যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীতিমালা : অবহেলিত হাইকোর্টের নির্দেশ
প্রকাশিত : ১২:০৩ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০১৩ রবিবার | আপডেট: ১২:০৭ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০১৩ রবিবার
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম
ঢাকা : যৌন নিপীড়ন বন্ধে মানা হচ্ছে না হাইকোর্টের নির্দেশ৷ নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন বন্ধে হাইকোর্টের নীতিমালা তৈরির প্রায় পাঁচ বছর হতে চললেও আজও দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়নি৷ এমন কি এবিষয়ে একটি আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও আজও তৈরি হয়নি সে আইন৷
জানা গেছে, নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন বন্ধে হাইকোর্টের নীতিমালা তৈরির প্রায় পাঁচ বছর হতে চললেও তা এখনও উপেক্ষিত৷ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও রাস্তাঘাটে নারী, শিশু ও কিশোরীদের যৌন হয়রানী থেকে রক্ষায় এখনও সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না৷ এছাড়া এধরনের নিপীড়নের অভিযোগ আমল নেয়ার জন্য অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই আজও অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়নি৷
অথচ নীতিমালা অনুযায়ী কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেয়া হয়৷ এ অভিযোগ গ্রহণের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করতে বলা হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখতে বলা হয়৷ অভিযোগ কেন্দ্র গঠনের ব্যাপারে রায়ে বলা হয়, নূ্যনতম ৫ সদস্যের একটি অভিযোগ কেন্দ্র থাকবে৷ কমিটির প্রধান হবেন একজন নারী৷ এছাড়া কমিটিতে একাধিক নারী সদস্য থাকবেন৷ কমিটি কোন অভিযোগ পেলে তার তদন্ত করবে এবং অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্তকে আইনে সোপর্দ করবে৷ এরপর প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে আদালত ব্যবস্থা নেবেন৷ যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা সম্পর্কে হাইকোর্ট বলেন, শারীরিক ও মানসিক যেকোন ধরনের নির্যাতনই যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে৷ ই-মেইল, এসএমএস, টেলিফোন বিড়ম্বনা, পর্ণোগ্রাফির যে কোন ধরনের চিত্র, অশালীন উক্তিসহ কাউকে ইঙ্গিতপুর্ণ সুন্দরী বলাও যৌন হয়রানির মধ্যে পড়বে৷ শুধু কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে না৷ রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় যে কোন ধরনের অশালীন উক্তি, কটূক্তি ও খারাপ দৃষ্টিতে তাকানোও যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে৷ হাইকোর্ট দেশের সাংবিধানিক আদালত৷ এ আদালত যে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, তা পালন বাধ্যতামহৃলক৷ এছাড়া হাইকোর্ট যেটিকে আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেন, সেটিও আইন হিসেবে বিবেচিত হয়৷ এসবের বাস্তবায়ন করতে আইন সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব, শিক্ষা সচিব, শ্রম সচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কতর্ৃপক্ষ, ইউজিসি, বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, বার কাউন্সিল, পুলিশ, তথ্য মন্ত্রণালয়সহ ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়৷
দেশে ইভটিজিংসহ নারীর প্রতি নানা রকম নিপীড়ন ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি রোধে নির্দেশনা চেয়ে ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বাদী হয়ে একটি রিট মামলা দায়ের করেন৷ মহিলা আইনজীবী সমিতির দায়ের করা রিটের নিস্পত্তিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই নীতিমালা প্রনয়ণ করেন এবং তা কার্যকর করতে রায় দেয়৷ আদালতের রায়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আইন প্রনয়ণের তাগিদ দিয়ে বলা হয় যত দিন পর্যন্ত আইন প্রনয়ণ করা না হবে ততদিন হাইকোর্টের বেঁধে দেয়া এই নীতিমালা বহাল থাকবে এবং তা বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলতে হবে৷
বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে বলছেন, হাইকোর্ট যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীতিমালা তৈরি করে আইন হিসেবে বিবেচনার জন্য নির্দেশ দিলেও তা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিতই রয়েছে৷ এ প্রসঙ্গে রিটকারী আইনজীবী অ্যাভোকেট ফৌজিয়া করিম বলেন, আমরা শুনেছি দুয়েকটি বেসরকারী বিশ্বদ্যিালয়ে যৌন হয়রানি রোধের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ বিজেএমইএ, বিকেএমইএসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোথাও কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্টের রায়কে আইন হিসেবে গণ্য করার কথা৷ রায় ঘোষণার পরের দিন থেকেই তা কার্যকরও করার কথা৷ কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই তা করা হয়নি৷
মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের এ রায় সকল প্রতিষ্ঠান মানতে বাধ্য৷ কিন্তু কেউ মানছে কেউ মানছে না৷ আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইন তৈরি হয় কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না৷
তিনি বলেন, নির্যাতিত মেয়েটি যাতে অভিযোগ করতে পারে সেজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে নারীবান্ধব কমিটি করতে হবে৷ তাছাড়া এমন একটি নীতিমালা যে রয়েছে দেশে তা কিন্তু অধিকাংশই জানে না৷ নীতিমালায় অপরাধের শাস্তি কি আছে তাও জনগণকে জানাতে হবে৷ সুতরাং এ ব্যাপরে ব্যাপক প্রচারণা দরকার৷ একই সঙ্গে সকলকে সচেতন হতে হবে৷
তিনি জানান, এই বিষয়ে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করে পাঠানো হয়েছে আইন কমিশনে৷ কিন্তু আজও তা আলোর মুখ দেখেনি৷
এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন বা নীতিমালা দিয়েই এধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব নয়৷ এজন্য সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা জরুরি৷ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীই শুধু নয়, এজন্য ছাত্র, অভিভাবক, শিক্ষকদেরও সচেতন করতে হবে৷
মহিলা মন্ত্রণনালয় ও অধিদপ্তরে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ইতিমধ্যে কমিটি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিরোধের জায়গাটিতে আমাদেরকে আরো শক্ত হতে হবে৷ এজন্য কমিউনিটি লেভেলের সম্পৃক্ততা জরুরী৷ কমিউনিটি পুলিশসহ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার৷ 