আদুরির সাতকাহন
প্রকাশিত : ১১:৪৯ এএম, ৫ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার | আপডেট: ০৮:৪১ এএম, ১১ অক্টোবর ২০১৩ শুক্রবার
রূপা চক্রবর্তী, উইমেননিউজ২৪.কম
ঢাকা : হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে মেয়েটি। চোখে-মুখে রাজ্যের ভিরুতা। হাড্ডিশার শরীরজুড়ে নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন। অজ্ঞান হয়ে পরে থাকা মেয়েটির জ্ঞান ফিরেছে দুদিন আগে। কিন্তু ক্লান্তি আর অবসাদে কথা বলতে পারছে না। যাও বলতে চেষ্টা করছে শোনা যায় ক্ষণ। পরিবারের অভাব দূর করার জন্য আদুরি (১১) নামের এই কিশোরী মেয়েটি গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলো বছরখানেক আগে। বাবা হারানো মেয়েটির মা যা উপার্জন করেন তা দিয়ে দুবেলা দুমুঠো খাবার হয়না ঠিকমত। তাই বাধ্য হয়েই অসহায় মা তাকে এই ইটপাথরের রাজধানীতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু রাজধানীতে এসে এই কিশোরী পরে যায় এক নরপিশাচ গৃহকর্ত্তীর কাছে। যে সারাক্ষণ তাকে মারধর করতো। সামান্য ভুলেই চলতো আদুরির উপর অমানুসিক নির্যাতন।
ঘটনার দিন ২৩ সেপ্টেম্বর আদুরিকে নির্মমভাবে নির্যাতন করার প্রধাণ কারণ ছিলো শখ করে গৃহকর্তীর কানের দুল পড়েছিল সে। এ অপরাধে গৃহকর্তী নদী তাকে ব্যাপকভাবে মারধোর করেন। রক্তাক্ত আদুরিকে আটকে রাখেন বাথরুমে। আদুরি মারা গেছে ভেবে এক সময় তাকে ফেলে আসা হয় ডাস্টবিনের ময়লার স্তুপে। কিন্তু জীবনমৃত অসহায় আদুরির সহায় হয়ে দাঁড়ান এক অপরিচিত মহিলা। ডাস্টবিনে একটি জীবন্ত মেয়েকে পরে থাকতে দেখে এগিয়ে আসেন লিলি আক্তার নামের এই নারী। পুলিশের সহায়তায় তিনিই তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
এ ঘটনায় ২৬ সেপ্টেম্বর গৃহকর্তী নদীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদুরি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন। তার মা সাফিয়া বেগম জানান, জ্ঞান ফেরার পর সে জানিয়েছে, গৃহকর্তীর কানের দুল পড়েছিল আদুরি। তা দেখে ফেলার পর নদী তাকে ব্লেড দিয়ে খুচিয়ে আহত করে। এরপর আর সে কিছু বলতে পারে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিসিৎসক ডা. বিলকিসের তত্বাবধায়ওনে চিকিৎসাধীন আছে সে। ডা. বিলকিস জানান, আদুরির অবস্থা কিছুটা ভাল। তবে সে শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল। এছাড়া তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এগুলো সেরে উঠতে অনেকটা সময় লাগবে। সে এতই দুর্বল যে একটু কথা বললেই হাঁপিয়ে উঠে। এখন তাকে বিভিন্ন ধরনের খাবার দেয়া হচ্ছে যাতে দুর্বলতা কাটে।
আদুরির মামা নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা জানি আদুরী ঢাকায় আছে এবং ভালো আছে। আদুরিকে উদ্ধার করার আগের দিন ২২ সেপ্টেম্বর আমাকে ফোন করে চুন্নু মিয়ার ভাতিজা রনি জানায় আদুরি নাকি বাসা থেকে পালিয়ে গেছে। এ কথা শোনার পর আমরা বিভিন্ন দিকে খোঁজ খবর নিতে থাকি। পরে বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশনে দেখে জানি এই ঘটনা। তা জানার পর ঢাকা মেডিকেলে আসি।
এক বছর আগে পটুয়াখালীর ঠিকাদার চুন্নু মিয়া আদুরিকে পরিবারের কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। চুক্তি হয়েছিল প্রতি মাসে ৫শ টাকা করে দেয়ার। এই ভেবেই রাজি হয়ে যায় তারা। প্রথমে চুন্নু মিয়া আদুরিকে কিছুদিন নিজের কাছে রেখে পাঠিয়ে দেয় রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে তার বোনের বাসায়। সেখানে আসার পর থেকেই শুরু হয় তার উপর নির্যাতন। ২২ রমজানে আদুরির সঙ্গে শেষ কথা হয় তার মায়ের। সেদিন আদুরি মাকে বলেছিলো, তোমরা এখান থেকে আমাকে নিয়ে যাও। এখানে আমার ভালো লাগে না। আদুরি জানায় সেদিনও নদী তাকে মারধর করেছিলেন। সতর্ক করে দিয়েছিলো মারধোরের কথা মাকে বললে ওকে আরও অত্যাচার করা হবে।
৯ ভাই বোনের সংসার আদুরিদের। এর মধ্যে ও সপ্তম। খুব আদর করে বাবা মা সন্তানের নাম রেখেছিলেন আদুরি। ছোটবেলা থেকেই আধাপেট খেয়ে বড় হতে থাকে মা-বাবার ওই আদরের ধন। বছর আটেক আগে আদুরি তার বাবাকে হারায়। সংসারে উপার্জনের প্রধান ব্যক্তিকে হারানোর পর ওর মা মাটি কাটার কাজে নেমে পড়েন। দু’বেলা ছেলে মেয়েদের মুখে দু’মুঠো খাবারের জোগার করা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। উপায় না দেখে ৯ বছরের আদুরিকে ইট-পাথরের এই রাজধানীতে ঠেলে পাঠানো হয়। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় মা-বাবার দেওয়া নামটিও তার পাল্টে যায়। আদুরী পরিচিতি পায় মনিকা নামে। তবে আদুরি নামে ছোট্ট এই শিশুটির ঠিকানা শেষ পর্যন্ত ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে হবে এটা হয়তো তাদের কল্পনায়ও ছিল না।
২৩ সেপ্টম্বর সোমবার হাসপাতালে ভর্তির পরদিন আদুরির জ্ঞান ফেরে। এরপই ঢাকা মহানগর পুলিশ আদুরির গৃহকর্ত্রী ও বাসায় ঠিকানা বের করে। গ্রেফতার করা হয় গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদী (২৭) কে। সেদিন রাতেই আদুরির মামা নজরুল চৌধুরী বাদি হয়ে মামলা করেন। প্রধান আসামী করা হয় নওরীন জাহান নদীকে। গ্রেফতারের পর নদী জানান, দুই মাস আগে আদুরি তাদের বাসা থেকে পালিয়ে গেছে। এরপর আর খোঁজ নেননি। পুলিশকেও বিষয়টিও জানাননি। এমনকি আদুরির পরিবারকেও তার পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেননি। পরে পত্রিকায় দেখেন তাকে ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে।
নদী দাবি করেন, মাঝেমধ্যে আদুরীকে চড়-থাপ্পড় মারতেন। এতটুকুই তার ভুল ছিল। ছ্যাঁকা বা ব্লেড দিয়ে জখম করেননি। নদী জানান, বছরখানেক আগ থেকে স্বামীর সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। তার ছোট্ট দুই শিশুসন্তান রয়েছে। তাদের নিয়েই বসবাস করেন। তার শ্বশুরবাড়ি বরিশালের শায়েস্তাবাদ। শ্বশুরপক্ষের লোকের মাধ্যমে গত ডিসেম্বরে আদুরিকে তার বাসায় আনা হয়। দুই মাস আগে চার হাজার টাকা, সোনার কানের দুল ও হাতের চুড়ি নিয়ে আদুরী বাসা থেকে পালিয়ে যায়। এর আগেও কয়েকবার পালিয়েছে। তবে কীভাবে আদুরি ডাস্টবিনে গেছে তা তার জানা নেই। শ্বশুরপক্ষের কারও সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগও নেই।
এদিকে আদুরির ওপর অমানবিক নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রী নওরীন আক্তার নদীকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় আদালত ৩দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। শুক্রবার বিকালে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে আসামি নদীকে হাজির করে ৫দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানা পুলিশ। আদালতের কাছে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। মহানগর হাকিম মো. নুরু মিয়া শুনানি শেষে ৩দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ সময় আদালতে আসামি পক্ষের আইনজীবী তার জামিনের আবেদন করলে তা নাকচ করে দেন বিচারক।
এদিকে ১ অক্টোবর সকালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস (ওসিসি) সেন্টারে চিকিৎসারত আদরিকে দেখতে যান। প্রতিমন্ত্রী আদুরির শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন। তাকে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপর প্রদান করেন। আদুরির মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের নির্দেশ দেন। চিকিৎসায় যেন কোন ত্র“টি না হয় সে বিষয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা বিধানে নতুন আইন করার কথা ভাবছে সরকার। যার মাধ্যমে গৃহকর্মীদের রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হবে।’
আদুরীর সুচিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের নির্দেশে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধাণকে সভাপতি করে ৮ সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদুরির রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষাসহ ব্রেইনের সিটি স্কেন, এক্সরেমূত্র পরীক্ষা করা হয়। বর্তমানে বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী তার চিকিৎসা চলছে।
৭ অক্টোবর’২০১৩ 