ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১৮:৩৯:৩১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

পথে যেতে যেতে...

প্রকাশিত : ০৩:৪৮ পিএম, ৫ নভেম্বর ২০১৪ বুধবার | আপডেট: ০৩:৪৮ পিএম, ৫ নভেম্বর ২০১৪ বুধবার

সেবিকা দেবনাথ : ছোটখাটো অনেক ঘটনাই আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। ভেবে ভেবে যখন কোন কূলকিনারা পাই না তখন নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে। এমনই একটা অনাকাঙ্খিত ঘটনার সম্মুখীন হয়ে নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে আমার। এই অনাকাকিঙ্খ ঘটনার সম্মুখীন হওয়া আমার এবং আমাদের দেশের মেয়েদের জন্য নতুন কোন ঘটনা নয়। তারপরও কেন জানি ওই ঘটনার পর থেকে আমার ভীষণ মন খারাপ লাগছে। বাসে চড়া আমার জন্য নতুন কোন বিষয় নয়। অনেক সময় বাসের হেলপার, কন্ট্র্যাক্টর কিংবা যাত্রীদের সাথে টুকটাক লেগে যাওয়াও আমার জন্য নতুন নয়। ১২ জানুয়ারি সকালে শাহবাগের জাদুঘর মিলনায়তনে আমার একটা অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। বাসের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটা বাসে উঠার সুযোগ পেলাম। ধাক্কাধাক্কি করে ইত্তেফাক মোড় থেকে আমরা তিনজন ‘মহিলা’ বাসে এক সাথে উঠলাম। উঠে দেখি চল্লিশোর্ধ দুইজন যাত্রী বাসের সংরক্ষিত ‘মহিলা’ সিটে বসে আছেন। তাদের পাশে বসা একজন তরুণী। ড্রাইভারের পেছনেও ‘মহিলা’দের জন্য সংরক্ষিত যে চারটি সিট রয়েছে তাতেও বসে আছেন দুই জন পুরুষ যাত্রী। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ দেখে যে কেউ তাদের ভদ্র লোক বলবেন। ‘মহিলা’ সিটে বসে থাকা পুরুষ যাত্রীসহ দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন যাত্রী একসাথে হেলপারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘এই বেটা তুই মহিলা তুলছস কেন? মহিলা সিট আছে? ওগরে বসতে দিবি কই? গায়ের মধ্যে লাগলেই বলবো সইরা দাঁড়ান’ ওগরে পড়ের গাড়িতে আসতে কইতে পারস নাই’। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে বলতে শুরু করলেন, ‘আরে ভাই মহিলারা এখন আর মহিলা নাই। ওরাই এখন বেশি ‘ডিয়ারিং’। কোন কিছু হলেই বলে ‘ইভটিজ’ করছে’। হুজুর গোছের একজন পুরুষ যাত্রী বললেন, ‘বেপর্দাভাবে চলে বলেইতো দেখেন না...’। কথাটা শেষ করলেন না তিনি। আমি বোঝার চেষ্টা করলাম অসমাপ্ত বাক্যের শেষে ওনি কি বলতে চেয়েছেন। ‘বেপর্দা’ মানে কি? মাথাটা গরম হয়ে গেল। আমরা বাসে উঠার পরই হেলপার বললো, ‘ভাই লেডিস সিটগুলা ছাড়েন। মহিলাগুলারে বসতে দেন।’ আমাদের তিনজনের মধ্য থেকে একজন বয়স্ক মহিলা বললেন, ‘ভাই এগুলাতো মহিলা সিট’। আমাদের একটু বসতে দিন।’ কারও কথা ‘মহিলা’ সিটে বসে থাকা কোন পুরুষ যাত্রীর কানে ঢুকলো বলে মনে হলো না। এসময় ‘মহিলা’ সিটে বসা একজন যাত্রী বললেন সেই কমন ডায়ালগটি। ‘আপনারা না সমান অধিকার চান, তাইলে আবার মহিলা পুরুষ কি? আপনারা যখন অন্য সিটে বসেন তখনতো আমরা বলি না এটা পুরুষদের সিট।’ আর চুপ থাকতে পারলাম না। কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। রাগে গজগজ করতে করতে আমি ওই বয়স্ক মহিলাকে বললাম, ‘এই সিটগুলাতো শুধু মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত নয়। মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য। যারা ওখানে বসে আছেন তারা যেহেতু মহিলা ও শিশু না তাহলে তৃতীয় শ্রেণীর (প্রতিবন্ধী)। ওদের বসতে দিন’। আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যাত্রী বললেন, ‘আপা আপনি কথা বলছেন কেন? আপনারেতো কিছু বলা হয়নি।’ তার এই কথা আমার রাগে যেন আগুণে ঘি দেয়ার মতো কাজ করলো। আমি বললাম, ‘আমি কি আপনাকে কিছু বলেছি? আপনি কথা বলছেন কেন? মহিলারা বেপর্দা চলে। যারা বেপর্দা মহিলা দেখলে নিজেদের ঠিক রাখতে পারেন না তারা চোখে কালো চশমা পড়লেই পারে। ’ এক সময় দেখলাম শাহবাগের সামনে এসে গাড়ি থামলো। ভাড়ার টাকা মিটিয়ে দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম। বাস থেকে নেমে মনে মনে ভাবতে লাগলাম, ‘যারা মুখে বাসে মহিলা তুলতে মানা করে তাদের চরিত্রে কি দোষ আছে? বাইরের মহিলা দেখলে কি তাদের মনে খারাপ বাসনা জাগে? তা না হলে কেন তারা এসব কথা বলে? শারিরিকভাবে ‘বেপর্দা’ ও ‘ধর্ষণ’ই কি সব? আমার দেশের এমন অসংখ্য পুরুষ আছেন যারা তাদের নিচু মানসিকতা আচার-আচরণ দিয়ে প্রতিনিয়তই নারীদের ‘বেপর্দা’ ও ‘ধর্ষণ’ করছে। অনেক কিছু ভেবে ভেবে কোন কূল কিনারা পেলাম না। অ্যাসাইনমেন্টেও ঠিকমতো মন বসাতে পারলাম না। বিকেলে অফিসে রিপোর্টারদের সাপ্তাহিক মিটিং ছিল। অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে ছুটলাম অফিসে। মিটিংয়ে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আমাকে এ বিষয়ে সামগ্রিক চিত্র নিয়ে, কেন ওই অনাকাঙ্খিত ঘটনা বাড়ছে সব মিলিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে বললেন বার্তা সম্পাদক। আমার এক সহকর্মী বলে উঠলেন, ‘ধর্ষণ বাড়ার পেছনে মেয়েরাও দায়ি। মেয়েরা যেসব ড্রেস পড়ছে তা আমাদের দেশের জন্য ঠিক না। ওদের ঠিকভাবে পোশাক পড়া উচিত’। আমার অন্য সহকর্মীদের অনেকেই এই কথার বিরোধীতা করলেন। আমিও করলাম। তবে আমার তখন মনে পড়ে গেল বাসের সেই অসমাপ্ত বাক্যটি ‘বেপর্দাভাবে চলে বলেইতো দেখেন না...’। ওই দিন বিকেলে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের বাৎসরিক মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই সংগঠনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮০৫ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে ৪৭৩ জনই শিশু এবং ৩৩ জনের বয়স জানা যায়নি। ২০১১ সালে ৭১১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। তাদের মধ্যে ২৪৬ জন নারী, ৪৫০ জন শিশু এবং ১৫ জনের বয়স জানা যায়নি। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে করতে আমার মনে হচ্ছিল, যে সংখ্যক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তারা কি ‘বেপর্দা’ হয়ে চলতো? ভারতের ‘দামিনী’ কিংবা বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের ‘ময়না’ কি ‘বেপর্দা’র কারণেই আজ ‘সাহসীকা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে? ‘দামিনী’, ‘ময়না’ কিংবা নীলফামারির ১২ বছরের শিশুর পর এবার কার পালা? আমার? আমার বোন? আমার বান্ধবী? কিংবা আমার কোন স্বজনের নয়তো? ‘পর্দা’ মানে কি? ‘বেপর্দা’ মানে কি? ‘পর্দা’র দোহাই দিয়ে আর কত পেছনে ফেলা হবে নারীকে? এসব কথা ভেবে নিজেকে খুব অনিরাপদ মনে হচ্ছে। আগেও যে খুব একটা সুরক্ষিত মনে হতো তেমন নয়। মাথায় কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে ওই কয়েকটি প্রশ্ন। লেখক : স্টাফ রিপোর্টার-দৈনিক সংবাদ ০৫.১১.২০১৪