আজ চৈত্রসংক্রান্তি : নতুন বছরের অপেক্ষা
এসএম মুন্না
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ১২:২২ এএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ১০:১৪ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার
মহাকালের অতলগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আরও একটি বছর, বাংলা সন ১৪২৪। ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক, মুছে যাক গ্লানি...’ বিদায়ী সূর্যের কাছে আজ শুক্রবার এ প্রণতি জানাবে কোটি বাঙালিপ্রাণ।
কাল শনিবার (১৪ এপ্রিল) ভোরের নরম আলো রাঙিয়ে দেবে পৃথিবী, স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনায় সূচিত হবে নতুন বছর।
স্বাগত ১৪২৫।
গেল বছরের হতাশা-কান্তি, অপ্রাপ্তি-বেদনা ও হাহাকারের পালা সাঙ্গ করে নতুন বছর নতুন উদ্দীপনা ও নতুন আমেজ নিয়ে হবে উপস্থিত। যেন নব আনন্দে স্বপ্নের ডাক দিচ্ছে পরবর্তী বছর।
বহুমুখী লোকাচার ও দেশজ সংস্কৃতির বর্ণিল উৎসব আয়োজনে বাঙালি এখন প্রস্তুত বাংলা নববর্ষ আবাহনের জন্য। তবে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বাঙালি বিদায়ী বছরের সকল অপ্রাপ্তি ও হতাশা মুছে ফেললেও একটি দাবিতে নতুন বছরেও থাকবে অনড়, তা হচ্ছে সোনার বাংলার গড়া পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানো একাত্তরের অপশক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিকভাবে সোচ্চার হওয়া।
১৪২৪ বাংলা সনের শেষ সূর্য আজ সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার সাঙ্গ হলেও আগামীকালের নতুন সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে নতুন উদ্দীপনায় বাঙালি আরও দৃপ্ত শপথে বজ্রকঠিন থাকবে অপশক্তির বিরুদ্ধে।
হাজার বছরের ঐতিহ্য ও গৌরবময় ইতিহাস থেকে কলঙ্কের এ কালিমা চিরতরে মুছে ফেলার জন্য এ দাবিটি এবারের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে পাবে এক ভিন্ন মাত্রা। বহুমুখী আশাবাদ নিয়ে বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণের নানা অনুষ্ঠানে সোচ্চার থাকবে বাঙালি।
বছরের শেষ দিনটিতে আজ চৈত্রসংক্রান্তির মেলা ও নানা পর্ব মনে করিয়ে দিচ্ছে নতুন বছর দোরগোড়ায়। সাদর আমন্ত্রণে মাঙ্গলিক চিন্তা ও শুভবোধের উদ্বোধনে হৃদয়সিক্ত প্রাপ্তির ডালিতে নতুনের অভিষেকের দিন পহেলা বৈশাখ কাল।
চৈত্রসংক্রান্তি বাংলার লোকসংস্কৃতির এমন এক অনুষঙ্গ, যা সর্বজনীন উৎসবের আমেজে বর্ণিল। হালখাতার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাজানো, লাঠিখেলা, সংযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, গান, আবৃত্তি, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠান আর ওঁঝা সেজে ভূত তাড়ানোর মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে চৈত্রসংক্রান্তি।
বাংলার চিরায়ত রীতি অনুযায়ী বছরের শেষদিনের উৎসবকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি শেষ দিনটিতে থাকে বর্ষবিদায়ের নানা আয়োজন। চৈত্রসংক্রান্তিতে বিশেষ করে পুরান ঢাকায় ভূত তাড়ানো হয়। এটা চিরায়ত রীতি-নীতি। ওঁঝা সেজে হাতে ঝাড়ু নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় ছোট শিশুরা ভূত তাড়ানোর খেলায় মেতে ওঠে।
চৈত্রসংক্রান্তি-বিশেষ লোক উৎসব। প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও অসাম্প্রায়িক অগ্রসর সমাজের এক বৃহত্তর লোক উৎসব এখন। সাধারণভাবে বাংলা মাসের শেষ দিনে শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যের কাজ বলা মনে করা হয়।
চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান উৎসব ‘চড়ক’। এর সঙ্গে চলে গাজনের মেলা। চৈত্র মাসজুড়ে উপবাস প্রভৃতি নিয়ম পালন করার পর সংক্রান্তির দিন সন্ন্যাসীরা কিংবা সাধারণ লোকের কারও কারও শূলফোঁড়া, বাণফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে (উঁচু করে পোঁতা কাঠে) ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখা যায়। অবশ্য বর্তমানে এ ধরনের বিপজ্জনক খেলা অনেক প্রায় বিলুপ্ত।
চৈত্রসংক্রান্তির দিন তথা বাংলা বছরের শেষ দিনটিতে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীই তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। নকশা করা রঙিন কাগজ-জরি আর ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সাধ্যমতো বর্ণিল করে। দিনের প্রথম ভাগেই শেষ করেন লালসালুতে মোড়া হালখাতার নতুন হিসাব বই তৈরির কাজ। খাতায় তোলা হয় বকেয়া প্রাপ্তির হিসাব। শেষ করা হয় হালখাতার সর্বশেষ আমন্ত্রণপত্র বিলি-বণ্টনের কাজ। তারপর চলে মণ্ডা-মিঠাই-মিষ্টিসহ হালখাতায় আমন্ত্রিত গ্রাহক-ক্রেতাদের আপ্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আপ্যায়ন অনুষঙ্গ সংগ্রহের পালা। পরদিন নববর্ষে দিনব্যাপী চলবে হালখাতার এ উৎসব।
দেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চৈত্রসংক্রান্তির নানা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বারোয়ারি মেলা অন্যতম। বিশেষ করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, দিনাজপুরের ফুলছড়িঘাট এলাকা ও কুমিল্লার লাঙ্গলকোটে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বসে। শহরাঞ্চলের নগর সংস্কৃতির আমেজেও চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব বা মেলা বসে, যা এক সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়। যদিও এখন সেই মেলার জৌলুষ নেই। নানা কারণে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
ইতিহাস মতে ‘‘অতীতে মেলা উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থরা নাতি-নাতনিসহ মেয়েজামাইকে সমাদর করে বাড়ি নিয়ে আসত। সম্পন্ন গৃহস্থরা সবাইকে নতুন জামাকাপড় দিত এবং উন্নতমানের খাওয়া-দাওয়ারও আয়োজন করত। মেলার কয়েকদিন এভাবে তারা সবাই মিলে আনন্দ উপভোগ করত। বর্তমানে দারিদ্র্য ও শহুরে সভ্যতার ছোঁয়া লাগায় আবহমান গ্রামবাংলার সেই আনন্দমুখর পরিবেশ আর আগের মতো নেই।’’
চৈত্রসংক্রান্তিতে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রস্তুতি নেয় পহেলা বৈশাখের হালখাতা উৎসবের। এ উৎসবে নিকোণো পরিচ্ছন্ন বিপণি অঙ্গন, ধূপ-ধুনোর সুগন্ধি আমোদিত করে রাখে ঘরকে। অতিথি আসলেই গোলাপজল ছিটিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। খরিদ্দারদের কাছ থেকে সারাবছরের বকেয়া টাকা তুলতে হালখাতা উৎসবের প্রস্তুতি হিসেবে চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপনের রেওয়াজ কত শত বছরের, তা গবেষণার বিষয়।
পুরনো বছরকে বিদায় আর নতুনকে বরণ করে নিতে এখন দেশজুড়ে চলছে নানা প্রস্তুতি। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন করছে চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণের নানা আয়োজন।
আজ শুক্রবার বর্ষবিদায়ের বড় আয়োজনটি যৌথভাবে করছে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠান সূর্যাস্ত থেকে রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত চলবে এ অনুষ্ঠান। পৃষ্ঠপোষকতা করছে ইউনিলিভারের ব্র্যান্ড সানসিল্ক। শিল্পকলা একাডেমি ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের যৌথ উদ্যোগে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় পরীক্ষণ থিয়েটার হলে চৈত্র-সংক্রান্তি ১৪২৪ উদযাপন করা হবে। অনুষ্ঠানমালায় থাকছে মুড়ি-মুড়কি বিতরণ, সরোদ বাদন, দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনায় গান, নৃত্য, আবৃত্তি।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে সন্ধ্যায় ধানমন্ডির লালমাটিয়াস্থ বেঙ্গল বই উঠোনে সময় চেতনার গান পরিবেশন করবেন জলের গানের শিল্পীরা। জাতীয় জাদুঘরের আয়োজনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় থাকছে শামা রহমানের একক সঙ্গীতানুষ্ঠান। গুলশান রানার্স সোসাইটির আয়োজনে সকাল ৭টায় গুলশানের রানার্স সোসাইটি চত্বরে থাকছে চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান।
