নামে মাত্র এগুলো থাকলেও তা প্রয়োজনে কাজে আসে না। এগুলোতে এতিম এবং ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের রাখা হয়।
এদিকে শিশু আইনে বলা আছে যে ব্যক্তি চার বছরের বেশি বয়স্ক শিশুকে পতিতালয়ে বাস করতে কিংবা বিভিন্ন সময় যাতায়াতে অনুমতি বা সুযোগ দেন সেক্ষেত্রে অপরাধীকে দুই বছরের কারাদন্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হতে পারে। এছাড়া যে ব্যক্তি ১৬ বছরের কম বয়স্ক কোন বালিকার সত্যিকার দায়িত্বসম্পন্ন হয়ে তাকে অসৎ পথে পরিচালিত কিংবা বেশ্যাবৃত্তিতে প্রবৃত্ত করা বা উৎসাহ দেয়া বা স্বামী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তিকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করার উৎসাহ দেন এক্ষেত্রে অপরাধীকে দুই বছর মেয়াদের কারাদন্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হতে পারে।
এছাড়া শিশু আইনে উল্লেখ আছে ১৮ বছরের কম কোন বালিকাকে এমন কোন ব্যক্তির সঙ্গে অবৈধ যৌন সহবাস করতে বাধ্য বা প্রলুব্ধ করার অভিপ্রায়ে বা সম্ভাবনা জেনে তাকে কোন স্থানে যেতে বা তাকে অন্য কোন কাজ করার প্রলোভন দেখানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শাস্তির পরিমাণ অনুর্দ্ধ ১০ বছর কারাদন্ড এবং অর্থদন্ড। ১৮ বছরের কম ছেলে মেয়েদের যৌন কাজে ব্যবহারের জন্য কোন কিছু ক্রয়-বিক্রয় করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৩৪ এ বলা আছে শিশু কংগ্রেসে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমুহ সকল প্রকার যৌন নিপীড়ন এবং যৌন নির্যাতন থেকে শিশুদের রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকবে। তা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমুহ জাতীয়, দ্বিপাক্ষিক সকল প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পথে বসবাসের কারণে এসব শিশুর মধ্যে আচরণগত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। রাস্তায় জীবন যাপন করতে গিয়ে তারা এ আচরণগুলোর সন্মুখীন হয়। তবে তাদের চারপাশে সভ্য সমাজে বাস করি বলে আমাদের কাছে এসব আচরণ অস্বাভাবিক মনে হয়। মানসিক চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে তারা খুবই অনগ্রসর থাকে। মেয়ে পথশিশুরা পথেঘাটে নানাভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
০৬.০৯.২০১৪ 