স্বাগত বঙ্গাব্দ ১৪২৫
এসএম মুন্না ও সালেহীন বাবু
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ১২:৫২ এএম, ১৪ এপ্রিল ২০১৮ শনিবার | আপডেট: ০১:২৫ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০১৮ শনিবার
কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল আরও একটি বঙ্গাব্দ। এসেছে নতুন অতিথি ১৪২৫। আজ পহেলা বৈশাখ। ‘... তাপসনিশ্বাসবায়ে/মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’-বলে যে নবীনের আহ্বান চলছে যুগ যুগ ধরে নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশায়, সেই স্বপ্ন দেখার দিনও আজ।
যে বছরটি সদ্য বিদায় নিল সে হয়তো চিরতরে মুছে যায় না, হারিয়ে যায় না তার রেশ। পুরনো বছরের জের ধরেই নতুন বছর পল্লবিত হয় নতুন বাস্তবতার পত্রপল্লবে। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, ‘বর্ষ হয়ে আসে শেষ, দিন হয়ে এল সমাপন,/চৈত্র অবসান,_/গাহিতে চাহিছে হিয়া পুরাতন ক্লান্ত বরষের/সর্বশেষ গান।’
জীর্ণ-মলিন অতীতে যতই অপ্রাপ্তি থাক, রিক্ততার হাহাকার থাক, নতুনের কাছে যেতে যেতেও পুরনোর সুর গুঞ্জরিত হতেই থাকে। এটাই কালের ধর্ম।
একাত্তরে স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলে এক কাতারে লড়াই করে। ফলে কৃষিভিত্তিক সমাজ এই বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও লোকজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে বাধা আবহমান উৎসব পহেলা বৈশাখ অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনায় নতুন করে উজ্জীবিত হওয়ারও দিন।

কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রয়োজনে ফসলি সনে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে যে বাংলা সনের সৃষ্টি, তার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক যত, ততটাই সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। চৈত্রসংক্রান্তি এবং বাংলা নববর্ষ প্রাচীন কালে হিন্দু সমাজে পূজাসহ নানা আচারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কালক্রমে তা ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করেছে।
মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ এই ভূখণ্ডের মানুষের কাছে দিন দিন এ উৎসব থেকে ধর্মের আচার আনুষ্ঠানিকতা কমে গিয়ে বরং সাংস্কৃতিক আয়োজনটাই প্রধান হয়ে সব ধর্মের মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখে রবীন্দ্র-নজরুলসহ বাংলা ভাষার কবিদের কাছে বরিত হয়েছে বিচিত্র ভাবের আবেগে বহুকাল আগে থেকেই। আজও সে ধারা বহমান। বৈশাখের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। ‘ওই আসে ওই নব হরষে’ বলে যে উদ্দীপনা জাগায় বাংলা নববর্ষ বৈশাখ, কিংবা কবি কাজী নজরুল যখন বলেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়’ তখন বৈশাখের ধ্বংসের মধ্যে নবসৃষ্টির উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
নববর্ষে দেশজুড়ে আজ যে উৎসবের আলোড়ন, তা লড়াইয়ের ফসল। বাংলা নববর্ষ অর্জন সাংস্কৃতিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। যখনই সাম্প্রদায়িকতার বাধা এসেছে, তখনই সাংস্কৃতিক কর্মীরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। এবারও সাম্প্রতিককালে মাথাচাড়া দিয়ে উঠা একাত্তরের অপশক্তি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার শপথ নেবেন আপামর বাঙালি।
বৈশাখের একটা রুদ্র রূপ যে আছে, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতেই তা দেখে নেওয়া যায়- ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,/ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন-পিঙ্গল জটাজাল,/তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণে ভয়াল/করে দাও ডাক_/হে ভৈরব হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখের এই রুদ্ররূপের মধ্যেই আছে দ্রোহের বাণী, ধ্বংসের নৃত্য আর নবসৃষ্টির ইশারা। ফলে বাংলা নববর্ষে এই প্রেরণা মনে আসবেই_ যখনই এক একটি বড় বাধা আসে, তখনই সৃষ্টির নব জোয়ার, ঘটে বাঙালির নবজাগৃতি।
হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন নয়। বারবার এসেছে ছোবল। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মৌলবাদীরা বোমা মেরে নিরীহ মানুষ আর সংস্কৃতিকর্মীদের হত্যা করে কি থামাতে পেরেছে মানুষের ঢল। এখন আরও বড় সে আয়োজন। বিস্তৃত হতে হতে উৎসব এখন গণজোয়ার। চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতীকী মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ সর্বত্রই তো নবজাগৃতির বাণী। পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এবারও বৈশাখে মুখর হবে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘এবারের নববর্ষে বাঙালির অঙ্গীকার হবে-অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনে আরও সোচ্চার হওয়া। উৎসব হবে আরও উদ্দীপনাময়। জনজোয়ারের সামনে প্রতিক্রিয়াশীলদের বাধা খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে।’
শুভেচ্ছা বাণী
দেশবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা।
নববর্ষ বরণে নানা আয়োজন
উৎসবের সাজে সেজেছে রাজধানী ঢাকাসহদেশের প্রধান প্রধান শহর-নগর-বন্দর। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার হাটবাজারেও আজ হালখাতা উৎসবের আমেজ। সমতলের মানুষের পাশাপাশি দেশের পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা-মারমাসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোও উদযাপন করছে তাদের ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উৎসব। দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলাসহ নানা উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ শনিবার সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে ক্রোড়পত্র ও বিশেষ নিবন্ধ। নির্বিঘেœ উৎসব পালনে দেশব্যাপী কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ছায়ানট
বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগ্রত হওয়ার প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে ষাটের দশকে ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজনের পথ ধরে। রমনার অশ্বত্থমূলে ১৯৬৭ সালে সেই যে বর্ষবরণ উৎসবের শুরু, আজ তা বাঙালির মহোৎসবের কেন্দ্র। ভোর ছয়টায় রমনা অশত্থমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা। শুরুতেই বাজবে ভোরের রাগ আলাপ। এরপর পরিবেশন করা হবে ছায়ানট শিল্পীদের সম্মিলিত গান। ছায়ানটের এবারকার আয়োজনের প্রতিপাদ্য- ‘বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শেকড়ের সন্ধান ’। বৈশাখি কথনে অংশ নেবেন ছায়ানট সভাপতি ড. সনজীদা খাতুন। ছায়ানটের এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ড।
মঙ্গল শোভাযাত্রা
সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বেরুবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর এবারের প্রতিপাদ্য- ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি ’। এর মধ্য দিয়ে অস্থির সময়ে খাঁটি মানুষের সন্ধানের ডাক দেবেন চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রয়েছে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ। ভোর সাড়ে ৫টায় শুরু হওয়া এ আয়োজন চলবে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই।
সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচি
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্ব-স্ব ব্যবস্থাপনায় জাকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করবে। স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোও বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করছে। এ ছাড়া ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় গতবারের মতো এবারও দেশের সব জেলা-উপজেলায় বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিশু পরিবারের শিশু ও কারাবন্দিরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবে। থাকছে কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা। জাতীয় জাদুঘর, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় জাদুঘর ও প্রত্মস্থানগুলোও সবার জন্য উন্মুক্ত।
ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে শিশুপার্কের পাশে নারকেলবীথি চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান জাগো নব আনন্দে। উদ্বোধন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক এম মোজাম্মেল হক। সম্মাননা জানানো হবে লোকসঙ্গীতশিল্পী আকরামুল ইসলাম, চারুশিল্পী কামাল পাশা চৌধুরী ও বাচিকশিল্পী রূপা চক্রবর্তীকে। রবীন্দ্র সরোবরে বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, জাতীয় প্রেস কাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, রবিরাগ, কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, বেণুকা ললিতকলা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও, রেডিসন ব্লু, ওয়েস্টিন, ঢাকা রিজেন্সি, খাজানাসহ হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর উদ্যোগেও উদযাপিত হবে নতুন বছরের উৎসব।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে ঢাকা কাব, গুলশান কাব, উত্তরা ক্লাবসহ।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগেও উদযাপিত হবে নববর্ষ। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সকাল ৭টায় বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পর্যন্ত মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য সংগঠন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নানা আনুষ্ঠানিকতায় বরণ করে নিচ্ছে বাংলা নববর্ষকে।
