উইমেননিউজ ফিচার : বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সমতলের জেলাগুলিতে ৩০ জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীর বাস। যার অর্ধেকই নারী। সংখ্যার দিক থেকে আদিবাসী নারীরা অগ্রগামী হলেও সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারের দিক থেকে তারা পশ্চাৎপদ। এখনো অধিকারহীন রয়ে গেছে সমতলের আদিবাসী নারীরা। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চনার শিকার হতে হয় প্রতিনিয়ত। পারিবারিক ও সামাজিক নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করে তাদের জীবণযাপন করতে হয়। মূল ধারার নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পেশা ও সামাজিক সচেতনতা বিষয়ে অগ্রগামি হলেও আদিবাসী নারীরা আজো তিমিরেই রয়ে গেছে। ঘর সংসার গোছানোর পাশাপাশি বাড়ির বাইরে মাঠে দিনমজুরির কাজ করে পারিবারিক আয়ের সংস্থানে তাদের ব্যস্ত থাকতে হলেও খোদ পরিবারেই তাদের নিপীড়নের শেষ নেই। আদিবাসী নারীরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নের জন্য অবদান রেখে চললেও তাদের নূন্যতম স্বীকৃতিটুকুও নেই। সমতলের আদিবাসী নারীরা সামাজিক সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে থাকলেও তাদের উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিশেষ কোন উদ্যোগ গ্রহণ চোখে পড়ে না। বরং দেশে আপামর নারীদের জন্য চলমান যে সকল কর্মসূচী আছে সেগুলোতেও আদিবাসী নারীদের অন্তর্ভূক্তকরণের তেমন একটা উৎসাহ দেখা যায় না। যার কারণে আদিবাসী নারীরা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় আসতে পারছে না।
সমতলের আদিবাসী নারীদের জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। ঘর সংসার সামলানোর পাশাপাশি পারিবারিক আয়ের সংস্থানের জন্য তাদের মাঠে কাজ করতে হয়। ধান রোপন, ধান কাটা, নিড়ানি দেওয়া ইত্যাদি কাজে আদিবাসী নারীদের দক্ষতা থাকায় এলাকায় তাদের শ্রমের যথেষ্ট চাহিদা আছে। আর এ সকল কাজ করার জন্য পরিবার থেকে আদিবাসী নারীদের কোন বাধা নেই। বরং স্বাধীনতাই আছে। তবে কাজের ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীদের স্বাধীনতা থাকলেও উপার্জিত আয় খরচের স্বাধীনতা তাদের হাতে নেই। সারাদিন ঘাম ঝরানোর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ তুলে দিতে হয় তাদের স্বামী বা ছেলের হাতে। এরপরও পান থেকে চুন খসলেই তাদের উপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। এরপরও কোন অভিযোগ থাকে না তাদের।
কাজের ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীদের স্বাধীনতা থাকলেও তাদের কর্মপরিবেশ কিন্তু মোটেও নিরাপদ নয়। কর্মস্থলে গিয়ে হরহামেশাই তাদের নানারকম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এছাড়াও গৃহসস্থ বা অন্য অনেকেই আদিবাসী নারীদের সাথে অশোভন আচরণ করে থাকে। কিন্তু এর কোন প্রতিবাদ করতে পারে না আদিবাসী নারী বা তার পরিবারের সদস্যরা। ফলে মুখ বুঁজে তাদের সহ্য করতে হচ্ছে সকল প্রকার হয়রানী। মজুরীর ক্ষেত্রেও আদিবাসী নারীদের চরম বঞ্চনার শিকার হতে হয়। পুরুষদের তুলনায় আদিবাসী নারীরা নিবীড়ভাবে কাজ করলেও স্থানভেদে পুরুষদের থেকে তাদের দৈনিক মজুরী ২০-৩০ টাকা কম। মজুরী কম দেওয়া বিষয়ে গৃহস্থদের অভিযোগ হলো আদিবাসী নারীরা নাকি ১ ঘন্টা পরে কাজে যোগ দেয়। এছাড়াও জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়টি এক্ষেত্রে উপেক্ষিতই থেকে যায়। শুধু তাই নয়, সপ্তাহজুড়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আদিবাসী নারীরা গৃহস্থের জমিতে কাজ করলেও মজুরী গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের বঞ্চনার শিকার হতে হয়। সাপ্তাহিক হাটের দিনে মুজরী প্রদানের নাম করে অনেক গৃহস্থ আদিবাসী নারী শ্রমিকদের ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখে। হাট ভাঙ্গার শেষ মুহুর্তে এসে সামান্য কিছু টাকা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। যা দিয়ে তাদের কিছুই হয় না। এ কারণে তাদের অনেক সময়ই অভুক্ত থাকতে হয়। আটকা পড়তে হয় ঋণের জালে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী অধ্যুষিত নওগাঁ, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর ইত্যাদি এলাকার গ্রামীণ হাটগুলো পরিদর্শনে গেলে এই চিত্র চোখে পড়বে।
পরিবার ও পরিবারের বাইরে আদিবাসী নারীরা নির্যাতিত হলেও তার কোন প্রতিকার তারা পায় না। পারিবারিক নির্যাতনকে তারা খুব স্বাভাবিক বিষয় বলে মনে করে। পরিবারের বাইরে কোন আদিবাসী নারী নির্যাতিত হলে তারা কোন প্রতিকারতো পায়ই না বরং প্রভাবশালীরা তাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে আদিবাসী নারীদের বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। নির্যাতনের বিচার পাওয়াতো পরের কথা তাদের অস্তিত্বই সংকটের মধ্যে পড়ে যায়।
দেশের নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও এর প্রভাব এখনও আদিবাসী নারীদের উপর পড়ে নি। আদিবাসী নারীরা এখনও অধিকারহীন রয়ে গেছে। তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে দিনের পর দিন। সম্প্রতি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার স্থানীয় সংগঠন বরেন্দ্রভূমি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (বিএসডিও) মা ফোরাম, আদিবাসী নারী সিবিও, মুষ্টি চাল সমিতির মতো কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে আদিবাসী নারীদের সংগঠিতকরণ ও সচেতনকরণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসী নারীদের আইনী সহায়তা প্রদানের মতো কর্মসূচীর অংশ হিসাবে সংস্থাটি একজন আইনজীবী নিয়োগ করায় আদিবাসী নারীরা তাদের উপর নির্যাতনের বিচার পেতে শুরু করেছে। কিন্তু এই একটি কিন্তু সংগঠনের উদ্যোগ দিয়ে আদিবাসী নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এককভাবে সম্ভব নয় বলে মনে করেন অনেকেই। এজন্য সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আদিবাসী নারীদের সংগঠিত করার জন্য তাদের পল্লীতে নারী দল গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তবেই আদিবাসী নারীদের অগ্রগতি সাধিত হবে। ১০.১১.২০১৪