বাংলাদেশ : সিডও সনদ ও নারী অধিকার
প্রকাশিত : ০৬:২৯ পিএম, ৬ নভেম্বর ২০১৪ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৬:২৯ পিএম, ৬ নভেম্বর ২০১৪ বৃহস্পতিবার
রুমি খান : নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উচ্চারিত হয় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের স্লোগান। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর ‘বিশ্ব নারীর সমমর্যাদাবিষয়ক কমিশন’ গঠিত হয় ১৯৪৬ সালে। এই কমিশনেরই পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করা হলো, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’ নারীর অধিকার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি। মূলত পুরুষের অধিকারকেই প্রাধাণ্য দিয়েছে। তারপর জাতিসংঘের অনুমোদনে ‘বিশ্ব নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশন’ ১৯৪৭ সাল থেকে ২০ বছর ধরে লিখে তৈরি করেছে ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ’ বা সিডওর খসড়া প্রতিবেদন। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘে জমা পড়ার পর খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে ১২ বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সনদটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। সনদের আইন অনুসারে ২০টি দেশ বা রাষ্ট্রের স্বাক্ষরের পর ১৯৮০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সনদটি কার্যকর হয়েছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সুদান ও সোমালিয়া ছাড়া অন্য সব সদস্য রাষ্ট্র এই সনদে স্বাক্ষর দিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট রয়েছে। সর্বশেষ পর্যায়ে এই সনদের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য কমিটি ‘অপশনাল প্রটোকল’ বলে একটি ব্যবস্থা অনুমোদন করেছে, যাতে নারী প্রয়োজনে সরাসরি কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন। ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার সিডও সনদের ৩০টি ধারার মধ্যে ২, ১৩ (ক), ১৬র ১গ ও চ বিষয়ে সম্মতি সংরক্ষণ রেখে স্বাক্ষর করেছে। ১৯৯৭ সালে ১৩(ক) (পারিবারিক কল্যাণের অধিকার) এবং ১৬চ (অভিভাবকত্ব, প্রতিপালকত্ব, ট্রাস্টিশিপ ও সব ক্ষেত্রে শিশুদের স্বার্থই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)- এই ধারা দুটির প্রতি সংরক্ষণ সরকার তুলে নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার ২ ধারা (মূলত এই ধারাটি গুরুত্বপূর্ণ যে সনদে উল্লিখিত ধারাগুলোর বাস্তবায়নে সরকার নিজ দেশে আইন করবে) এবং ১৬.১.গ ধারা (বিবাহ এবং এর বিচ্ছেদকালে একই অধিকার ও দায়িত্ব) বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছে। সরকার ‘পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ ও শরিয়া আইনের পরিপন্থী’ উল্লেখ করে ১৬.১.গ ধারার প্রতি সম্মতি দিচ্ছে না। ২ ধারার প্রতি সম্মতি দিচ্ছে না ১৬.১.গ বিষয়ে ও অন্যান্য কিছু বিষয়ে আইন করার প্রতি সরকার এখনো সম্মত নয় বলে। যেমন ধর্মনিরপেক্ষভাবে দেশের সব নারীর জন্য পারিবারিক আইনে নারী-পুরুষের অধিকার ও দায়িত্ব সমান হোক, বিয়ে রেজিস্ট্রি ও তালাক দেয়ার অধিকার হিন্দু নারীর জন্য আইনসম্মত করা হোক; উত্তরাধিকারে ধর্মনির্বিশেষে সব নারীর জন্য নারী-পুরুষের অধিকার সমান করে আইন হোক-এসব বিষয়ে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’তেও সরকার দ্বিমত পোষণ করেছে। এমনই যদি হয় তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা কোথায়? সিডও সনদের কয়েকটি ধারার বিষয়ে এবং জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির নানা বিষয়ে সরকার ধর্মীয়ভাবে বাধা বলে মূলত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বজায় রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখছে। মুসলিম দেশ বলে আখ্যায়িত দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ২৯-এর ১ ধারা সংরক্ষিত রেখেছে তাদের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে। মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশ সরকার কোনো সংরক্ষণ ছাড়াই সিডও সনদে স্বাক্ষর দিয়েছে। তারা নারী-পুরুষের বৈষম্য বিলোপের জন্য সিডও সনদের ধারাগুলোতে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিচ্ছে এবং সম্মিলিতভাবে সমাজ ও সংস্কৃতির মূল্যবোধের অসাম্য, অবক্ষয়, নির্যাতন বন্ধের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিউনিশিয়া, তুরস্ক, মালয়েশিয়ার নারীসমাজ ও সরকার শরিয়ার বিধান বিষয়ে কাজ করে প্রমাণ করেছে, মানুষে মানুষে বিভেদ শরিয়ার বিধান কেন কোনো ধর্মীয় বিধানেই অনুমোদিত নেই। নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যও ধর্মীয় বিধানে নেই। মূলত ধর্মীয় বাধা নয়, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও রক্ষণশীলতাই নারীর প্রতি বৈষম্য বজায় রাখছে। তাই সময়ের দাবি, বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সিডওর পূর্ণ বাস্তবায়ন। ০৭.১১.২০১৪
