ফিরোজা বেগমের শূন্যতা পূরণ হবে না
প্রকাশিত : ০১:৪২ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ বুধবার | আপডেট: ০১:৫০ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ বুধবার
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন কিংবদন্তি কন্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগম। উপমহাদেশের বিখ্যাত এই শিল্পীকে হারিয়ে আজ সারা দেশ যেন শোকে স্তব্দ। বুধবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে সুধিজনেররা উইমেননিউজ২৪.কম’কে বলেছেন, এই নজরুল সংগীত শিল্পীর কৃতিত্বের কথা, জানিয়েছেন নিজেদের স্মৃতি থেকে অজানা অনেক গল্প। সেব কথন থেকে চুম্বক অংশ তুলে ধরার হলো পাঠকদের জন্য।
অ্যামিরেটাস অধ্যাপক ও নজরুল বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফিরোজা বেগমকে ১৯৪৯ সাল থেকে আমি চিনি। ঢাকা বেতারে ছোটদের একটি অনুষ্ঠান আমরা একসঙ্গে করাতাম। নজরুল সঙ্গীতকে তিনি শুদ্ধ র্চচার মাধ্যমে অন্যধারায় নিয়ে গেছেন। তিনি আসলে সাধক ছিলেন। সংগীত ছিলেঅ তার কাছে সাধনা। দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি এবং তার স্বামী কমল দাশ গুপ্ত নজরুল সংগীতের যে কর্মকান্ড তা অনুসরণ এবং অনুকরণ করা জরুরী।’
অর্থমন্ত্রী আব্দুল মাল আল মুহিদ বলেন, ‘তাকে আমি বীষণ শ্রদ্ধা করি। তার সংগীত আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু তা আমি জানিনি। প্রায় বিশ বছর পর আমি জানতে পারি তিনি আমাকে পছন্দ করেন। একটি অনুষ্ঠানে আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম। তখন তিনি আমাকে সে কথা জানান। আমি মুগ্ধ হয়ে যাই তার মত একজন এতবড় মাপের শিল্পী আমাকে পছন্দ করেন জেনে। তিনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। তার সংগীতের মাধ্যমে আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখবো সুনিশ্চিত।’
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘নজরুল সংগীত সাধনায় ব্রত সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালো লাগা তৈরি হয়েছিলো ছেলেবেলায় ফিরোজা বেগমের কন্ঠে কবির গান শুনে।তিনি আজ নেই। কিন্তু আমরা তাকে স্মরণ করবো তার সৃষ্টির মাধ্যমে। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হবার নয়।’
পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘তিনি নজরুল সংগীতকে উণœয়নের চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শুদ্ধ নজরুল সংগীত চর্চার তিনিই প্রতিকৃতি। যখন জাতীয় কবির গানের কথা ও সুর বিকৃত হচ্ছিল তখন তা সংরক্ষণে তিনি সদা সাগ্রত ছিলেন। তার মায়াবী কণ্ঠ বেঁচে থাকবে আজীবন। তিনি অনেক শিষ্য রেখে গেছেন। তারা তার পথ অনুসরণ করে শুদ্ধ নজরুল সংীতকে বাঁচিয়ে রাখবে আমি জানি।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ফাহমিদুল হক বলেন, ‘তাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। নজরুলের গান তার কণ্ঠে সুমধুর হয়ে উঠেছে। উন্নিশ সিষট্টি সালে তিনি ও তার স্বামী কমল দাশ গুপ্ত যখন দেশে চলে এলেন তার পর থেকে তাদের কাছ থেকে নজরুল সংগীতের নানা কর্ম আমরা পাই। নজরুলের গানের কথা ও সুরের সুযোগ্য ব্যবহার করেছেন তিনি।
সময়ের ধারায় তাকে আমরা হারিয়েছি কিন্তু গান ও সুরে তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।’
সন্মিলিত সাংকৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘একটি শতাব্দিতে একজন ফিরোজা বেগমের অর্ভিভাব হয়। কিন্তু প্রতি শতাব্দিতে বলা যায় না। স্বাধীনতা পূর্ববর্তি ও পরবর্তি সময়ে তিনি দেশবাসীকে অনুপ্রাণীত করেছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন সংগীত থাকবে ততদিন তিনি থাকবে সকলের মাঝে।’
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বৃটিশভারত, পাকিস্তানের পুরো সময় এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ছোটবেলা থেকে যে অসংগতির বিরোদ্ধে মোকাবেল করেছেন তা দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবে না। জীবনের পুরোটা সময় সবই ছিলো সংগীতকে ঘীরে আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই এ যে কত বড় ক্ষতি তা বলার অপেক্ষ রাখেনা। তবে তরুণদের উদ্দেশ্যে এতটুকু বলবো তারা যেন ফিরোজা বেগমকে অনুস্মরণ করে।’
অ্যামিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জমান বলেন, ‘উনি একজন বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। তার জীবনাদর্শকে অনুস্মরণ করে আমাদের চলতে হবে। তিনি চলে যাওয়ায় কতটুকু শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। সময় বলে দিবে যে তার চলে যাওয়া কত ক্ষতি হলো।’
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘শুধু দেশে নয় সমানভাবে স্বকীয় পরিচয়ে বিদেশও পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে সংগীতের যে ক্ষতি হলো তা পূরণ হবার নয়। তবে তার গায়কী ও সুন্দর চিন্তাকে লালন করে প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী শুদ্ধ চর্চায় এগিয়ে আসবে আজকের দিনে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।’
শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘ফিরোজা বেগম রবীন্দ্রনাথের গানসহ বিভিন্ন শিল্পীর গান চর্চা করেছেন অবশেষে তিনি সিদ্দান্ত নিয়েছিলেন যে নজরুলের গানই তার আসল ঠিকানা। তার এই সিদ্ধান্ত আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির পরম পাওয়া। যদি তার বিশুদ্ধ গায়কীর সূত্র ধরে কেউ লালন না করে তবে এাঁ হবে নজরুলের আরেক মৃত্যু। সংসশ্লিষ্টরা ফিরোজা বেগমের স্মৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে আহবান জানান তিনি।‘
নজরুলে নাতনী খিলখিল কাজী বলেন,‘ দাদুকে হারানোর মতো সমান ব্যাথ্যা পাচ্ছি আজ ফিরোজা বেগমের মৃত্যুতে। তিনি প্রথমে দাদুর গানে যেভাবে মগ্ন ছিলেন যেভাবে গানকে অবিকৃতভাবে গেয়েছেন ও প্রচার করেছেন তার পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।’
বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী খায়রুল আলম শাকিল বলেন, ‘দুই বাংলায় বিশেষ করে নজরুলের গানের জন্য তিনি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, একজন শিল্পী তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। আজ ফিরোজা বেগম চলে গেলেন সেই স্থানে আরেক জন শিল্পী তৈরি হতে পারবে কী না সে বিষয়ে সংশয় আছে। তার মৃত্যু শুধু নজরুল সংগীতাঙ্গনে নয় সমগ্র সংগীতাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি।
বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী সুজিত মোস্তফা বলেন, ‘সংগীতের বোধ, সমকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সহজেই অনুমেয় হবে তিনি সংগীতের কত বড় শিল্পী তথা মানুষ ছিলেন।
লায়সা আহমেদ লিসা বলেন, ‘ফিরোজা বেগমের মৃত্যু সংগীতাঙ্গনের অপরীয় ক্ষতি। ফিরোজা বেগম নজরুলের গানে অতিরিক্ত অলংকার দিতেন না। তিনি মনে করতেন এভাবে গানের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। একটা বিশুদ্ধ চিন্তা থেকে বিশুদ্ধভাবে গান পরিবেশন করতেন তিনি।’
১০.০৯.২০১৪ 